0

গল্প - গান্ধর্বিকা

Posted in




















“ভাবছি এই উইকেণ্ডে শান্তিনিকেতন থেকে ঘুরে আসব।”

রিনির কথা শুনে অভিনব ল্যাপটপ থেকে চোখ আর ভুরু দুটোই তুলে তাকালো।

“হঠাৎ?” বলতে বলতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল। “ওঃ, বাসন্তীর কথাটা মাথায় ঘুরছে নাকি?”

রিনি ভয়ংকর ভ্রুকুটি করে উঠল। “বোকা বোকা কথা বোলো না তো! আমার যাওয়ার কথাই ছিল। মা বাবাকে পয়লা বৈশাখের জামাকাপড় দিতে হবে না? আরো দেরী করলে দর্জি কবে ব্লাউজ বানাবে?”

“বুঝলাম,” অভিনব আবার সলিটেয়ার খেলায় মন দিল। “আমি কিন্তু যেতে পারব না। এই শনিবার আমার ক্লায়েন্ট আসবে।”

“যেতে হবে না। এবারটা আমি একা গেলেই ভালো। নববর্ষে তো আমরা প্রণাম করতে যাবই।”

অভিনব অন্যমনস্ক ভাবে বলল “হুম।”

রিনি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু জাগরণে যায় বিভাবরী। অভিনবর কাছে স্বীকার করুক আর নাই করুক, বাসন্তীর ফোন আসার পর থেকেই সে বেশ ডিস্টার্বড হয়ে আছে।

“ছেলেটা সুবিধের নয় গো দিদি,” বাসন্তী নাটকীয় ভঙ্গিতে গলা নামিয়ে বলেছিল, “দিনরাত মাইমাকে কি মন্তর দিচ্ছে কে জানে! নির্ঘাত কোনো মতলবে আছে।”

বাবাকে জিজ্ঞেস করে যথারীতি কোনো সুরাহা হয়নি।

“কে, রজত? হ্যাঁ, আসে তো মাঝেমাঝে। তোর মাকে হেল্প করে। বেশ কাজের, ছেলেটা।”

আর মাকে তো ফোনে পাওয়াই অসম্ভব। গত দু'মাস ধরে যখনই রিনি ফোন করে হয় মা রজতের সঙ্গে বাগানে বসে আছে, নয় বাড়িতে ফোন রেখে রজতের সঙ্গে বাজারে কিংবা এটিএমে গেছে। সারাদিনে মেয়ের সঙ্গে একটা কথা বলারও সময় নেই। এতো কিসের ভাব এই রজতের সঙ্গে? নাঃ, একবার চর্মচক্ষে সমস্তটা না দেখে এলেই নয়।

শনিবার ভালো করে সকাল না হতেই রিনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। রাস্তা ফাঁকা, দেখতে দেখতে হাওড়া পেরিয়ে হাইওয়ে, তারপর হাইওয়ে ছাড়িয়ে বোলপুরের রাস্তায় ঢুকে পড়ল। ভাগ্য ভালো, লেভেল ক্রসিংটা খোলা আছে। এগারোটার মধ্যেই বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে গেল রিনি।

গাড়ি পার্ক করে ইঞ্জিন বন্ধ করার আগেই বাসন্তী হাসিমুখে এসে হাজির।

“এত সকাল সকাল এসে গেলে? রাস্তায় জাম পাওনি?”

“নাঃ, ফাঁকাই ছিল।”

গাড়ির পেছনের সীট থেকে ওভারনাইট ব্যাগটা তুলে “তোমার ঘরে রেখে দিলাম” বলে বাসন্তী দুলকি চালে ভেতরে ঢুকে গেল।

গাড়িটা গাছের তলায় রেখে রিনি লক করল। তারপর টাটকা হাওয়ায় বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে আড়মোড়া ভাঙল। গরমটা এখনো চরমে ওঠেনি। বসন্ত যদিও বিদায় নিয়েছে।

বাবা বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। রিনিকে দেখে হাত নাড়ল।

বাবা একা কেন?

রিনির মনে সন্দেহ জাগে।

“মা কোথায়?”

“রজতের সঙ্গে বাজার করতে গেছে।”

“রজত কেন?” রিনি বিরক্ত ভাবে একটা মোড়া টেনে বসতে বসতে বলল, “তুমি কি করছিলে?”

“আমি?” বাবা আঁতকে উঠল, “না না, এই গরমে বুড়ো বয়সে বেরলে আমি আর বাঁচব না!”

“এমন কি গরম পড়েছে?” ভুরু কুঁচকে রিনি জিজ্ঞেস করল।

“না গো, এখনো অত গরম হয়নি,” বাসন্তী রিনির হাতে এক গ্লাস সরবত ধরিয়ে বলল, “মামা এমনি এমনি ভয় পাচ্ছে।”

“হ্যাঁ, তুই তো সব জানিস! তোরা মাঠে ঘাটে কাজ করিস, তোরা বুঝবি না।” অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বাবা একটা সিগারেট ধরালো। “জার্মানিতে থাকতে আমি রোজ সকাল সাতটায় উঠে লোকাল মার্কেটে যেতাম।”

প্রাতর্যৌবনে বাবা মাস তিনেক জার্মানিতে ছিল। সেই থেকে আজও নাকি ভারতের গরম আর পল্যুশনে অভ্যস্ত হতে পারেনি।

“তা, বাড়িতে বুড়ো তো তুমি একা নও,” রিনি চুল তুলে বেঁধে নিল, “মা-রও তো বয়েস হয়েছে। মা-রই বা বেরোনোর কি দরকার ছিল?”

“আমি তো তাই বলি,” বাসন্তীর সব ব্যাপারে ওস্তাদি করা চাই, “তোমাদের বেরোতে হবে না, যা দরকার আমাকে বলবে। কিন্তু মাইমা শোনে কই?”

রিনি রুষ্টভাবে সরবতে চুমুক দিতে লাগল। অনতি বিলম্বেই গেট থেকে একটা রিক্সা থামার শব্দ ভেসে এল। তার সঙ্গে মায়ের খিলখিলিয়ে হাসির আওয়াজ। বাসন্তী রিনির দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি দিল। রিনি চোখ ঘুরিয়ে নিল।

“যা দ্যাখ গিয়ে ব্যাগট্যাগ কিছু আনতে হবে কি না।”

বাসন্তীকে ধমক দিয়ে রিনি তারাতাড়ি বাড়িতে ঢুকে গেল। ও আসবে জেনেও মা যদি রজতের সঙ্গে বেড়াতে চলে যায় তাহলে ও-ই বা কেন হ্যাংলার মতো বারান্দায় বসে থাকবে? সবে সোফায় বসে তৈলচিত্রের মতো পোজ দিতে যাচ্ছে এমন সময়ে মায়ের গলা ভেসে এল।

“...আরেকটু হলেই ওজনে মেরে দিত। রজত একেবারে খপ্ করে ধরেছে, আমি তো দেখতেই পাইনি।”

আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে মা বাড়ি ঢুকল। রিনি যতদূর হয় গলাটা ঠাণ্ডা করে বলল,

“ভালো আছ মা?”

“ওঃ, এসে গেছিস? দাঁড়া আমি হাতটা ধুয়ে আসছি। সারা হাতে আঁশটে গন্ধ হয়ে আছে।”

মায়ের পেছন পেছন একটা বছর পঁচিশের ছেলেও একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে এসেছে। ফর্সা, গোবেচারা মতো চেহারা। রান্নাঘরের সামনে দুটো বাজারের থলে নামিয়ে রাখল। এই বোধহয় সেই বিখ্যাত রজত।

“আমি তাহলে আসি কাকিমা?” ন্যাকা ন্যাকা গলায় প্রশ্ন করল ছেলেটা।

“না না এই রোদে এতগুলো থলে নিয়ে এলি, এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যা।”

এক দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল মা।

“বাসন্তী, ওই মিষ্টিগুলো কোথায় আছে রে?”

“যেগুলো মামা কাল রিনিদির জন্যে আনাল? ফ্রিজে আছে তো।”

“ওঃ, ওগুলো রিনির জন্যে আনিয়েছে বুঝি? তাহলে এক কাজ কর্, ট্যাংরামাছ গুলোয় হলুদ মাখিয়ে রেখেছি, চট্ করে ভেজে দে তো। আর চা কর্। রিনি, চা খাবি?”

“নাঃ তোমরা খাও, আমি এই জাস্ট সরবত খেয়েছি।”

রজত একটু ইতস্তত করে রিনির দিকে এগিয়ে এল।

“চিনতে পারছ, দিদি?”

রিনি উত্তর দেওয়ার আগেই মা রান্নাঘর থেকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে এল।

“একটু বোস, রজত, বাসন্তীকে মাছ ভাজতে বলেছি। ততক্ষণ তুই চা আর নিমকি খা। নাকি কেক খাবি? এক টুকরো কেক দিই? একটু চানাচুর খাবি?”

“না না, তুমি ব্যস্ত হয়ো না কাকিমা।”

“ওমা, তা বললে হয় নাকি? দাঁড়া, মাছ আসতে আসতে আমি তোকে দুটো পাঁউরুটি সেঁকে দিই! শুনছো, সকালে পাঁউরুটি খেয়ে মাখনটা কোথায় রেখেছ?”

বাবার মুখে কোনো উত্তর নেই। প্রয়োজনে কানে না শোনার অভিনয় বাবার মতো কেউ করতে পারে না।

মা আবার রান্নাঘরে অন্তর্হিত হল। বোধহয় একেবারে দুধ থেকে মাখন বানিয়ে পাঁউরুটিতে মাখাবে। অথচ রিনি যে এতদিন পরে বাড়ি এসেছে তাই নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই।

এত আদিখ্যেতা আর চোখে দেখা যায় না। গজগজ করতে করতে রিনি ঘরের দিকে রওনা হল। দরজার কাছে গিয়ে শুনতে পেল বাবা বলছে “বাসন্তী, আমাকেও এক কাপ চা দিস তো।”

রজত যে ঠিক কি কি খেয়ে বাড়ি গেল তা আর রিনি জানতে পারেনি। স্নান সেরে বিছানায় লম্বা হয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

বাসন্তীর ডাকে ঘুম থেকে উঠে খাবার ঘরে গিয়ে দেখে মা বাবা অলরেডি খেতে বসে গেছে। এক জনপ্রিয় বাংলা সিরিয়ালের নায়িকা তার প্রতিপক্ষকে কি কি কথা শোনাতে পারত আর কেনই বা শোনাল না সেই নিয়ে একটা গুরুগম্ভীর আলোচনা জমে উঠেছে।

রিনি চেয়ার টেনে বসে পড়ল।

“এই সময়ে আবার কেন ট্রাভেল করতে গেলি?” ভাত বাড়তে বাড়তে মা রিনিকে জিজ্ঞেস করল।

“তুমিও তো বেরোচ্ছ রোজ,” রিনি বলল, “এই বয়েসে এত বেরোনো কি উচিৎ হচ্ছে?”

“না বেরোলে কি করে চলবে?” মা ঝাঁঝিয়ে উঠল, “বাড়ির কাজগুলো তো ভূতে করবে না। তোমার তো আমাদের জন্যে কোন সময় নেই, আর তোমার বাবাকে দিয়ে কোনো কম্ম হয় না।”

“আমাকে আবার টানছ কেন?” রিনির বাবা সরু গলায় প্রতিবাদ করে উঠল। “এই গরমে একজন বয়স্ক মানুষের পক্ষে বেরনো সম্ভব নয়। জার্মানিতে থাকতে-”

“তাহলে মা-ই বা বেরোচ্ছে কেন?” রিনি বাবার কথা শেষ করার সময় দিল না। “এই রজত না কে তাকে একা পাঠালেই তো হয়!”

“বোকা বোকা কথা বলিস না,” বলতে বলতে মা রিনির প্লেটে জলের চেয়েও পাতলা ‘বাসন্তী স্পেশাল' ডাল ঢেলে দিল। “রজত কি আমাদের চাকর নাকি?”

“পেলে কোথা থেকে মালটাকে?” রিনি তীর্যক সুরে প্রশ্ন করল।

“আরে আমাদের ইনশিওরেন্স করাতে আসত না, ধরবাবু?” বাবা ব্যাখ্যা শুরু করল, “ওই ধরবাবুর ছেলে। ও-ই এখন ধরবাবুর অফিসে বসে। খুব কাজের, ছেলেটা।”

“কতদিন হল ধরবাবুর অফিসে বসছে?”

মা বাবা চোখাচোখি করল।

“তা বছরখানেক তো হবেই,” মা হাসিমুখে জানালো। “ও-ই এখন আমার পলিসি টলিসি, ব্যাঙ্কের কাজটাজ সব দেখে। তোর বাবার এটিএম কার্ড আর পিনও ওকে দিয়ে রেখেছি। কাজ থেকে ফেরার সময়ে টাকা তুলে আনে।”

“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?” রিনি চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল। “এরকমভাবে যাকে তাকে কেউ নিজের এটিএম কার্ড দিয়ে দেয়? ও যদি তোমাদের সব টাকা চুরি করে নেয়?”

“ওমা কার্ড না দিলে ও টাকা তুলবে কি করে?” বাবা কঁকিয়ে ওঠে, “আমি কি এই গরমে বেরব নাকি?”

“কাউকে বেরোতে হবে না!” রিনির আর ধৈর্য থাকে না। “তোমাদের তো বলেছি কতবার আমার বাড়িতে এসে থাক কিছুদিন! আজকাল সব অনলাইন হয়, আমি তোমাদের শিখিয়ে দেব।”

“না, ওইভাবে মেয়ে জামাইয়ের বাড়ি থাকা যায় না,” মা প্রবল মাথা নেড়ে জানায়। “বাড়িতে একটা ছেলে থাকা খুব জরুরি। তুই তোর বর, সংসার নিয়ে নিজের মতো শহরে আছিস, থাক। আমাদের লাইফে নাক গলাতে আসিস না।”

“মোটে এক তো বছর চেনো এর মধ্যেই 'ছেলে' হয়ে গেল? প্যাথেটিক!”

“তুই কি চাস?” মা ঠাণ্ডা বাঁকা গলায় প্রশ্ন করে, “তোর বাবা আর আমি রজতকে দিয়ে কোনো কাজ করাব না, নিজেরাই সব কাজ করে হিট স্ট্রোক বা নিপা বাধিয়ে মরব, তাই তো? বেশ, তাই হবে। আমরা মরে গিয়ে আমাদের টাকাগুলো তোর জন্যে রেখে যাব। তাতেই তো তুই খুশি?”

রিনি বুঝতে পারে না এর উত্তরে কি বলবে। তার মা বাবার বুদ্ধিসুদ্ধি কি লোপ পেয়েছে?

“শোন, রিনি,” মায়ের অলক্ষ্যে আরেক পিস চিকেন পাতে নিতে নিতে বাবা শান্ত গলায় বলল, “তোরা শহরে থাকিস, পাশের বাড়ির লোককেও ভরসা করতে পারিস না। এটা অনেক ছোট জায়গা। এখানে সবাই সবাইকে বিশ্বাস করে। ধরবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় কি আজকের? সেই জার্মানি থেকে সবে ফিরেছি-”

“বেশ,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল রিনি, “যা খুশি কর। ওই ছেলে যখন তোমাদের গলা কেটে সারা বাড়ি লুট করে পালাবে তখন আমার কাছে কাটা মাথা নিয়ে কাঁদতে এস না।”

মা রিনির প্লেটে আরেক পিস মাংস দিতে দিতে পরিস্থিতি প্রাঞ্জল করে দিল,

“আসলে তোর রজতকে নিয়ে হিংসে হয়েছে। আমি সব বুঝতে পেরেছি।”

“খুব বুঝেছ।”

রাগ হলেও কথাটা যে নেহাৎ মিথ্যে নয় তা রিনিও মনের কোথাও বুঝতে পেরেছে। বেশ হাড়ে হাড়েই বুঝেছে। তা বলে একেবারে এটিএম কার্ড?

“আমি থাকতে ওই ছেলে যেন এ বাড়ির ত্রিসীমানা না মাড়ায়।”

রিনির কথার মান রেখে (অথবা প্রতিকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়ে) রজত সত্যিই সেই সপ্তাহান্তে রিনিদের বাড়ির চৌহদ্দি মাড়ায় নি। তা বলে তার গুণাবলীর কীর্তনে ছেদ পড়েনি। ওষুধ কেনা থেকে রিক্সা ধরা পর্যন্ত সব বিষয়ে তার অসাধারণ পটুতার কথা বারবার রিনিকে স্মরণ করানো হয়েছে। বাজারের অসৎ মাছ বিক্রেতাদের চেনানো আর টিভি খারাপ হয়ে গেলে বৃষ্টির মধ্যেও ভিজে ভিজে গিয়ে ইলেকট্রিশিয়ান যোগাড় করা তার উল্লেখযোগ্য কীর্তির মধ্যে পরিগনিত হয়েছে। তার করুণ চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে মা একটা সন্দেহজনক বীমা কোম্পানিতে দশ হাজার আর স্বয়ং তাকে পাঁচ হাজার টাকা নগদ দিয়েছে, গল্পে গল্পে সে কথাও প্রকাশ পেয়েছে।

রিনির অনেক প্ররোচনা এবং সাবধানবানী সত্ত্বেও রজতের প্রতি তার বাবা মায়ের অন্ধবিশ্বাসকে টলানো যায়নি এক চুলও। শেষটায় বাসন্তীকেই “মালটাকে একটু চোখে চোখে রাখিস তো” বলে তাকে কোলকাতায় ফিরে আসতে হয়েছে।

তারপর ক'দিন নির্বিঘ্নেই কেটেছে। নববর্ষ আসন্ন। বহু অনুরোধ সত্ত্বেও মা বাবা কোলকাতায় একদিনের জন্যেও আসতে রাজি হয়নি। রজত নাকি ওখানে ওদের সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। সে যে কত 'কাজের' সেকথা বাবা জার্মানির ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়েছে। রিনি বাসন্তীর মারফত জেনেছে যে রজত প্রায়ই নাকি ওদের বাড়িতে দুপুরের খাওয়াও সারছে। মা নববর্ষ উপলক্ষে ওকে জামা জুতো সব কিনে দিয়েছে।

রিনির অস্বস্তি বেড়েই চলেছে। একটা উটকো ছেলেকে কেন যে তার বাবা মা এতো ভরসা করছে! বাড়িতে ডেকে খাওয়ানো দাওয়ানো – ও যদি ডাকাতির পার্পাসে এসে থাকে? আলমারি ভর্তি মায়ের সোনার গয়না... চাবিটাবি কোথায় আছে সব দেখে রেখেছে নিশ্চয়ই। একরাতে ঢুকে যদি সবার গলা কেটে রেখে যায়?

কিন্তু যাদের গলা তাদেরই টনক নেই। কাজেই দূরে বসে দাঁত কিড়মিড় করা ছাড়া রিনিরও কিছুই করার থাকে না। অভিনব সব শোনে আর শুধুই মিটিমিটি হাসে।

ফোনটা এল নতুন বছরের ঠিক আগের দিন। রিনি আর অভিনব শান্তিনিকেতনে যাবে বলে ব্যাগ গোছাচ্ছে এমন সময়ে।

“রিনি মা, একবারটি আসতে পারবি?”

বাবার গলা শুনেই রিনি বুঝে গেল নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু একটা হয়েছে।

“কি-কি হয়েছে?” রিনি আতংকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল। মনে মনে যদিও উত্তরটা সে জানে। ওই রজতই কিছু একটা করেছে।

“আর বলিস না...রক্তারক্তি কাণ্ড হয়েছে। এইমাত্র পুলিশ চলে গেল।”

রক্তারক্তি...খুনের চেষ্টা করেনি তো?

“মা...মা ঠিক আছে?” রিনির চোখে জল এসে গেছে।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন ঠিকই আছে।”

এখন...এখন মানেটা কি?

“তুমি কোনো চিন্তা কোর না বাবা, আমরা এক্ষুনি আসছি। বাড়িতেই আছ তো?”

আধ ঘন্টার মধ্যেই রিনি আর অভিনব গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। আভিনবই চালাল। কারণ রিনির হাত থরথর করে কাঁপছে। বাবা যদিও বলেছে সবাই বাড়িতে আছে, কিন্তু কি অবস্থায় আছে? বাবা মিথ্যে আশা দেয় নি তো? ওখানে গিয়ে মাকে সে কি অবস্থায় দেখবে? রক্তারক্তি! পুলিশ!

“আমি জানতাম!” রিনি কাঁদতে কাঁদতে অভিনবকে বলতে লাগল, “ওই ছেলেটাকে একবার দেখেই আমি বুঝে গেছিলাম ও সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটাবে! নিশ্চয়ই ডাকাতি করতে এসেছিল! মা বাধা দেওয়ায় অ্যাটাক করেছে! মা কি অবস্থায় আছে কে জানে!”

“চিন্তা করছ কেন?” অভিনব ভরসা দেয়, “বাবা তো বললেন মা ভালো আছেন।”

“মা যে কেন এরকম একটা ক্রিমিনালকে বিশ্বাস করতে গেল! ছোট শহরে নাকি এসব কিছু হয়না, হুঁঃ!” জানলার কাঁচে রিনি মাথা ঠুকতে লাগল। কেন যে মা বাবাকে জোর করে কোলকাতায় নিয়ে এলো না!

শান্তিনিকেতনে পৌঁছেই গাড়ি থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে গেল রিনি। বাগান থেকেই দেখতে পেল বাইরের ঘরে আলো জ্বলছে, সামনের দরজাটা হাট করে খোলা। হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকে দেখে বাবা একা সোফায় বসে আছে। সারা ঘরের লণ্ডভণ্ড অবস্থা।

“বলেছিলাম, একটা অচেনা ছেলেকে ভরসা না করতে!” রিনি কাঁপা কাঁপা গলায় চেঁচাতে শুরু করল। “এবার শিক্ষা হল তো?”

বাবা করুণ চোখে রিনির দিকে তাকালো।

“কি জানি কি করে সব হয়ে গেলো...সকাল থেকে তো সব ঠিকই ছিল।”

“সকাল থেকে কি বুঝবে? ও কি রঘু ডাকাত নাকি যে খবর দিয়ে আসবে?” রিনির বুক ধরফর করছে। মা কি বাড়িতেই আছে? আর বাসন্তীই বা কোথায়?

“কে ডাকাত? ওই মেয়েটার কথা বলছিস?”

“কিসের মেয়ে?” বাবার কি শকে মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?

বাবা মাথা নাড়ল।

“আগে দেখিনি কোনোদিন। এসে জিজ্ঞেস করল রজত আছে কি না। তোর মা বারান্দায় বসে ছিল। ও জানতে চাইল মেয়েটা কে। মেয়েটা বলল – ও নাকি রজতের বউ। রজতের টাকার ব্যাগটা নিতে এসেছে। অফিসে গিয়ে পায়নি তাই এখানে এসেছে।”

রিনি একটা সোফায় বসে পড়ল।

রজত ওর বউয়ের সঙ্গে মিলে ডাকাতি করে?

“মা কোথায়, মা?”

“আমরা জানতাম না রজতের বিয়ে হয়ে গেছে,” বাবা বিড়বিড় করে বলতেই থাকে। “তোর মা তো বিশ্বাসই করতে চায়নি। মেয়েটাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে দিয়েছিল, রজতের সামনে ধরিয়ে দেবে বলে। কিন্তু রজত এসে মেয়েটাকে দেখে ঘাবড়ে গেল। জানা গেল সত্যিই মেয়েটা ওর বউ। লুকিয়ে বিয়ে করেছে। আমাদের বললে পাছে ধরবাবুকে লাগিয়ে দিই সেই ভয়ে চেপে গেছে।”

“আরে তুমি আসল কথায় এসো না, ভণিতা ছেড়ে!”

“রজত বিয়ের কথা স্বীকার করতেই তোর মা কেমন যেন হয়ে গেল। বলল, তুই আমাকে এসব কিচ্ছু বললি না? শুধু আমার বীমার টাকায় কমিশন খাবি বলে ভালোমানুষির ভান করছিলি? মিথ্যেবাদী! এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা!”

“কেন? রজতের বউ আছে তো মায়ের কি?”

“জানিস তো, তোর মা মিথ্যে কথা সহ্য করতে পারে না। যাই হোক, রজত ওর ব্যাগটা নিতে এই ঘরে এল। তোর মাও ওর পেছন পেছন ছুটে এলো। বাসন্তী আটকাতে গেলে এলোপাতাড়ি জিনিসপত্র ছুঁড়তে লাগল। রজতের কপালে ফুলদানির কোণা লেগে একেবারে বিশ্রী রক্তারক্তি কাণ্ড।”

“মা-মানে?” রিনির মাথায় সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। “মা-র চোট লাগেনি?”

“না না, তোর মায়ের কেন চোট লাগবে?” বাবা এমনভাবে তাকায় যেন রিনি পাগল হয়ে গেছে। “বাসন্তী তোর মাকে ধরে শান্ত করছিল এর মধ্যে কখন দেখি রজতের বউ রজতকে নিয়ে থানায় ডায়রি করতে গেছে। একটু বাদে পুলিশ এসে হাজির। রজতের বউ তোর মায়ের নামে কেস করতে চায়। আমি কোনরকমে ওদের টাকা পয়সা দিয়ে ক্ষমা টমা চেয়ে ব্যপারটা মিটিয়েছি।”

“আর মা?”

“ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। পাশের ঘরে ঘুমচ্ছে। বাসন্তী ওর কাছে বসে আছে।”

রিনির হাত পা ক্রমশঃ অবসন্ন হয়ে আসে। কি বলবে, কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না।

হঠাৎ বাবা সম্বিত ফিরে পায়। “আরে অভিনব, তুমি কখন এলে? এই দ্যাখো, তোমরা আজকের দিনে এলে অথচ বাড়িতে একটু মিষ্টিও নেই...আমি তো এর মধ্যে বেরোতেও পারব না, জার্মানিতে থাকলে অবিশ্যি আলাদা কথা ছিল...তোমার মা কি যে করেন না মাঝেমাঝে...”

“না না, আপনি ও নিয়ে ভাববেন না,” অভিনব রিনির বাবাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে, “আমরা আছি তো। আমি কাল বেরিয়ে মিষ্টি নিয়ে আসব।”

বাবার ম্লান মুখ একটু উজ্জ্বল হল।

“তাই ভালো, বাবা। তোমরাই তো এখন আমাদের ভরসা। রজতকে তো আর কাজে লাগাতে পারব না...আমার এটিএম কার্ড টার্ড সব ফেরত দিয়ে গেছে।”

“ওঃ, ফেরত দিয়ে দিয়েছে...” কার্ড ফিরলেও রিনি এখনো বাস্তবে ফিরতে পারেনি।

“হ্যাঁ,” বাবা বাসি দাড়িতে হাত বুলিয়ে নিল, “ও-ই তো ওর বউকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কেস তুলে নিতে বলল। ছেলেটা সত্যিই বড় কাজের ছিল রে!”

বাবার হৃদয়মথিত হাহাকার বিদায়ী বছরের হাওয়ায় মিশে রাতের আকাশে ছড়িয়ে পড়ল।

রিনি স্বপ্নাবিষ্টর মতো মাথা নাড়ে।

0 comments: