প্রবন্ধ - সেবিকা ধর
Posted in প্রবন্ধযজ্ঞবেদীর ওপর যেটুকু আলো আছে, তাতে খানিকটা দেখা যায়, অনেকটাই দেখা যায় না।সেই যজ্ঞস্থলে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজের কেশপাশ উন্মুক্ত করে। এই কৃষ্ণবর্ণ কেশপাশের দিকে কুরু যোদ্ধাদের লোভী চোখ ছিল।রজঃস্বলা অবস্থায় তারা আমাকে টানতে টানতে নিয়ে এসেছিল কুরুসভাতে।আমি এক কালো মেয়ে।পঞ্চস্বামীর অতি আদরের দ্রৌপদী, পাঞ্চালী, কৃষ্ণা,যাজ্ঞসেনী। এছাড়া আরও কত নাম আমার।আমাকে এই পঞ্চস্বামী-যুধিষ্ঠির, ভীম,অর্জুন, নকুল,সহদেব ছাড়াও কর্ণ নামে এক বীর, তিনিও পছন্দ করতেন আমাকে।আমিও পছন্দ করতাম বীর, শূরবীর কর্ণকে।সূর্যপুত্র কর্ণকে, সূতপুত্র কর্ণকে,সে এক অন্য ইতিহাস।
যজ্ঞবেদীর আলোর চূর্ণমালা পৌঁছে গেছে আমার গালে।আর গালের যেটুকু কালোর আভাস, তা আরও উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে আলোর স্পর্শে। আমি দ্রৌপদী,আমি কালো মেয়ে।
লাইট,ক্যামেরা, অ্যাকশন- না না না আলোটা ঠিক মতো রিফ্লেক্টার দিয়ে ফেলা যাচ্ছে না ওর গালে।আপনি একটু-একটু - স্যরি তুমি একটু সাইড ফেস করতো।হ্যাঁ, হ্যাঁ - এবার ঠিক আছে। সে দাঁড়িয়ে আছে অনেক অনেক আলোর নীচে।বিজ্ঞাপনের মডেল হবে বলে।সে উজ্জ্বল আলোয় ধাঁধিয়ে যাওয়া তার স্বল্পবাসময় শরীর, নিজেই নিজেকে দেখতে দেখতে সে ভাবল- আমি এতো উজ্জ্বল? আমি এতো কালো? তা সত্ত্বেও তো ওরা আমাকে নিয়েছে মডেল হিসেবে।তার চোখের সামনে 'লিরিল' সাবানএর গুঞ্জন ধ্বনি।যা সে চোখে দেখেনি,শুনেছে তার পূর্বজদের কাছে।সেই 'লিরিল' সাবানের ফেনাময় বিজ্ঞাপন আবছা করে ভেসে উঠল।কারণ এই বিজ্ঞাপন সে দেখেছে, এই এড সে দেখেছে ইউটিউবে। চমৎকার শরীরের এক নারী,চারদিকে সাবান, ফেনা,সাবান-ঝরনা,ফেনায় জীবন বহে যাচ্ছে।
না, না, এভাবে হবে না।এটা কিন্তু আন্ডার গার্মেন্টসের বিজ্ঞাপন।তোমাকে বলা হয়েছে কী পজিশন, কী পোজ তোমাকে নিতে হবে। সেইভাবে তুমি তোমার পোজ নাও।ঔদ্ধত্য দেখাও, শরীরী আবেদনের কথা, লাস্যের কথা বলো।
আমি এক কালো মেয়ে।আমি আজ বিজ্ঞাপন- সুন্দরীও। আমাকে ব্যবহার করছে বিজ্ঞাপন কোম্পানি। তারা আমার শরীর যা লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি করবে অন্য অন্য পার্টি- বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রচার- ক্যামপেনে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, একটু পেছনে, একটু নামাও,বুবস দুটো ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। একটু খাঁজ দাও,একটু খাঁজ দাও। হ্যাঁ হ্যাঁ ব্যাক পোর্শান।ঠিক ঠিক।আচ্ছা অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপনে এতো এতো ব্যাকপোর্শান, বুবস দেখান!তারপরই ভাবল সেই বিজ্ঞাপনের কালো মেয়ে-এ সব তো করতেই হবে।এই ব্যাক পোর্শান,বোটক্স,বুবস- এতো এই প্রফেশনের অঙ্গ।করতেই হবে।ওরা চাইছেন।
কাট- লাইট,ক্যামেরা, এ্যাকশন - হ্যাঁ, হ্যাঁ এবার শট ঠিক হয়েছে।
কালো মেয়ে, ধরা যাক তার নাম অর্ণবা।কিংবা জুলিয়া অথবা নাসিমা- যে কোনো নাম হতে পারে তার-এক্স, ওয়াই, কিংবা জেড - সেই মেয়েটি এখন বিজ্ঞাপনের মেয়ে। গায়ে তার কালো চামড়ার রঙ উপচে পড়েছে ক্যামেরার লেন্সের ওপর।আর কয়েকদিনের মধ্যে যে প্রোডাক্ট বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মেয়েদের আন্ডার গার্মেন্টসের পোশাক-বিজ্ঞাপন হিসেবে ছড়িয়ে যাবে টিভিতে। খবরের কাগজে,অন্য অন্য মাধ্যমে।
আমি এক কালো মেয়ে। আমার স্টেপকাট চুলে আশ্চর্য আলো টুকটুক করে এসে বসছে।আবার উড়েও যাচ্ছে।যেমন চড়াই পাখি উড়ে যায়, নীল দিগন্তে অসীম আকাশে।আমি কি ঈগলদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি? এতো আলো, এতো কম পোশাক, এতো পা,এতো হাঁটু,এতো বুক, এতো ব্যাক পোর্শন। আমার তো লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল।না, না, না - টাকা রোজগার করতে করতে গেলে ওসব ভাবলে হবে না ।বিজ্ঞাপন-মডেল হতে গেলে ওসব ভাবলে চলবে না।আমার কালো রঙ আমাকে আটকাতে পারেনি। তার কারণ আমার আবেদনময়ী শরীর। এই শরীর দিয়ে,শরীরকে প্রদর্শন করে আমি বিজ্ঞাপনের একটা বড় অংশ,একটা বড় জগৎ দখল করতে চাইছি।
কিছু বলল, বলল কিছু, ওদের বাড়ির লোকেরা? শান্তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রবীর মাথা নীচু করে রইল।চৌষট্টি বছরের প্রবীর,ষাট বছরের শান্তা।প্রবীর একজন ব্যাঙ্কের রিটায়ার্ড কেরানি। প্রবীর ও শান্তার দুই মেয়ে।শান্তা কৃষ্ণবর্ণা।কন্যারাও রঙ পেয়েছে মায়ের। প্রবীর এবং শান্তার এই নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই।এই বঙ্গভূমে যতই লেখা হোক, 'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন' কিংবা 'কালো জগতের আলো'- প্রবীর কোনো খেই পাচ্ছে না কৃষ্ণবর্ণা কন্যাদের জন্য।মধুরিমা ও মাধুরী- দুই মেয়ে।দুজনেই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে এম এ করে ফেলেছে।বয়স বেড়ে যাচ্ছে ক্রমে, কিন্তু প্রবীর তাদের পাত্রস্থ করতে পারছে না কিছুতেই। কন্যারা যদি কোনো প্রেমঘটিত সম্পর্কে বিষয়ে জড়িয়ে যেত,আর সেই ছেলে যদি ভালো হত।প্রবীর ও শান্তার সেখানে আপত্তি থাকার কথা নয়, থাকতও না।কিন্তু এই দুই কালো মেয়ে প্রেমের বিবাহে বা প্রেম- বিবাহের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারেনি। খুচরো দু-একটা ঘটনা হয়ত তাদের জীবনে ঘটেছে যা শান্তা খানিকটা জানে,প্রবীর জানে অনেক কম।এবং সেখানেও একটু এগোনর পরই দুই কন্যেই বাতিল হয়ে গেছে তাদের গায়ের রঙের জন্য।
আজকের এই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে কেউ হয়ত এই সত্য বিশ্বাস করবে না।কিন্তু রবিবার আগরতলা বলুন আর রবিবার কলকাতাই বলুন, সেখানকার বহুল প্রচারিত পত্রিকাতে বা খবরের কাগজে যে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় সেখানে লেখা হয় 'সুশ্রী গৌর বর্ণা, চাকুরিরতা.... ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ মেয়েকে সব হতে হবে।সে ভালো রান্না করবে,সে দেখতে খুব সুন্দর হবে, তার গায়ের রঙ হবে ধবধবে ফর্সা, অর্থ উপার্জন করবে,সন্তান মানুষ করবে,সমস্ত দায় সেই মেয়ের।কিন্তু সেখানে কালো মেয়ে হলেই যত আপত্তি-ঘোর এসে যায়।বিশেষ করে যাঁরা পুরনোপন্থী শ্বশুরমশাই এবং শাশুড়িমা, তাঁদের কাছে গায়ের রঙটা খুব বড় ব্যাপার। ফলে প্রবীর এবং শান্তা দুজনেই খুব অকুলেই আছে দুই মেয়েকে নিয়ে।যদিও দুই মেয়ের বিয়ের বিজ্ঞাপনও করেছে তারা,অর্থ ব্যয় করেছেন তাঁরা।মেয়েদের বিবাহের বিজ্ঞাপন দিয়েছে টিভিতে, ম্যাট্রিমনি সাইটে।কিন্তু কোথাও সেই মেয়েদের জন্য উপযুক্ত পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
এক ঘন অন্ধকারের ভেতর বসে রয়েছে তাঁরা।মেয়েরা ক্রমশ বুড়ি হয়ে যাচ্ছে।মনের ওপর মেঘলা ছায়া ফেলছে তাঁদের।কোন নেলপালিশ লাগাব নখে,কোন ওষ্ঠরঞ্জনী বা লিপস্টিক লাগাবে ঠোঁটে, এই নিয়ে তাদের মধ্যে দোলাচল তৈরি হয়।কালো মেয়েকে কী সব মানায়? কোন শাড়িটা পরবে,কোন কালারের সালোয়ার-কামিজ পরব,কোন পালাজো পরব,এই সব দ্বন্দ্ব- দ্বিধা -এই রঙ কী আমাদের মানাবে? উজ্জ্বল হলুদ রঙের যে আভা, তা কী ফুটে উঠবে আমাদের গায়ে? না কী অসুন্দর দেখাবে? কিংবা কালো শাড়ি নয়তো সাদা সালোয়ার কামিজ? কিংবা টকটকে লাল জিন্স এবং কুর্তি? কোনোটাই সঠিকভাবে মানিয়ে তোলা যাচ্ছে না।ফলে দুই মেয়ে ক্রমশ বিষণ্ণ,বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।চাকরির চেষ্টা করছে তারা।চাকরিও যে খুব ভালো পাওয়া যাচ্ছে, এমন নয়।চাকরির ক্ষেত্রেও অনেক বাছবিচার আছে।অনেক বাঁধাধরা নিয়ম আছে।
সব জায়গা থেকে হতমান হয়ে এই দুই মেয়ে ক্রমশ ভাবছে, তারা আর বিয়ে করবে না।কোনো পুরুষের গলায় তারা আর ঝুলিয়ে দেবে না বরমালা।তারা বাঁচবে নিজেদের মতো করে, নিজেদের রাস্তায়।নিজেদের মতো করে, জীবন তাদের গুছিয়ে নেবে। কিন্তু তারজন্য তো আর্থিক স্বাবলম্বন দরকার।প্রবীর অবসর নিয়েছে, কিছু টাকা সে নিশ্চয়ই পেয়েছে।পাচ্ছে পেনশন। কিন্তু তাতে কী তাদের চারজনের সংসার চলবে?ফলে দুই মেয়ে ঠিক করেছে তারা স্বাধীন ভাবে বাঁচবে।নয়ত স্বাধীনভাবে ব্যবসা করবে তারা।এম এ পাশ করে কম্পিউটার নিয়ে নানারকম চাকরির চেষ্টা করে, তারা ভাবছে এবার একটা ছোটোখাটো ব্যবসা দিয়ে তারা শুরু করবে তাদের নিজেদের জীবন। কালো মেয়ের আলোর জীবন।
অন্ধকারে স্তনবৃন্ত দেখে চমকে উঠল শমীক।এই মেয়ের স্তন এতো কালো! সে জানত না।ফলে কালো স্তন এবং তার নিপল শমীককে শারীরিক ভাবে উত্থানে অসমর্থ করল।শমীক করবীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি এতো কালো? আমি তো জানতাম না?জানলে পরে এগিয়ে আসতাম না তোমার দিকে।তোমার বুবস এতো কালো? করবী ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছিল। সে সবে রাগানুরঞ্জিত হচ্ছিল অভ্যন্তরে।কিন্তু শমীকের এই কথা, শমীকের এই বাক্যবাণ, তাকে অস্থির করে তুলল।করবী ডিভোর্সি।শমীক ডিভোর্স মেনে নিয়েছে।বিবাহবিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাদের দুজনের দুটি পরিবারই আলাদা আলাদা।
শমীকের একটি ছেলে, একটি মেয়ে।করবীর একটি মেয়ে।তারা চেষ্টা করছিল নতুন করে একটা যৌথ জীবনের দিকে তারা যাবে।কিন্তু যেতে গেলে কিছু কিছু শারীরিক চাহিদা থেকে যায়।সেই শারীরিক চাহিদার সূত্র ধরে করবীর ফ্ল্যাটে একদিন শমীক এসেছিল।বাইরে তখন ঝমঝমে বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে চরাচর।কাঁচের জানলা দিয়ে আচমকা ভেসে আসা বিদ্যুতের আলোয় শমীক আবার করবীর স্তন দেখতে পেল।তার হাতের যে নিবিড় স্পর্শ করবী অনুভব করতে চেয়েছিল তার শরীর ছুঁয়ে, শমীকের এই কথায় তা সম্পূর্ণ ডুবে গেল।বুকের আড়াল সামলে নিয়ে নিজেকে গোছাতে গোছাতে করবী বলল- ঠিক আছে, থাক..
ডিম ডিম ডিম ডিম করে মাদল বাজছে। বাঁধনা পরব- শীত- অন্ধকার,মাটির জালা ভর্তি মহুয়ার আসবের নাচছে মেঝেনরা।সাঁওতাল রমণীরা।এই নারীরা সকলেই, কৃষ্ণবর্ণা,কালো এবং আলো।মেঝেনদের সঙ্গে নাচছে মাঝিরা-মর্দরা।তারা সবাই নিজেদের বাঁশিতে তান তুলছে, যে তান ছড়িয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরান্তরে।এক আশ্চর্য লোকগাথা তৈরি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। সেই লোকগাথার মধ্যে হয়ত লুকিয়ে আছে সাঁওতাল বিদ্রোহের দীর্ঘ ইতিহাস।চাঁদ,ভৈরব, শালগিরার ডাক, সিধু, কানু -সমস্ত কিছু যেন সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে তাদের।একদল কৃষ্ণবর্ণ মানুষ তারা দৌড়চ্ছে, হাতে তীর-ধনুক, বল্লম,কাঁড়-বাঁশ নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, দখলদার দিখুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য।
কোথায় যেন সেই আলো গিয়ে পড়ল আফ্রিকা মহাদেশে।সেখানকার কৃষ্ণবর্ণ মানুষ, কৃষ্ণাবর্ণা নারীরা সকলেই-নিজেদের বাজনা, গান, উৎসব, নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে সামিল করেছেন নিজেদের।তাহলে কী দাঁড়াল? কালো সত্যি সত্যিই জগতের আলো কী? না কী নয়, সত্যি সত্যিই জগতের আলো।তাকে বুঝবার জন্য চোখ, হৃদয়, মন প্রয়োজন।
তিনি বসেছিলেন রাজসভায়।সামনে তাঁর অসংখ্য দাস-দাসী।এবার তাঁরা যাবেন প্রসাধন-কক্ষে।সেখানে নিজের রূপ-চর্চা-রূপটান করবেন রানী ক্লিওপাত্রা। মিশরের নীলনদের হাওয়া ঝিনুকের গভীরে জমে থাকা জল সব- মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে ক্লিওপাত্রার রূপ চর্চায়।এন্টনি ক্লিওপাত্রার কালো রূপে মুগ্ধ।তাঁর কৃষ্ণরূপে বিমোহিত।তিনি জানতে চান এই সৌন্দর্যের আকর উৎস কী? কোন জগতের মধ্যে।ক্লিওপাত্রা তার কালো গালের অতি বিখ্যাত টোলে তরঙ্গ তুলে হাসলেন।সেই হাসিতে গাল- টোলের মাধুরী আরও বিস্তৃত হল।আবারও ক্লিওপাত্রা তার কালো গালের টোল- সৌন্দর্য নিয়ে হাসেন।
যজ্ঞবেদীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যাজ্ঞসেনী। তাঁর পঞ্চস্বামী দাঁড়িয়ে রয়েছেন একটু দূরে। যাজ্ঞসেনীর উন্মুক্ত পিঠ, পিঠের ওপর খোলা দীর্ঘ কেশমালা, অর্জুন এবং ভীম দুজনকে অনুরক্ত করছে যাজ্ঞসেনীর প্রতি।আমি তোমাকে জয় করে এনেছিলাম পাঞ্চালী।উচ্চারণ করলেন অর্জুন।আমি তোমাকে রক্ষা করেছি পাঞ্চালী। আমি তোমাকে রক্ষা করেছি যাজ্ঞসেনী,উচ্চারণ করলেন বৃকোদর- ভীম। আমি তোমাকে রক্ষা করেছি কুরুসভায়।বললেন শ্রীকৃষ্ণ,তোমার লজ্জা নিবারণ করেছি।দূরে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনি বললেন আসলে এই কালো মেয়েই আমার সখী।একে নিয়ে আমি সারাজীবন চলে যেতে পারি দূর থেকে দূরান্তে কোনো নিবিড় জীবনের আশায়,ভালোবাসায়,প্রেমে-প্রীতিতে।সব কিছুতেই আমার সখী পাঞ্চালী। আমার যাঁরা গোপিনী, আমার বিবাহিত দুই স্ত্রী - রুকমিণী ও সত্যভামা আর সেই সঙ্গে প্রক্ষিপ্ত বা যাই বলা হোক না কেন, শ্রীরাধিকা তো আছেনই।কবি কল্পনায়, কাব্যে,কিন্তু পাঞ্চালী তো একেবারেই স্বতন্ত্র। ঠিক করে বললে পাঞ্চালীও তাদের থেকে স্বতন্ত্র আমার কাছে। আমি তার সখা।আমার সে কৃষ্ণা।কৃষ্ণের কৃষ্ণা।অর্জুন আবারও বললেন আমি জয় করেছি তোমাকে। দ্রৌপদী, তুমি আমার হও।ভীম বললেন, আমি তোমায় রক্ষা করেছি যাজ্ঞসেনী। তুমি আমার হও।যুধিষ্ঠির, নকুল সহদেব- কেউ কোনো কথা বলতে পারছিলেন না।
আরও অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছেন, মহাবীর সূর্যপুত্র, সূতপুত্র কর্ণ।তার মুখেও কোনো কথা নেই।কর্ণ তার দীপ্তমান শরীর দিয়ে আলো ফুটিয়ে তুলতে তুলতে যাজ্ঞসেনীর দিকে তাকিয়েরছিলেন।সেই কালো মেয়ে অর্জুনকে বললেন, আপনি আমায় জয় করেন নি।সেই কালো মেয়ে বৃকোদরকে বললেন, আপনি আমায় রক্ষা করেন নি।আমি নিজেকে নিজে রক্ষা করেছি।আমার স্বভাব ধর্ম, আমার প্রেম, আমার শরীর, আমার মন, আমার সব মিলিয়ে আপনাদের ভালোবাসা।আপনাদের ভালোবেসে থাকা,বাঁচা। ভেবে নেওয়া আপনারাও আমাকে ভালোবাসছেন। এই সূত্র ধরে আমি নিজেকে জয় করেছি, রক্ষা করেছি।
দুই কন্যা দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার ধারে।একটু পরেই তাদের গাড়িটি এসে যাবে।কসমেটিকস- এর ব্যবসা করতে করতে বেশ খানিকটা টাকা ইনভেস্ট করে,ধারে ইনস্টলমেন্টে জিনিসপত্র কিনে, বেচে এখন তারা নিজেরাই নখরঞ্জনী,ওষ্ঠরঞ্জনী,বডিলোশন, সানস্ক্রিনলোশন আরও যা যা লোশন ইত্যাদি সমস্ত কিছু বিক্রি করে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এবং তাদের ব্যবসা-কসমেটিকস-এর ব্যবসা ক্রমশ ক্রমশ ফুলে-ফেঁপে উঠছে।তারা বিবাহের কথা বলে না, কিন্তু তারা যৌনতার কথা ভাবে।যৌনতা তাদের জীবনে আছে।সেই যৌনতার গল্প আরও কোনোদিন বলা যাবে।কোনো পছন্দের পুরুষ তাদের সঙ্গে সঙ্গত করলে জীবন মধুময় হয়ে ওঠে।সেই পুরুষ তাদের দেখে বলে না তোমরা বড্ড কালো।কী কালো গো তোমরা! এই কথা উচ্চারণ করেনা পুরুষেরা।ফলে দুই মেয়ে বেশ আছে।প্রবীর এবং শান্তার একটু চিন্তা এই মেয়েদের বিয়ে হল না।বিয়ে হলে ভালো হত।নাতি-নাতনি হত।কিন্তু দুই মেয়ের কোনো চিন্তা নেই। তারা দিব্যি ফুরফুরে আনন্দে, নিজস্ব ভাবনায় ব্যবসা-বাণিজ্য করে, চমৎকার আছে তারা।
সাঁওতাল পল্লীর বাঁধনা পরবের আশ্চর্য মাদল- ধ্বনি ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত চরাচরে। কৃষ্ণ বর্ণের মেয়েরা নাচতে নাচতে আসবের উল্লাসে জড়িয়ে ধরছে অন্য অন্য কৃষ্ণ বর্ণের পুরুষদের। সমস্ত আকাশ মথিত হয়ে আছে তারকা সৌন্দর্যে। কালো আকাশের ভেতর অজস্র তারা।মেয়েরা-সাঁওতাল রমণীরা, সাঁওতাল পুরুষেরা নাচতে নাচতে তারা হয়ে যাচ্ছে।
এই সমস্যা মধ্যবিত্তের। প্রবীর একদিন মনে মনে বলেছিল খবরের কাগজ পড়তে পড়তে।এই কালো মেয়ে ফর্সা মেয়ে...শান্তা বলল, না না সবটা তা নয়।আমাদের মধ্যে একটা ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল আছে। প্রবীর একদা রাজনীতি করা তার বউয়ের দিকে তাকাল।আমরা আসলে কালোকে নিয়ে চিন্তা করি।বারবার ঘৃণা করি।বিশেষ করে বিয়ের পাত্রী হিসেবে কালো মেয়েদের অজস্র কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করতে হয়। ভালোই হয়েছে।দুই মেয়ের বিয়ে হয় নি।
প্রবীর বিড়বিড় করে বলল- তাহলে কালীকে যে আমরা পুজো করি? এখানে অন্য অনেক কথা আছে।কালী কালো,কৃষ্ণ কালো, গোপাল কালো,আরও কোনো কোনো দেবদেবী হয়ত কালো।কিন্তু মানবজীবনের সঙ্গে দেবজীবনের তরঙ্গ একসঙ্গে মেলেনা।ফলে কালো দূরে থাকে। সংসারে কালো মেয়েকে অনেক টাকা পণ নিয়ে মুখ ব্যাজার করে বউ হিসেবে আনতে হয় এবং শ্বশুর-শাশুড়ি ভাবেন যে কালো মেয়ে এল।এবার এদের যে সন্তানাদি হবে নাতি- নাতনি সবাই কালো হবে।পুরো কালোর বংশ হয়ে যাবে আমাদের।এই অন্ধ ভাবনার গভীরতা এখন রয়ে গেছে আমাদের জীবনে।প্রবীর আর শান্তা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে একসময় চুপ করে গেল।দুই মেয়ে এসি গাড়ির মধ্যে চোখে সানগ্লাস দিয়ে নতুন কোনো বড় ব্যবসার কথা ভাবছিল মনে মনে।
.jpg)


0 comments: