সম্পাদকীয়















কোনও একসময় সেটি শিশুদের বিদ্যালাভের জায়গা ছিল। জানলা দিয়ে সূর্যের অপূর্ব মায়াবী আলো এসে পড়লেও ঘরটির ভিতরে এখন এক অপার্থিব শূন্যতা। দেওয়ালে, বোর্ডের ওপর নানান আঁকিবুঁকি এখনও সাম্প্রতিক অতীতের সাক্ষ্য দেয়। সবুজ সারিবদ্ধ বসার জায়গাগুলি এখনও প্রাক-হামলার সময়চিহ্ন বহন করছে। শুধু খুদে পড়ুয়াদের বদলে সেখানে কংক্রিটের স্তূপ। সমর্থিত বা অসমর্থিত (যাই হোক না কেন, তা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক) সংবাদ সূত্র অনুযায়ী ১৬৭ মৃত। সংখ্যায় কী বা এসে যায়! এই গণ শিশুহত্যার রক্তের দাগ যাদের হাতে, এখনও পর্যন্ত এই ঘটনার দায় স্বীকার করেনি তারা কেউই।

তিন সপ্তাহ হল একটি অশ্লীল, আরেক প্রাচীন সভ্যতা- লুপ্তকারী যুদ্ধ শুরু করেছে যুদ্ধবাজ, বর্বর দুই রাষ্ট্র। একাধিক সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত নাক গলানোর ক্ষেত্রে যারা তাদের নিজেদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এদের মধ্যে একটি জনগোষ্ঠী ছিল চরম নিপীড়িত, এখন তারাই নিপীড়কের ভূমিকায়। ইতিহাসের আশ্চর্য পট পরিবর্তন!

শাসনব্যবস্থার বদল? সে তো ঠিক করবে ভূমিপুত্রের দল। পৃথিবীতে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র গোষ্ঠীই কি ঠিক করবে, আরও কেউ সেই পথে এগোবে কিনা? বিপরীতে যারা পরমাণু শক্তিতে বলীয়ান, তারাও তো পারতেন মানবিকতার সার্বিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে সেই মহা-ধ্বংসের ভাণ্ডার নষ্ট করে ফেলতে! এর ফলে হল কী, দু'মাস আগে যে দেশটির সরকারের দিকে প্রায় তিরিশ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করার অভিযোগের তীরটি স্থির হয়ে ছিল, আজ তাদেরই সমর্থনে হাজার হাজার সাধারণ নাগরিক পথে নামছেন। এ এক অভাবনীয় পরিস্থিতি!

মুষ্টিমেয় অশুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মনুষ্য সম্প্রদায়ের এমন নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ বারংবার আমাদের ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার নিকষ অন্ধকার খাদে। নীরব দর্শকের ভূমিকায় আমরা এমন নিপুণ অভিনয় করে চলেছি বলেই ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান আর মধ্যপ্রাচ্যে এমন চতুর্থ শ্রেণীর নাটকের পুনরাবৃত্তি হয়। হতেই থাকে। এই 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস' থেকেই তো জন্ম নেয় 'সন্ত্রাসবাদ'। তখন আর তা কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না, সকলের কাছেই তা হয়ে দাঁড়ায় অনতিক্রম্য এক সমস্যা। সমগ্র মানবশরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে অনারোগ্য সেই মারণব্যাধি।

সুস্থ থাকুন। দায়বদ্ধ থাকুন।

শুভেচ্ছা নিরন্তর।

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সব্যসাচী মজুমদার








আমরা নিশ্চিত ছিলাম এ আই, চ্যাট জিপিটি, হোয়াটসঅ্যাপ, ঘিবলি ইত্যাদি দেখে আমাদের ধারণা হয়েছিল এ আই অন্তত মানুষের শিল্পের ওপর ইতর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারবে না। বিশেষত আমরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা আর‌ও নিশ্চিত ছিলাম যেই, এই প্রান্তিক ভাষার দিকে কতটাই বা আগ্রহ দেখাবে এ আই ! অন্তত যা নমুনা দেখছিলাম আমরা চতুর্দিকে। তাতে, আমাদের ধারণা দৃঢ় বদ্ধ হচ্ছিল যে, এ আই নিখুঁত হতে চায় বলেই সে শিল্পিত নয়। কিন্তু, আমাদের ধারণা ছিল না যে, এ আই বিবিধ রূপেই আমাদের চতুর্মাত্রিক পৃথিবীকে ঘিরে ধরছে। 

আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের ফোনে বা অনলাইন সংক্রান্ত যা কিছু করে চলেছি , বস্তুত এ আইয়ের নজরদারিতে। আর নজরদারিটা এমন‌ই যে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, আমাদের প্রতিটি কথা ও চিন্তা পরিণত হচ্ছে প্রাইম নম্বরের বিবিধ অ্যালগোরিদমে। ব্যাখ্যাত হচ্ছে, আবিস্কৃত হচ্ছে এবং তথ্য হিসেবে ধরা থাকছে এ আইয়ের বিশাল পরিসরে। কেবল ধরাই থাকছে না, ব্যবহৃত হচ্ছে আমাদের পূনর্নির্মাণের প্রকল্পে অথবা আমাদের‌ই বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে। কিরকম অস্ত্র! সেই অস্ত্রের স্বরূপ বোঝা যাবে যদি আমরা কবিতার দিকে তাকাই। 

কবিতা সবসময় প্রযুক্তির সঙ্গে দ্বিরালাপ করেছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাপনে যখনই অবকাশ, নিশ্চিন্ত অবকাশ তৈরি করেছে, মানুষ উদ্ভাবক হয়ে উঠেছে। উদ্ভাবনায় যোগ করেছে বিবিধ মাত্রা। এতো সরলীকরণ। কিন্তু, আমরা অস্বীকার করতে পারি না, যে, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তিগত জ্ঞান মানুষের যাপন ও যাপন সংক্রান্ত মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ ও প্ররোচিত করেছে। এবং এই প্ররোচনার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যদি সাব্যস্ত করি, তবে দেখব দৃষ্টি ভঙ্গির মাত্রা বদলের জন্য‌ও এই বৈজ্ঞানিক দর্শন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে তা আমরা তো বুঝতে পারি জীবনানন্দের কবিতা অনুসরণ করলে। 

আমরা যখন তাঁর সুররিয়ালিজমের ওপর আলো ফেলি, দেখি, উদ্ভট - অতিলৌকিক অনতিক্রম্য জগৎ অতিক্রম করে খুব বেশি করে প্রতিভাত হয় ডারুইনের জগৎ। পশু সেখানে মনুষ্যেতর নয়, মানুষেরই সমান্তরাল একটি সত্তা, একটি সমান্তরাল জগতের অধিবাসী হিসেবে উপস্থাপিত হয় ( এ বিষয়ে 'শতবছরে সুররিয়ালিজম' সংকলনে 'জীবনানন্দের সুররিয়ালিজম : মানুষের সমান্তরাল জগতের এক স্বতঃবিনির্মাণ' শীর্ষক নিবন্ধে বিশদ আলোচনা করা গেছে)। 'আটবছর আগের একদিন', 'বিড়াল', 'ঘোড়া' বিবিধ কবিতা যার সাক্ষ্য বহন করে। যখন,

'রক্ত ক্লেদ বসা থেকে ফের রৌদ্রে উড়ে যায় মাছি ' 

আমরা জীবনের দ্বিবিধ উৎসের প্রয়োগের এই মাত্রাভেদ দেখে যেমন বিমূঢ় হ‌ই, তেমন‌ই মাছি আমাদের এই 'ক্লান্ত… ক্লান্ত' মানব জীবনের কাছে একটি শাশ্বত সূর্যোদয় হয়ে থেকে যায়। বিস্মিত হ‌ই যখন জীবনানন্দ মাছির জীবনের বিস্তার রক্ত-ক্লেদের উৎস থেকে পৌঁছে দেন সূর্যোদয়ের ইতিবৃত্তে। একটি রূপ বিনির্মিত হয় আলোর সংজ্ঞায়। 

জীবনানন্দের পরবর্তী সময়ে আমরা এই বিজ্ঞান চেতনার ব্যাপ্তি লক্ষ করি বিনয় মজুমদারের কবিতায়। এ কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিনয় মজুমদার অবধি আসতে আসতে বাংলা কবিতার শরীরে বড়সড় একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে। ইতিমধ্যে মহাকাব্যের যুগ অবসৃত হয়েছে। কাব্যনাট্য, নাট্যকাব্য এবং দীর্ঘ কবিতা মূলত লিরিক ধর্মীতার ভেতরেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অনধিক কুড়ির আওতায় ঢুকে পড়েছে। কেননা, পত্রিকার দাবি মেটানোর একটা তাগিদ শুরু হয়েছিল উত্তর রৈবিক যুগ থেকেই।

বিনয় মজুমদারের কবিতায় বিজ্ঞান চেতনা সম্পর্কে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এবং এই প্রেক্ষিতটিও বিরাট। এই অবকাশে আলোচনা করা দুস্কর। তবে এ বিষয়ে তো আমরা সকলেই সহমত যে বিনয় মজুমদারের কবিতায় বিজ্ঞান কেবল প্রত্যক্ষ চিহ্ন হিসেবেই ব্যবহৃত হল না, বরং বিজ্ঞান দর্শন হয়ে উঠল,


"আর যদি নাই আসো,ফুটন্ত জলের নভোচারী
বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো না-ই মেশো,
সেও এক অভিজ্ঞতা ; অগণন কুসুমের দেশে
নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো
তোমার অভাব বুঝি ; কে জানে হয়তো অবশেষে
বিগলিত হতে পারো ; আশ্চর্য দর্শনবহু আছে
নিজের চুলের মৃদু ঘ্রাণের মতন তোমাকেও
হয়তো পাইনা আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি
অস্ফুট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,
গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে ।"(আর যদি নাই আসো)


বিনয় মজুমদারের কবিতা একটি ফটোগ্রাফি তৈরি করে, কেবল তাঁর বাস্তবিক অবস্থান নয়, কেবল তাঁর গ্রাম, পরিবেশ, পরিস্থিতি নয়, বিনয় মজুমদারের কবিতায় উপস্থাপিত হয় এমন একটি টপোগ্রাফি, যার অস্তিত্ব আমাদের চারপাশেই, অথচ, যাকে আমরা আবিস্কার করতে পারিনি কখনও। 

এই আবিস্কারের প্রবণতাই তো একটি কবিতাকে বিনির্মাণ আর পূণর্বিনির্মাণের দিকে ঠেলে দেয়। যে দ্বন্দ্বের অভিযোজনে‌ই কবিতা একটি কালিক পরিস্থিতি থেকে স্পর্শ করতে পারে আরেকটি কালিক পরিস্থিতিকে। ঠিক এই কথার সূত্রেই আমাদের মনে পড়ে মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতার কথা। বস্তুত শতবর্ষী মণীন্দ্র বোধহয় তাঁর দৃষ্টিক্ষেত্রকে বিস্তার করতে পেরেছিলেন মানুষের নিজস্ব গণ্ডি পেরিয়ে। যেমন আমরা যদি 'গণ্ডার' কবিতাটির কথা মনে করি কিংবা 'এখন ওসব কথা থাক' কবিতাটির কথা মনে করি, অনায়াসে দেখতে পাচ্ছি আমাদের পরিবেশের, পরিস্থিতির, ঘটমানতার গঠনতন্ত্র বদলে যাচ্ছে। আমরা এ কবিতার ওপর সুররিয়ালিজমের বা যে কোন‌ও রকম আলো ফেলে দেখতেই পারি। দেখব এ কবিতা প্রতিটি আলোকেই গ্রহণ করছে। কিন্তু, সবকিছু অতিক্রম করে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে একটি আবহমান সময়ের বহমান ও বিবর্তমান মনস্তত্ত্বের ধারাভাষ্য। কেবল তাই নয় সময়ের তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মূল সূত্রটি বলে রাখেন মণীন্দ্র এ কবিতায়,

"এক লক্ষ বছর সঙ্গে থাকার পর সাব্যস্ত হবে, তুমি আমার কিনা।
ওসব কথা এখন থাক।
এখন চলো মিকির পাহাড়ে বুনো কুল পেকেছে, চলো খেয়ে আসি।

লাল রুখু চুল
        সূর্যাস্তের মধ্যে...
          অর্কিডের উজ্জ্বল শিকড়ের মতো উড়ছে।
          —দেখি দেখি, তোমার তামাটে মুখখানা দেখি!

সূর্য এখনি অস্ত যাবে। পশুর মতো ক্ষীণ শরীরে আমরা হাঁটু পর্যন্ত জলস্রোত পেরিয়ে চলেছি—
                   জলস্রোত ক্রমশ তীর... কনকনে..."
 ( এখন ওসব কথা থাক )


বস্তুত পক্ষে এতক্ষণ আমরা কথা বলছিলাম, বিজ্ঞান কিভাবে বাংলা কবিতায় দর্শন হিসেবে উপস্থিত হয় — এ বিষয়ে। এ সম্পর্কে আর‌ও কথা বলা যাবে নির্দিষ্ট সূত্রে। এখন চলে যেতে চাইছি আরেক প্রসঙ্গে। বিশেষত যে সময়টি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পর সোসাইটি ৫.০-র দিকে ঝুঁকতে চাইছে। যে সময়টি তার নিজের গঠন ও গঠনের মনস্তত্ত্বকে বদলাতে চাইছে। অর্থাৎ দু'হাজার পনের সনের পরবর্তী সময়ে। 

আমরা যদি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে ভাবতে শুরু করি, তবে একটা বিষয় লক্ষ করতে পারব যে দু'হাজার দশ থেকে কুড়ি সময়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সময়টিকে সাহিত্যের প্রেক্ষিতে বিচার করলে দেখতে পাচ্ছি, দু'হাজার পনের পর্যন্ত প্রাধান্য পেত প্রিন্ট মাধ্যম। অরকুট, ফেসবুক কিংবা ওয়েবম্যাগ বা ওয়েবজিন তখন‌ও গুরুত্বহীন। দু'হাজার পনের'র পর কিন্তু অবস্থাটা দ্রুত বদলে যেতে শুরু করল। আন্তর্জাল মাধ্যম বেশি সক্রিয় হয়ে উঠল। প্রিন্ট মাধ্যম কিছুটা হলেও পিছনে সরল। এরসঙ্গে সঙ্গে আমরা যে ঘটনাটি লক্ষ করলাম তা হল অ্যালগোরিদমের দাবিতে কবিতার আকার বদলাতে শুরু হল। আমরা জানি ইতোমধ্যে মহাকাব্যের যুগ অবসৃত, নাট্যকাব্য-কাব্যনাট্য — অতিবিরল শিল্পে পরিণত। দীর্ঘ কবিতার চর্চা ক্রমশ প্রচ্ছন্ন, কবিতা মোটামুটি কুড়ি পঙক্তির হয়ে এসেছে। কেবল যে গঠনতান্ত্রিক প্রভাব লক্ষ করলাম — তার নয়। এক‌ইসঙ্গে আমাদের মনে রাখার দরকার — আমরা যখনই সমাজ মাধ্যমে বা ওয়েবজিনে আমার কবিতাটি প্রকাশ করছি, আসলে করছি একটি অফুরন্ত এবং বিস্তীর্ণ প্রচার মাধ্যমে। বিচিত্র ধরনের, বিচিত্র রসের প্রেমিক, বিবিধ অবস্থানের মানুষ কবিতাটির পাঠক হয়ে উঠছেন। এমন মানুষ পাঠক হয়ে উঠছেন, যাঁরা কবিতার প্রাথমিক পাঠক। কবিতার প্রতি আগ্রহ আছে কিন্তু খুব বেশি কবিতা পড়া হয়নি। তাঁরাও কেবল পাঠক নন, স্বাধীন মতামত দাতা ও রচনাটির বিচারক হয়ে উঠলেন। এবং মতামত অনেক সময় ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রচনাকারের চিন্তার অবস্থান থেকে বহু দূরের। ফলে এই ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা বা পাঠক প্রিয়তা কিংবা সম্ভ্রম অর্জনের জন্য কবিতা বদলাতে শুরু করল। সহজ দর্শন, সরল ভাষা এবং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারের প্রচ্ছন্ন বা উচ্চাবচতাময় ছন্দ সম্পন্ন কবিতা উপস্থাপিত হতে শুরু করল। পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করল। আমরা এক্ষেত্রে রুপি ক‌উরের কবিতাকে উদাহরণ হিসেবে ভাবতে পারি। এক‌ইসঙ্গে এও দেখা গেল কবিতার কূট, গহন, ইঙ্গিতবাহী রূপটি অবহেলিত চর্চায় পরিণত হল। 

এ আই ক্রমাগত শিখছে। বাংলার মতো জটিল ভাষা অর্জন করতে তার বেশ কিছু সময় লাগবে সন্দেহ নেই। কিন্তু, সেই সময় অনন্ত নয়। ছবি কিংবা ভাস্কর্যকে হুবহু অনুকরণ করতে শিখে গেছে। সম্প্রতি নেচার পত্রিকাও একটি সমীক্ষা করে দেখেছে, কবিতা রচনার ক্ষেত্রে এ আই খুব বেশি অমানবিক নয়।
"Study 1 showed that human-out-of-the-loop AI-generated poetry is judged to be human-written more often than poetry written by actual human poets, and that experience with poetry does not improve discrimination performance. Our results contrast with those of previous studies, in which participants were able to distinguish the poems of professional poets from human-out-of-the-loop AI-generated poetry16, or that participants are at chance in distinguishing human poetry from human-out-of-the-loop AI-generated poetry17. Past research has suggested that AI-generated poetry needs human intervention to seem human-written to non-expert participants, but recent advances in LLMs have achieved a new state-of-the-art in human-out-of-the-loop AI poetry that now, to our participants, seems “more human than human.”…"
( Brian Porter and Eduard Machery : article number - 26133: published - november 2024 : Nature)

আমরা আমাদের লক্ষ্য রাখতে চাইছি দ্বিতীয় উদ্ধৃত অংশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে। মোট দুটো স্টাডির প্রথমটিতেই আমরা এই বিষয়ে অবগত হতে পারছি যে, মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, জেদ,ঈর্ষা, কাতরতা, স্বপ্নকে স্পর্শ করতে পারছে এ আই। অনুবাদ করতে পারছে সে। ক্রমশ নিজেকে মানুষের অস্তিত্ব, অস্তিত্বের ইতিবৃত্তকে জেনে ফেলছে সে। হারারির ধারণাকে মান্যতা দিয়ে যদি আমরা নেচার কৃত দ্বিতীয় স্টাডির ফলাফল দেখি, 

Study 2 finds that participants consistently rate AI-generated poetry more highly than the poetry of well-known human poets across a variety of factors. Regardless of a poem’s actual authorship, participants consistently rate poems more highly when told that a poem is written by a human poet, as compared to being told that a poem was generated by AI.
 ( Brian Porter and Eduard Machery : article number - 26133: published - november 2024 : Nature)

খুব স্বস্তিদায়ক নয়। মানুষের শিল্পকে রচিত এই আই দখল করবে বটে, কিন্তু টিঁকিয়ে রাখবে কি ! 

এই প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে বলে নেওয়া ভাল যে, পূর্বোল্লিখিত কবিতার নতুন গঠন ও প্রবণতা কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেই উৎসাহিত করবে। কেননা, তারপক্ষে জটিল -কূট বিন্যাসের বদলে তাৎক্ষণিকভাবে স্পর্শকাতর কবিতাগুলিকে নকল করাই তার পক্ষে সহজ। এবং আমরা চমৎকৃত হয়ে দেখছি যে, অ্যালগোরিদম কিন্তু বাংলা কবিতাকে ঠেলে দিতে চাইছে সেদিকেই।

এখন প্রশ্ন হল—বিজ্ঞানের সঙ্গে কথোপকথনে সদা নিয়োজিত কবিতাকে, বাংলা কবিতাকেও কিন্তু শংকিত হয়ে থাকতে হচ্ছে একটা প্রশ্নে — মানুষের শিল্পকে কতদিন জায়গা ছেড়ে দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? কেননা, এই আই এখন নতুন স্বরূপ ধারণ করেছে। সে এখন আর নকল করতে সক্ষম মাত্র নয়, সে এখন সিন্থেটিক এ আইয়ে পরিণত। এমন এ আই যে মানুষের সমান্তরাল বাস্তবতার জন্ম দিতে সক্ষম। সে কবিতা লিখতেও পারদর্শী হয়ে উঠবে না — আমরা কি করে বলছি ? অন্তত এলিয়েন শক্তি হিসেবে সে ইতিমধ্যেই মানুষের প্রতি যে কৌতুহল দেখিয়েছে — তা যথেষ্ট এবং উদ্বেগজনক। 

তবে, সঙ্গে সঙ্গে একথাও ভরসা জোগায় যে মানুষের কৌতুহল ও কৌতুহলজাত উদ্ভাবনা তাকে স্বতঃবিবর্তনের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। এই বিবর্তন তাকে প্রতি মুহূর্তে নিজের কাছে অচেনা করে তুলেছে নিজেকে। একারণেই আমরা হয়তো আমাদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারব। এই কৌতুহল জাত স্বতঃবিবর্তনের মাধ্যমে। কেননা সেই বিবর্তিত মানুষ যেমন নিজের কাছে অচেনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছেও। আমাদের কাছে ভরসার জায়গা এটাই তৈরি হয়। তবে, আমাদের একটা মনে রাখার দরকার— কৌতুহলহীন অথবা ক্র্যাক রাইটিং বা জনপ্রিয় লেখার এখন যে প্রবণতা, সেই প্রবণতা কিন্তু কতদূর জারি থাকবে, তা কিন্তু চিন্তার অবকাশ তৈরি করতে পারে, আশংকার‌ও। মানুষের তালা চাবি যত মজবুত হবে, বিজ্ঞানের সঙ্গে তার যত কথোপকথন হবে, সে নিজের উদবর্তন তৈরি করতে পারবে। অন্যথায় কিন্তু, একদিন হোমো সেপিয়েন্স আক্ষরিক অর্থেই সংকটের মুখে পড়বে। বিজ্ঞান‌ই হবে তার সংকটের কারণ।

প্রবন্ধ - অনিরুদ্ধ গঙ্গোপাধ্যায়









সালটা ১৯৫৩ । তৎকালীন বর্মার ইরাবতী নদীতে একটি স্টীমবোট যাচ্ছিল দক্ষিণ থেকে উত্তরে মান্দালয়ের দিকে। নৌকায় অন্য সওয়ারিদের মধ্যে ছিল একটি মার্কিন পরিবার। রিভার ফলস্ শহরে উইসকনসিন স্টেট কলেজের ইওরোপীয় ও এশিয় ইতিহাসের অধ্যাপক কার্লটন সেসিল এমিস, তাঁর স্ত্রী, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরাজী শিক্ষিকা রাচেল অলড্রিচ এমিস, এবং তাঁদের তিন সন্তান। বড়টি পুত্র, তার নাম অলড্রিচ হেজেন এমিস, অন্য দুটি কন্যা। ছেলেটির বয়স তখন ১২ বছর।

কার্লটন ফোর্ড ফাউন্ডেশনের স্কলার হিসেবে বর্মায় এসেছিলেন। অন্তত সেটাই ছিল তাঁর বাহ্যিক পরিচয়। কিন্তু সেদিন নৌকাবিহারে পারিবারিক কথপোকথনের এক অসাবধান মুহুর্তে কিশোর এমিস জানল তার বাবার এক অন্য গোপন তথ্য। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ব্যাপারটা একটা অন্তরাল মাত্র, তার বাবা আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা সি আই এ’র গুপ্তচর। বারো বছরের ছেলেটি চমৎকৃত হয়েছিল, হয়তো অবচেতন মানসে পড়েছিল এক গভীর প্রভাব।

এর এক বছর আগে ১৯৫২ সালে কার্লটন যখন রিভার ফলস্-এ অধ্যাপনা করছেন, তখন এক ব্যক্তি সি আই এ’র তরফে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। সি আই এ’র বয়স তখন চার বছরও হয়নি। ফেডেরাল সরকার এই গোয়েন্দা এজেন্সিটিকে অন্যতম বিশ্বব্যাপৃত ও দক্ষ সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগী। চীন সদ্য কম্যুনিস্ট দেশে রূপান্তরিত হয়েছে, কোরিয়ায় অবারিত যুদ্ধ চলছে। দক্ষিণ এশিয়ায় সি আই এ’র উপস্থিতি অপরিহার্য্য হয়ে উঠেছে, এবং এশিয় মানসিকতা ও সংস্কৃতিতে অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন। আমেরিকার জাতীয় স্বার্থে কার্লটনকে নিয়োগ করতে তারা আগ্রহী। কার্লটন রাজী হন, এবং দু’বছর পরে বর্মায় সপরিবার পদক্ষেপ করেন।

বর্মায় কার্লটনের মেয়াদ ছিল বছর তিনেক। গুপ্তচরবৃত্তিতে তিনি মোটামুটি ব্যর্থই ছিলেন। কোন স্থানীয় এজেন্টও তিনি জোগাড় করে উঠতে পারেননি। আর ছিল তাঁর অত্যধিক মদাসক্তি, তিনি দিনে-দুপুরেও খোলাখুলি মদ্যপান করতেন। ফলত উপর্যুপরি নেতিবাচক মূল্যায়নের পর তাঁকে সদর দফ্তর ওয়াশিংটনের কাছে ভার্জিনিয়ার ল্যাংলেতে ফিরিয়ে আনা হয়।

কিন্তু এই কাহিনী কার্লটনকে নিয়ে নয়, তাঁর ছেলে অলড্রিচ এমিসকে নিয়ে, যার কার্যকলাপ পরবর্তীতে সি আই এ’র ইতিহাসে এক গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতির অবতারণা করেছিল।

-------------- ০ -------------

দেশে ফিরে অলড্রিচ এমিস হাই স্কুলে পড়াশোনা শুরু করে। সে সময় সি আই এ কর্মীদের সন্তানদের অস্থায়ী কাজ দেওয়া হত, মূলত ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পাকাপাকি ক্যাডার তৈরীর উদ্দেশ্যে। কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়ভার দেওয়া হত না। বেতনও হত অপ্রাকৃত, সরাসরি হাতে আসতো না, জমা থাকত নথিবদ্ধ ভাবে। পরে যদি ছেলেমেয়েরা সি আই এ-তে যোগদান করতো, তবে সেই সময় তাদের প্রশিক্ষণকালের খরচ-খরচা মেটানো হত এই জমানো ভার্চুয়াল অর্থের বিনিময়ে। ১৯৫৭তে স্কুলের সোফোমোর বর্ষে, অর্থাৎ চার বছরের হাই স্কুল জীবনের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে, গরমের ছুটিতে, অলড্রিচ সি আই এ-তে এই কাজে যোগ দেয়। পরপর তিনটি গ্রীষ্ম সে সেখানে কাজ করেছিল। কাজ বলতে, কাগজপত্র শ্রেণীবদ্ধ করে ফাইলভুক্ত করা।

স্কুলের পড়া শেষে ১৯৫৯ সালে এমিস শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে বিদেশী সংস্কৃতি ও ইতিহাস বিষয় নিয়ে পড়াশোনার জন্য স্নাতক স্তরে ভর্তি হয়। তখন আর একটি বিষয়ে তার বিশেষ আগ্রহ জন্মেছিল, তা হল থিয়েটার। পড়াশোনার থেকে বেশী সময় নাটকের আয়োজন আর মহড়াতে কেটে যেত। ফলে দ্বিতীয় বছরেই তাকে কলেজ থেকে বিদায় নিতে হল। তার পর শিকাগোতে একটি থিয়েটারে প্রযোজক পদে কিছু মাস চাকরী করল।

কিন্তু তার বাবা কার্লটন চাইছিলেন, ছেলের একটি স্থায়ী সরকারী চাকরী হোক। তিনি সি আই এ-তে তাঁর যোগাযোগের ব্যবহার করে অলড্রিচের জন্য একটি চাকরী জুটিয়েই ফেললেন। ১৯৬২ সালে ২৬ বছর বয়সে অলড্রিচ এমিস সি আই এ-তে যোগদান করল।

এই সময়ে তার অতীত জানার জন্য, এবং ভবিষ্যতের প্রতারণার সম্ভবনা যাচাই করার জন্য, এমিসের ওপর একটি পলিগ্রাফ টেস্ট করা হয়। তাকে প্রশ্ন করা হয়, সে অতীতে কোন অপরাধমূলক কাজ করেছে কি না। ওষধির ঘোরে এমিস স্বীকার করে, সে এমন একটি কাজ করেছিল বটে। সে আর তার এক বন্ধু মত্ত অবস্থায় এক ডেলিভারি কর্মীর সাইকেল চুরি করে ফুর্তি সফরে ঘুরতে বেড়িয়েছিল। এমন অপরাধকে গৌণ হিসেবে ধরা হয়েছিল, ভবিষ্যতের জন্য কোন ঝুঁকি বলে মনে করা হয়নি। বরং তাদের পেশায় সময়ে সময়ে আইন লঙ্ঘনও তো নিয়মসিদ্ধ।

সি আই এ-তে দীর্ঘ কর্মজীবন অতিবাহিত করবে, এমন ভাবনা এমিসের ছিল না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর হয় আর এক।

------------- ০ -------------

প্রথম কয়েক বছর যে কাজ তাকে দেওয়া হত তা ওই কলম পেষার বেশী কিছু নয়। কিন্তু তার আভ্যন্তরীন মূল্যায়ন ভালই হতে লাগল। আরও একটি লাভদায়ক সিদ্ধান্ত সে নিয়েছিল। চাকরীর সাথে সাথে জর্জ্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস নিয়ে পুনরায় স্নাতক স্তরের অধ্যয়ন শুরু করল, এবং ১৯৬৭ সালে ডিগ্রীও অর্জন করল। ফলস্বরূপ সে মধ্যবর্গীয় স্তরের কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের জন্য নির্বাচিত হয়ে তালিমও গ্রহণ করল।

প্রশিক্ষণ চলা কালীন তার পরিচয় হয় আর এক গুপ্তচর ন্যানসি জেগহবার্টের সঙ্গে, এবং দু’জনে ১৯৬৯ সালে পরিনয়সুত্রে আবদ্ধ হয়। কিন্তু সি আই এ-র নিয়ম ছিল, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একই অফিসে কর্মরত থাকা চলবে না। সুতরাং ন্যানসি পদত্যাগ করে।

তার পর এমিসকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হল তুরস্কে। সস্ত্রীক এমিস আঙ্কারাতে এসে পৌঁছল। তার কাজ ছিল সোভিয়েত গুপ্তচক্রের মধ্যে অনুপ্রবেশ করা। দু’জন বন্ধুর সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক স্থাপিত করে তাদের মাধ্যমে সে ‘ডেভ-জেনেক’ নামক কম্যুনিস্ট সংস্থার কতিপয় সদস্যকে হাত করতে সক্ষম হয়। তারা ‘যথেষ্ট মূল্যবান’ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হলেও এমিসের রিপোর্টে কিন্তু ‘সন্তোষজনক’ রেটিংই আসতে থাকল, তার বেশী কিছু নয়।

তার কারণ ছিল। বাবা কার্লটনের থেকে একটি বদভ্যাস সে বোধহয় উত্তরাধিকারসুত্রেই পেয়েছিল, তা হল মাত্রাধিক মদ্যপান। উচ্ছৃঙ্খল মদাসক্তি এবং বিশৃঙ্খল, বেপরোয়া আচরণ তাকে এবং তার সংস্থাকে ভবিষ্যতে একাধিক বার কেবল বিব্রতই করেনি, বিপদেরও সম্মুখীন করেছে। এই স্বভাব তার দাম্পত্য জীবনেও ছায়াপাত করতে লাগল।

আঙ্কারার কেন্দ্র অধিকর্তা ডুয়েন ক্ল্যারিজ লিখেই দিলেন, এমিস ‘ফিল্ড ওয়ার্ক’ অর্থাৎ ময়দানে নেমে কাজ করার উপযুক্ত নয়। এর মানে, বিদেশের মাটিতে সে সক্ষম হবে না, তাকে সদর কার্যালয়ে ডেস্কের কাজ দেওয়া হোক।

১৯৭২এ তাকে ল্যাংলেতে ফিরিয়ে আনা হল। হতোদ্যম এমিস পদত্যাগ করবে ভেবেছিল। কিন্তু সংসার তো চালাতে হবে। তাছাড়া, তাকে বসানো হল সোভিয়েত-পূর্ব ইওরোপীয় বিভাগে। আঙ্কারার কাজের সুত্রে সোভিয়েত চরদের বিষয়ে তার অনুসন্ধিৎসা ছিল। তাদের কিছু চর এমন ছিল, যাদের আমেরিকান অ্যাসেট, অর্থাৎ সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হত, তাদের থেকে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল। এমিসকে দায়িত্ব দেওয়া হল এই অ্যাসেটদের তত্বাবধান করা। সে রাশিয়ান ভাষা শিখতে লাগল। তার রিপোর্টে তাকে ‘স্বভাবত উদ্যমী’ বলা হলেও, তার সেই সুরাপানের স্বভাব নেতিবাচক দাগ হয়েই রইল। ১৯৭২এ এক ক্রিসমাস পার্টিতে সে এত বেশী মদ্যপান করেছিল যে তাকে সি আই এ-র নিরাপত্তা কর্মীরা এক রকম চ্যাংদোলা করে বাড়ী পৌঁছে দেয়। পরের বছর আবার সেই ক্রিসমাসের পার্টিতে মত্ত অবস্থায় এক মহিলা অফিস কর্মীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় ধরা পড়ে। গোপন নথিপত্র তাকে কেবল দেখার ছাড়পত্র দেওয়া হল, বহন করা বা প্রতিলিপি করার অনুমতি রইল না। অন্য দিকে, ব্যক্তিগত বৈবাহিক জীবনেও অশান্তি বাড়তে লাগল।

সাড়ে তিন বছর সদর কার্য্যালয়ে কাটানোর পর এমিসকে বদলি করা হল নিউ ইয়র্কে। সেখানে তার লক্ষ্য নির্ধারিত করা হয় জাতি সংঘ। নিউ ইয়র্কে থাকা কালীন দু’জন তাবড় সোভিয়েত কূটনীতিককে এমিস প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। একজন জাতি সংঘে নিযুক্ত পারমানবিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ সের্গেই ফেডেরেঙ্কো। অন্যজন জাতি সংঘের এক আন্ডার সেক্রেটারি-জেনারেল আর্কাডি শেভশেঙ্কো। এই শেভশেঙ্কো এমিসের সহায়তায় ১৯৭৮ সালে ঘর বদল করে আমেরিকার আনুগত্য স্বীকার করেন।

এত সাফল্য সত্বেও কাজেকর্মে অনিয়মানুবর্তিতা ও খাপছাড়া স্বভাব তাকে প্রায় ডোবাতে বসেছিল। একবার তো নিউ ইয়র্ক সাবওয়েতে গোপন কাগজপত্র সমেত ব্রীফকেস ফেলে এসেছিল। আভ্যন্তরীন গোয়েন্দা সংস্থা এফ বি আই তদন্ত করে নির্ধারণ করে যে সে নথিপত্রগুলি সৌভাগ্যক্রমে ফাঁস হয়নি। এই অপকর্মের জন্য তাকে মৌখিক ভর্ৎসনা দিয়েই রেহাই করা হয়। তা ছাড়া খরচাপাতির হিসেব দাখিলে তার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য হয়। তবে এ সব কিছু উপেক্ষা করে কর্তৃপক্ষ তার কাজের নিরিখে এবার আর তাকে নিরাশ করেননি। অন্য অনেক আধিকারিকদের টপকে এমিস পেল পদন্নোতি, এমন কি উপরি বোনাস।

যে এমিসকে এক সময়ে ‘ফিল্ড ওয়ার্ক’-এর অনুপযুক্ত বলে মনে করা হয়েছিল, ১৯৮১ সালে তাকেই মেক্সিকো সিটিতে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হল। মেক্সিকো সিটি সেই সময় সোভিয়েত গুপ্তচরদের কেন্দ্রবিন্দু। এদিকে এমিসের দাম্পত্য জীবনে টালমাটাল অবস্থা। সে প্রস্তাব গ্রহণ করল, কিন্তু ন্যানসি সঙ্গে যেতে রাজী হল না।

এমিস মেক্সিকো সিটিতে দু’বছরের মত ছিল। এই সময়টা তার পেশাদারী, এবং বিশেষ করে পারিবারিক জীবনে, এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়।

-------- ০ --------

মেক্সিকো সিটিতে এমিস উল্লেখযোগ্য কোন কাজই বিশেষ করতে পারেনি। সে বেশির ভাগ সময় তার গোপন অফিস কুঠুরীতে কাটাতো, বলা যায় প্রায় আলস্যভরে। অন্য দিকে তার মাতলামি সীমা ছাড়াতে লাগল। একবার মত্ত অবস্থায় বিপজ্জনকভাবে গাড়ী চালানোর অপরাধে অভিযুক্ত হয়। কূটনৈতিক নিরাপত্তা বা ডিপ্লোম্যাটিক ইমিউনিটি তাকে রক্ষা করে। আর একবার একটি কূটনীতিবিদদের সমাবেশে ঘোর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কিউবার এক অফিসারের সঙ্গে তুমুল বচসা প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সঙ্গীসাথীরা টেনে হিঁচরে তাদের আলাদা করে।

মেক্সিকোর কেন্দ্র অধিকর্তা সদর কার্যালয়ে রিপোর্ট পাঠান যে এমিসের চিকিৎসাভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন, তাকে ছুটিতে পাঠানো হোক। সি আই এ তেমন কিছুই করেনি। বরং মেক্সিকো থেকে ল্যাংলেতে ফেরার পর তার শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা করে বলা হয় যে তার মধ্যে বিশেষ কোন অস্বাভাবিকতা নেই, মদ্যপানের মাত্রা সময়বিশেষে একটু অতিরিক্ত হলেও তার কাজেকর্মে প্রভাব ফেলেনি। প্রথম বছর মেক্সিকো সিটিতে তার মূল্যায়ন মোটামুটি ‘সন্তোষজনক’ হলেও পরের বছর তা নেমে দাঁড়ায় ‘সাধারণ’ মানে।

মেক্সিকোতে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু করে উঠতে না পারলেও তার রোম্যান্টিক জীবন কিন্তু সক্রিয় ছিল। ততদিনে সে ধরেই নিয়েছিল ন্যানসির সঙ্গে বিয়েটা তার টিঁকবে না। এখানে থাকার সময়ে সে অন্তত তিনটি প্রণয়ঘটিত সম্পর্কে জড়ায়। এদের মধ্যে একটি সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়। মেয়েটির নাম রোজারিও কাসা দ্যুপে। সে মেক্সিকো সিটিতে কলম্বিয়া দূতাবাসে কাজ করত কালচারাল অ্যাটাচি হিসেবে। একটি কূটনৈতিক পার্টিতে এক সহকর্মীর মাধ্যমে দু’জনের পরিচয় ঘটে। সেই সহকর্মীটিই প্রাথমিকভাবে রোজারিওকে সি আই এ-কে সহায়তা করার জন্য পারিতোষিকের বিনিময়ে রাজী করিয়েছিল, কারণ মেক্সিকোর কূটনৈতিক মহলে মেয়েটির অনেক চেনা জানা ছিল। তাদের মধ্যে কে জি বি-র লোকও ছিল।

রোজারিওর সঙ্গে প্রেমঘটিত ব্যাপারটা বেশ ঝুঁকির ছিল। কারণ নিয়ম অনুযায়ী কোন বিদেশী নাগরিকের সঙ্গে প্রণয়লীলা, সি আই এ-কে না জানিয়ে, এমিসের চাকরী শেষ করে ফেলতে পারত। কয়েকজন সহকর্মী বিষয়টা জানলেও এমিস কিন্তু নিয়ম মাফিক আনুষ্ঠানিকভাবে কোন জ্ঞাপন কার্যালয়কে দেয়নি। সেখানে অন্যান্যদের মতই রোজারিও ছিল আর একটি সূত্র।

১৯৮২ সালে একবার এমিসকে অন্য একটি লাতিন আমেরিকান দেশে সেখানকার কেন্দ্রের সহ-অধিকর্তা করে পাঠানোর প্রস্তাব উঠেছিল, কিন্তু তার ওপরের কর্মকর্তারা তার আভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের নিরিখে সম্মতি দেননি। পরের বছর এপ্রিল মাসে সদর দফতরে এমিসের এক পূর্বতন সহকর্মী ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনস-এর দক্ষিণ-পূর্ব বিভাগে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য তাকে চেয়ে পাঠালেন। এই অফিসারটি নিউ ইয়র্কে এমিসের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, এবং এখন অপারেশনস বিভাগে উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন। এবার তাঁর প্রস্তাবে সম্মতি মিলল। ১৯৮৩র সেপ্টেম্বরে এমিস ওয়াশিংটন ফিরে গিয়ে সোভিয়েত-ভিত্তিক ক্রিয়াকলাপের প্রধান পদে বসল।

----------- ০ -----------

এই দায়িত্বে বিশ্বজোড়া সোভিয়েত গুপ্তচরদের কীর্তিকলাপের বিবরণী, যা কিছু সি আই এ-র কাছে প্রাপ্ত ছিল, সে সব অতি গোপন তথ্য এমিসের তত্বাবধানে এল। সেই সব চরদের মধ্যে ডজন খানেক ‘অ্যাসেট’ এমন ছিল যারা সি আই এ-কে সহায়তা করত। তাদের কীভাবে ব্যবহার করা যায়, নিজেদের তথ্যসম্পদ ও মানবসম্পদের নিরাপত্তা, কে জি বি এবং সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ জি আর ইউ-এর বিরুদ্ধে নতুন অভিযানকর্ম ইত্যাদি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গভীর গোপনীয় দায়িত্ব এমিসের নিয়ন্ত্রণাধীন হল।

এ ছাড়াও সে নতুন সম্ভাব্য সোভিয়েত সাহায্যকারী ব্যক্তিদের যাচাই করার কাজেও সহায়তা করত, কারণ দিনে দিনে সি আই এ-র ভেতরে তাকে একজন সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল। এই কাজের জন্য সে প্রায়ই সোভিয়েত দূতাবাস অথবা অন্য সোভিয়েত সংস্থার কার্যালয়ে যাতায়াত করত, সি আই এ ও এফ বি আই উভয়েরই জ্ঞাতসারে এবং অনুমতিক্রমে। এই সব দেখাসাক্ষাৎ হত গোপন পরিচয়ে, যার জন্য তাকে ছবি সহ নকল পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্রও দেওয়া হয়েছিল। এই নকল পরিচয় ছিল ইনটেলিজেন্স কমিউনিটির সোভিয়েত ভারপ্রাপ্ত অফিসার। এই ইনটেলিজেন্স কমিউনিটি সোভিয়েত সরকারী কর্মীদের সঙ্গে পারস্পরিক সুরক্ষা, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য বিনিময় করত, যে কাজে সন্দেহ উদ্রেকারী বিষয় নগণ্য। সোভিয়েত দূতাবাসে এমনই এক ব্যক্তি ছিলেন সের্গেই দিমিত্রিয়েভিচ শুভাখিন, যিনি সোভিয়েত বিদেশ মন্ত্রকের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত একজন আধিকারিক। এঁর সঙ্গে ছদ্ম পরিচয়ে এমিসের ১৯৮৪ সাল থেকে বারংবার যোগাযোগ হত।

এদিকে ন্যানসির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ১৯৮৩র অক্টোবরে তারা পাকাপাকিভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা জায়গায় থাকতে আরম্ভ করল। ন্যানসি নতুন চাকরী নিয়ে নিউ ইয়র্কে, এমিস ভার্জিনিয়ার ফলস্ চার্চ এলাকায়। পরের মাসেই রোজারিও এসে এমিসের সঙ্গে যোগ দিল। যে সংবাদ এতদিন সে সি আই এ’র থেকে গোপন করে রেখেছিল, এবার তা জানাতেই হল। একে বলা হয় দায়িত্ব-বহির্ভূত রিপের্ট, বা আউটসাইড অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট, যা তার সরকারী কাজকর্মকে প্রভাবিত করতে পারে কি না, তা যাচাই করার জন্য প্রয়োজন। পরের বছর ১৯৮৪র এপ্রিল মাসে এমিস সি আই এ-কে জানাল, কেবল সম্পর্ক চালিয়ে যেতে নয়, সে রোজারিওকে বিয়ে করতে চায়। রোজারিওরও নিয়মমাফিক পলিগ্রাফ পরীক্ষা হয়, এবং সে উত্তীর্ণও হয়।

কিন্তু বিয়ে করতে চাইলেই তো বিয়ে হবে না। ন্যানসির সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও বিয়ে তখনো অটুট। এমিস পরে জানিয়েছিল, ন্যানসি বিশেষ কোন বিরোধিতা করেনি, এবং সে’ই বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের করে ১৯৮৪র সেপ্টেম্বরে, মানসিক নিষ্ঠুরতার অভিযোগে। পরের বছর ১লা আগস্ট বিবাহ বিচ্ছেদ মঞ্জুর হয়, এবং তার ন’দিন পরই এমিস রোজারিওকে বিয়ে করে ফেলল।

এই সব যখন চলছে, এমিসের উচ্ছৃংখলতাও চলছে সমানে। অন্তত দু’বার তো তার কীর্তি গোপনীয়তাও বিপন্ন করতে পারতো। একবার এক সোভিয়েত সূত্রের সঙ্গে বসে অবাধ মদ্যপান করে সে হাজির হয় সি আই এ ও এফ বি আই কর্মচারীদের এক সফ্টবল ম্যাচে, এবং সেখানেও বসে আরও পান করতে থাকে। শেষে এমন মত্ত হয়ে পড়ে যে অন্যরা তাকে গাড়ী করে ঘর পৌঁছে দেয়। তার ব্যাজ, মেকি এবং আসল পরিচয় পত্র, গোপন নোটসহ কাগজপত্র ইত্যাদি মাঠেই ফেলে আসে। আর একবার নিউ ইয়র্কে কোন কাজে তার যাবার কথা ছিল, এবং থাকার ব্যবস্থা ছিল সি আই এর গেস্ট হাউসে। অন্য দুই আধিকারিকেরও সেখানেই থাকার বন্দোবস্ত হয়। এমিস সেখানে উপস্থিত হয় রোজারিওকে নিয়ে। অন্য দুজন কর্তৃপক্ষের কাছে আপত্তি করে খবর পাঠান, কারণ এতে তাদের পরিচয়, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারত। শেষমেশ এমিস ও রোজারিও হোটেলে গিয়ে ওঠে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এ সব আচরণ এমিসের কোন পেশাগত অসুবিধার সৃষ্টি করেনি।

এমিসের এই ধারাবাহিক ছন্নছাড়া ব্যবহার কিছুটা স্বভাবগত হলেও তার পেছনে বোধহয় মানসিক চাপও প্রচ্ছন্ন ছিল। ন্যানসি সহজেই ডিভোর্সে রাজী হয়ে গেলেও কোর্টে কঠিন আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবী রাখে এবং এমিসকে তা মেনে নিতে হয়। শর্ত অনুযায়ী পরবর্তী ৪২ মাস ধরে তাকে ৩০০ ডলার মাসোহারা দেওয়া, তাদের ক্রেডিট কার্ডের এবং অন্যান্য সব দেনা শোধের দায়িত্ব নেওয়া ইত্যাদি দায়ভার তাকে বহন করতে হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৪-৪৫ হাজার ডলারের ঝক্কি সে সময়ে কম ছিল না। অন্য দিকে রোজারিওর ছিল বেহিসাবী খরচ-খরচা করার প্রবণতা। প্রায়শই তার শপিং করার নেশা, নামিদামি ব্র্যান্ডের জিনিষপত্র কেনাকাটা করা এমিসের ক্রেডিট কার্ডের ধার বাড়িয়েই যাচ্ছিল। নতুন অ্যাপার্টমেন্টের জন্য আসবাবপত্র এবং একটি নতুন গাড়ি কেনার জন্যও বেশ কিছু ব্যয় হয়ে যায়। এমিসের দুশ্চিন্তা হল, এভাবে চললে অচিরেই সে দেউলিয়া হয়ে যাবে। এই সমূহ আর্থিক সঙ্কট থেকে কিভাবে অন্তত সাময়িক পরিত্রাণ পাওয়া যায়, সেই ভাবনা তাকে অহরহ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল।

১৯৮৫র এপ্রিল মাসে একদিন এমিস তার ঊর্ধতন কর্মকর্তাকে জানাল, সে সোভয়েত দূতাবাসে যাচ্ছে শুভাখিনের সঙ্গে আলোচনা করতে। শুভাখিনের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকার সে আগেই নির্ধারিত করে রেখেছিল। শুভাখিন ভেবেছিলেন, দুই দেশের নিরাপত্তা বিষয়ক কোন সমস্যা নিয়ে মন্ত্রণার জন্য এমিস আসছে। সি আই এ কর্মকর্তারা ভাবলেন, শুভাখিনকে সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করতে সে তার কাছে যাচ্ছে।

দূতাবাসের প্রবেশদ্বারে অভ্যর্থনা কর্মীকে এমিস তার নকল পরিচয় দিয়ে তার হাতে দিল একটি লিফাফা। বলল, সে দেখা করতে চায় শুভাখিনের সঙ্গে, কিন্তু ঐ খামটি পৌঁছে দিতে হবে এমন একজনের কাছে, যাকে সে দূতাবাসে কে জি বি-র ভারপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ অফিসার বলে চিনত। বেশি বার্তা বিনিময় হল না। অভিজ্ঞ অভ্যর্থনা কর্মী ইতিবাচক মাথা নাড়লেন। শুভাখিনের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো আগেই স্থির ছিল। তাঁর সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে এমিস বেরিয়ে গেল।

যে খামটি কে জি বি কর্তার হাতে পৌঁছল, তাতে ছিল দু’-তিন জন কে জি বি গুপ্তচরের নাম যারা সি আই এ-কে সাহায্য করছিল। আর ছিল সি আই এ-র ডাইরেক্টরি থেকে একটি পাতার অনুলিপি যাতে এমিসের আসল নাম ও পদ পরিচিতি ছাপা ছিল। এ ছাড়াও ছিল ইতিপূর্বে সোভিয়েতদের সঙ্গে যে ছদ্ম নাম ও পরিচয়ে সে যোগাযোগ করত, তার বিবরণ। এবং আরও একটি কাগজ ছিল, যাতে একটি টাকার অঙ্ক লেখা – ৫০,০০০ ডলার।

অলড্রিচ এমিস এক পিচ্ছিল, পঙ্কিল আবর্তে পা রাখল, যাকে বলে চরবৃত্তির দ্বিচারিতা।

-------- ০ --------

এমিস ভেবেছিল, কাজের খাতিরে উভয়পক্ষের অনেকেই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে এবং তা দুই দেশেরই গোপন গোয়েন্দা চক্রের অজানা নয়, তাই যে সোভিয়েত সূত্রদের নামগুলি সে ঐ খামে রেখেছিল, তা কে জি বি-র কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে না। বরং এই মওকায় যদি কিছু মুসকিল-আসান এককালীন রোজগার হয় তো মন্দ কি ? কিন্তু সোভিয়েত কে জি বি-র দুঁদে কেন্দ্রাধ্যক্ষ তার মধ্যে পড়ে-পাওয়া অসীম সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেখলেন।

কয়েক সপ্তাহ পরে শুভাখিন যোগাযোগ করলেন। তিনি এমিসের সঙ্গে আর একটি মিটিং ও মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানালেন। ১৫ই মে এমিস সোভিয়েত দূতাবাসে যেতেই তাকে শুভাখিনের বদলে অন্য একটি কামরায় নিয়ে যাওয়া হল। এক কে জিবি-র অফিসার সেখানে তার হাতে একটি চিরকুট দিলেন। তাতে লেখা, কে জি বি কর্তৃপক্ষ তাকে ৫০,০০০ ডলার দিতে রাজী হয়েছে। তবে তারা তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে চায়, শুভাখিনের মাধ্যমে। দু’দিন পরেই আবার শুভাখিন ডাক পাঠালেন। এবার তিনি এমিসের হাতে ধরিয়ে দিলেন নগদ ৫০,০০০ ডলার।

এর পর পিছিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, এমিসের ওপর কী যে ভর করল, পরবর্তীকালে সে স্বীকার করে যে তার উত্তর সে নিজেও জানত না। কে জি বি-র কাছ থেকে কোন তলব অথবা পারিতোষিকের প্রতিশ্রুতি ছাড়াই ১৩ই জুন সে আবার শুভাখিনের সাথে দেখা করল। এবার সে সঙ্গে এনেছিল প্রায় সাত পাউন্ড অর্থাৎ তিন কিলো ওজনের কাগজপত্র প্লাস্টিকের ব্যাগে করে। সি আই এ-র সদর দফতর থেকে অবলীলায় সে এই সব অতি গোপন ও সংবেদনশীল তথ্যপূর্ণ দস্তাবেজের প্রতিলিপি বার করে এনেছিল, কারণ তখন সি আই এ-র আভ্যন্তরীন কর্মীদের বেরিয়ে যাবার সময় সুরক্ষা পরতাল হত না। সি আই এ-র অফিসাররা পরে তদন্তকালীন সাক্ষ্য দেবার সময় জানিয়েছিলেন, সেদিনের সেই একটি মিটিঙে এমিস সি আই এ-র যে ক্ষতিসাধন করেছিল, সে পর্যন্ত তার কোন তুলনা ছিল না। ওই কাগজপত্রে ছিল দশ জন সোভিয়েত সামরিক এবং ইনটেলিজেন্স সূত্রের সি আই এ-কে এবং আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্রদের সহায়তা করার বিশদ বিবরণ। এদের মধ্যে কয়েকজন উচ্চ পদে আসীন ছিলেন, এমন কি খোদ মস্কোতেও।

১৯৮৬র জুলাই মাসে এমিসকে রোমে পাঠানো হয় সেখানকার সোভিয়েত-সংক্রান্ত কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য। ১৯৮৫র মে থেকে সেই পর্যন্ত সময়ে, সি আই এ-র আভ্যন্তরীণ লিখিত দলিল অনুযায়ী, সে অন্তত ১৪ বার শুভাখিনের সঙ্গে দেখা করেছিল। এমিসের নিজের ধারণা, আরও বেশিই হবে। নিয়ম অনুযায়ী, এই সব মিটিঙের লিখিত বিবরণী সি আই এ এবং এফ বি আই-কে পেশ করা দরকার। এমিস করতও বটে, কিন্তু শেষের দিকে সি আই এ-র ঊর্ধতনদের কেবল মৌখিকভাবে অবগত করেই ছেড়ে দিত। এফ বি আই থেকে লিখিত রিপোর্টের তাগিদ এলেও সে স্রেফ চেপে যেত, সি আই এ-ও কোন জোরজারি করত না।

এই সব মিটিঙে, অঢেল ভোডকার সহযোগে, সোভিয়েত সূত্রদের নাম ছাড়াও এমিস আরও অনেক গোপন তথ্য শুভাখিনকে সরবরাহ করেছিল। কোন্ কোন্ সোভিয়েত চর সি আই এ-র নিশানায় ছিল, নিজেদের এজেন্টদের পরিচিতি, দ্বৈত চরদের ক্রিয়াকর্ম, তার নিজের পূর্ব কাজকর্মের বিবরণ, সি আই এ-র কর্ম প্রণালী ইত্যাদি রত্নগর্ভ সব বিবরণী। ১৯৮৫র অগাষ্টে ভিতালি ইউরচেঙ্কো নামে কে জি বি-র এক কর্ণেল আনুগত্য পরিবর্তন করে সি আই এ-র ছত্রছায়ায় আসে। তাকে যে অফিসাররা বেশ কয়েকদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল তাদের মধ্যে এমিসও ছিল। এমন কোন আভাস সে পায়নি যে ইউরচেঙ্কোর কাছে এমিসের পর্দানসীন কীর্তিকলাপের কোন হদিস আছে যা সে সি আই এ-র কাছে ফাঁস করতে পারে। এতে সে নিশ্চিন্ত তো হয়েছিলই, ইউরচেঙ্কো যা সব তথ্য দিয়েছিল, তাও শুভাখিনের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। এই সময় একদিন ইউরচেঙ্কোকে যে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছিল, সেখানে এমিস রোজারিওকে নিয়ে পৌঁছে যায়। এই সুরক্ষা লঙ্ঘনের জন্যও সে সি আই এ-র কর্তাদের থেকে মৌখিক ভর্ৎসনার বেশী কোন সাজা পায়নি। এরপর সে বছর নভেম্বর মাসে ইউরচেঙ্কো পুনরায় আনুগত্য পরিবর্তন করে সোভিয়েত দূতাবাসে আশ্রয় নেয়। এমিসও আসন্ন রোম পোস্টিঙের জন্য ইতালিয়ান ভাষার ট্রেনিং-এ ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

সোভিয়েতরা এমিসকে টাকাকড়ির ব্যপারে নিরাশ করেনি। যদিও প্রথমবারের পর সে আর কখনো নিজের থেকে প্রতিদান দাবি করেনি, শুভাখিন কিন্তু বারংবার স্বহস্তে তাকে পুরস্কৃত করে গেছেন। সেই সব নগদ অর্থের পরিমাণ হত ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলারের মধ্যে। এমিস সন্দেহ এড়িয়ে চলতে অনেকগুলি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছিল। প্রত্যেকবার হাতে নগদ টাকা পেলে তা ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকাউন্টে জমা করত। ১৯৮৫র ডিসেম্বরে তাকে বলা হল, সে যদি তার সহায়তা ভবিষ্যতেও চালিয়ে যায় তবে অতিরিক্ত ২০ লাখ ডলার তার জন্য সংরক্ষিত করে রাখা থাকবে।

রোমে যাওয়ার আগে নিয়মমাফিক তার আর এক বার পলিগ্রাফ টেস্ট হয়। এই নিয়ে সে উদ্বিগ্ন ছিল। শুভাখিন তাকে সাহস যোগান, পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন শান্ত এবং সজাগ থাকার পরামর্শ দেন। এমিস এমনিতে খুব সহজেই মানুষজনের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার ও আন্তরিকতা প্রদর্শনে পারদর্শী ছিল, অভিনয় দক্ষতা তো ছিলই। পরীক্ষায় উতরে যেতে তার বিশেষ সমস্যা হয়নি।

রোজারিও ও এমিস ১৯৮৬র জুলাই থেকে ১৯৮৯র জুলাই পর্যন্ত রোমে ছিল। সেখানে এমিস সোভিয়েত সংক্রান্ত শাখার প্রধান হয়ে গিয়েছিল। এই দায়িত্বে তার নিয়ন্ত্রণে অজস্র গোপন তথ্য ও দস্তাবেজ আসে। সি আই এ-র সেখানকার যে সব কাজকর্ম সরাসরি তার আওতায় আসতো না, সে সব সম্বন্ধেও সে অফিসের অন্যদের থেকে নিয়মিত খবর সংগ্রহ করত। বলা বাহুল্য, এই সব বিষয়ে বহু তথ্য এবং কাগজপত্র পৌঁছে যেত কে জি বি-র কাছে। সেই একই পন্থা। কে জি বি-র সঙ্গে যোগসাজস বজায় রাখার জন্য সেখানকার সোভিয়েত দূতাবাসে একজন মধ্যস্থ ব্যক্তির নাম তাকে আগের থেকেই দেওয়া হয়েছিল, তাঁর নাম অ্যালেক্সি খ্রেনকভ, সাংকেতিক নাম স্যাম-২। সেই একই বাহানায়, অর্থাৎ স্যাম-২ কে সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে পরখ করার অছিলায়, তার ঊর্ধতনদের সম্পূর্ণ জ্ঞাতসারে, সে তার সঙ্গে বারংবার মিলিত হত। অফিস থেকে বেরিয়ে যেত থলে ভর্তি কাগজপত্র নিয়ে। প্রত্যেকবার তার হাতে চলে আসতো নগদ রাশি। সেই একই ভাবে রিপোর্ট দাখিল করতে গড়িমসি করত, কখনো করতও না। ততদিনে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, কাজকর্মের এবং আর্থিক খরচখরচার বিবরণী দাখিলে দীর্ঘসূত্রিতা তার স্বভাবজাত। যেমন তার মদাসক্তি। রোমেও মদ্যপান করে একাধিকবার গোলমেলে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। একবার তো এক পার্টিতে এক নিমন্ত্রিত অতিথির সাথে বচসা করে বেরিয়ে এসে ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তাতেই গড়িয়ে পড়ে এবং হাসপাতালে দাখিল হতে হয়।

স্যাম-২ ছাড়াও রোমে সরাসরি এক কে জি বি আধিকারিকের সঙ্গে এমিসের তিন বার মিটিং হয়। এঁর ছদ্মনাম ছিল ভ্লাদ, এবং তিনি মস্কো থেকে উড়ে রোমে আসতেন এমিসের সঙ্গে দেখা করার জন্য। এর থেকেই অনুমান করা যায় সে মস্কোর চোখে কতটা মূল্যবান হয়ে উঠেছিল। এই সাক্ষাৎ হত, অবশ্যই এমিসের সহকর্মীদের অজ্ঞাতে, সূর্যাস্তের পর। স্যাম-২ গাড়ী নিয়ে আসতেন তাকে নিতে। এমিস মুখের ওপর টুপিটা যথাসম্ভব নামিয়ে গাড়ীর সিটে গা এলিয়ে বসত, যাতে সহজে তাকে লোকে চিনতে না পারে। ভ্লাদের গুপ্ত আস্তানায় তিন-চার ঘন্টা ধরে কথাবার্তা চলত, এবং যথেচ্ছ মদ্যপানও। এমিসের কাছ থেকে সুকৌশলে তথ্য সংগৃহীত হত প্রধাণত সি আই এ-র সোভিয়েত ও পূর্ব ইওরোপ সম্বন্ধীয় ক্রিয়াকলাপ নিয়ে, তাকে পরবর্তী কার্যক্রম দেওয়া হত, এবং অবশ্যই যথেষ্ট অর্থ। তারপর তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হত।

এমিসের রোম অবস্থানের শেষ দিকের একটি মিটিঙে কে জি বি-র পক্ষ থেকে তাকে দু’টি নথি দেওয়া হয়। একটিতে ছিল সে পর্যন্ত তাকে দেওয়া অর্থরাশির হিসেব, যার অঙ্ক ছিল ১৮ লক্ষ ডলার। এবং জানানো হয় যে আরও ৯ লক্ষ ডলার মস্কো তার জন্য বরাদ্দ করে রেখেছে। দ্বিতীয়টিতে বলা হয়েছিল রোম ছাড়ার আগে তাকে আরও তিন লক্ষ ডলার দেওয়া হবে। তবে ওয়াসিংটনে ফিরে গিয়েও তাকে কিছু কাজ করতে হবে, কি ভাবে করবে তার কিছু নির্দেশিকাও ছিল।

এই অকল্পনীয় অর্থানুকুল্যের দৌলতে রোজারিও ও এমিস যে জীবনযাপন করত, এক কথায় তাকে বলা যায় রাজকীয়। তবে সতীর্থদের সন্দেহ এড়ানোর জন্য এমিস ওয়াসিংটনের এবং রোমের সহকর্মীদের কাছে রটিয়ে বেড়াত যে কলম্বিয়ায় রোজারিওর পরিবার যথেষ্ট ধনী, এবং তার শ্বশুরকুল নিয়মিত তাদের অর্থসাহায্য করে থাকে। রোমে তার সি আই এ-র কর্মীরা সকলেই জানত এমিসের খরচা করার হাত অবিশ্বাস্য, এই নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনাও হত। একবার এক নিরাপত্তা কর্মী তার ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা এবং মদ্যপানের স্বভাব নিয়ে তার ম্যানেজারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু ওই যে গল্প এমিস ফেঁদেছিল, তাই বিশ্বাস করে নির্ণয় করা হয় যে তাকে কোন নিরাপত্তা-সম্পর্কিত ঝুঁকি বলে মনে করা যায় না।

এমিস আরও ব্যবস্থা নিয়েছিল। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে সে দু’টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলেছিল, একটি নিজেদের নামে এবং আর একটি তার শাশুরির নামে যৌথ। রোমে অবস্থানকালীন সে রোজারিওকে নিয়ে কয়েকবার ইওরোপ ভ্রমণে গিয়েছিল। তাদের সূচীতে জুরিখ অবশ্যই থাকত। নগদ টাকা সঙ্গে করে নিয়ে তারা ঐ অ্যাকাউন্ট দু’টিতে বেশ বড় অঙ্কের রাশি রেখে আসত। পরে জানা যায়, এমিসের সুইস অ্যাকান্টেই প্রায় সাড়ে ন’ লাখ ডলার জমা ছিল।

এমিসকে রোমে পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক স্তরে ফিল্ড অপারেশনে পারদর্শিতা দেখিয়ে পদেন্নতি যাতে প্রশস্ত করতে পারে। কিন্তু তার ঊর্ধতনরা তাকে ‘সন্তোষজনক’-এর ওপরে মূল্যায়ণ করলেন না। বরং তার দীর্ঘসূত্রিতা এবং অত্যাধিক মদ্যপানের স্বভাব নিয়ে বিরূপ মন্ত্যব্য দেওয়া হল। পদোন্নতি পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর তার মাতলামির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

১৯৮৯র ২০শে জুলাই তাকে ওয়াসিংটনে ফিরিয়ে আনা হয়।

------------ ০ ------------

কে জি বি এমিসের একটি সাংকেতিক নাম দিয়েছিল – কলোকল। রাশিয়ান ভাষায় এর অর্থ ঘন্টাধ্বনি।

সে যখন সোভিয়েতদের কাছে ক্রমান্বয়ে কলধ্বনি করে চলেছে, তখন অচিরেই সি আই এর সদর কার্যালয়েও আশঙ্কার ঘন্টা বেজে উঠল। তার কারণ, দেশে বিদেশে যে সব সোভিয়েত পক্ষের সূত্ররা সি আই এ এবং মিত্র দেশগুলির গোয়েন্দা সংস্থাদের সহায়তা করছিল, তারা একে একে উধাও হয়ে যেতে লাগল। ১৯৮৫র শরৎকালে প্রথম আবিষ্কৃত হয় একজন গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের অন্তর্ধান। ১৯৮৬ জুড়ে ক্রমাগত সূত্রেরা স্রেফ গায়েব হতে লাগল। প্রথমে এদের সোভিয়েত রাশিয়ায় ডেকে পাঠানো হত। তারপর দ্বৈত চরবৃত্তি এবং দেশদ্রোহের অভিযোগ এনে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হত।

এমিসেরও আগে এডোয়ার্ড লী হাওয়ার্ড নামে সি আই এ-র আর এক পূর্বতন এজেন্ট কে জি বি-র ছত্রছায়ায় এসেছিল। তার গল্পটা ছিল একটু অন্যরকম। ১৯৮১ সালে নিযুক্ত এই ব্যক্তি ১৯৮৩ সালে একটি পলিগ্রাফ টেস্ট-এর সময় কিছু ক্ষতিকারক স্বীকারোক্তি করে বসে, যার ফলস্বরূপ তাকে বরখাস্ত করা হয়। ক্ষুব্ধ হাওয়ার্ড সিদ্ধান্ত নেয় যে সে বদলা নেবে। ১৯৮৫ সালে দেশে এবং দেশের বাইরে হাওয়ার্ড একাধিক বার কে জি বি-র সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং সি আই এ-র বেশ কিছু ক্রিয়াকলাপ নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যাদি তাদের অবগত করায়। যে ইউরচেঙ্কোর কথা আগে বলেছি, সেও জানিয়েছিল যে ‘রবার্ট’ নামের এক সূত্র কে জি বি-কে অনেক ভাবে সহায়তা করেছিল। সি আই এ এই সিদ্ধান্তে আসে যে এই ‘রবার্ট’ আসলে হাওয়ার্ড।

ইউরচেঙ্কোর সঙ্গে যখন সি আই এ দলের (যার মধ্যে এমিসও ছিল) সওয়াল-জবাব চলছে, ঠিক সেই একই সময় ভিয়েনাতে কে জি বি হাওয়ার্ডকে জানায় যে তার সম্বন্ধে অবহিত তাদের এক চর (ইউরচেঙ্কো) কে পাওয়া যাচ্ছে না, খুব সম্ভবত সে সি আই এ-র খপ্পরে। দেশে ফিরে ১৯৮৫র সেপ্টেম্বর মাসে হাওয়ার্ডকে এফ বি আই-এর জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হয়। তারা ইউরচেঙ্কোর দেওয়া বিবৃতি নিয়ে হাওয়ার্ডকে জেরা করে। এর দু’দিন পরেই হাওয়ার্ড হেলসিংকিতে পালিয়ে যায়, এবং অবশেষে সোভয়েত ইউনিয়নে আশ্রয় পায়।

সি আই এ-র প্রাথমিক সন্দেহ পড়েছিল হাওয়ার্ডের ওপরে। কিন্তু ১৯৮৬ জুড়েও ত্বরিত গতিতে যে সব সূত্রেরা অন্তর্হিত হতে লাগল, দেখা গেল তাদের দু’এক জন সম্বন্ধেই হাওয়ার্ড জানত, বাকিদের প্রসঙ্গে তার কোন ধারণা থাকাই সম্ভব ছিল না। সীমিত সময়ের মধ্যেই সি আই এ, এম আই ৬ এবং মিত্র এজেন্সীদের প্রায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন বানচাল হয়ে যায়। সোভিয়েতদের এই তৎপরতা নিয়ে এমিসও চিন্তিত ছিল, এবং তার কে জি বি পরিচালকদের কাছে আশঙ্কাও প্রকাশ করেছিল যে, এতে সন্দেহের তীর তার ওপর এসে পড়তে পারে। কে জি বি দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছিল, তারাও এমনটা আশা করেনি, এই সম্বন্ধে সব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের। তবে আশ্বাসও দিয়েছিল যে তার সম্বন্ধে কথা বলারও তো কেউ বেঁচে থাকছে না।

হাওয়ার্ডকে যখন হিসেবের বাইরে রাখতে হল, সি আই এ-র কর্তাব্যক্তিরা মনে করলেন, অফিসের মধ্যেই কে জি বি বোধহয় যান্ত্রিক উপায়ে গোপনীয়তার বর্ম ভেদ করেছে। গোয়েন্দা পদ্ধতির ভাষায় একে বলে ‘বাগ’ বা ছারপোকা ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু সব কার্য্যালয় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া গেল না। তখন এই সিদ্ধান্তে আসতেই হল যে ভেতরেরই কোন লোক জড়িত। তখন এক বিভাগ অন্য বিভাগকে দোষারোপ করতে লাগল। একের পর এক তদন্ত চলল, কমিটি বসল, রিপোর্ট এল, আধিকারিকদের বদলাবদলি হল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হল না। আড়াই-তিন বছর ধরে এই সব চালিয়েও বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ তাদের আভ্যন্তরীন ছুছুন্দরটিকে সনাক্ত করে উঠতে পারল না।

কে জিবি-ও এমিসকে আড়ালে রাখতে কম প্রয়াস করেনি। এই সব তদন্ত যখন চলছিল, তখন পারস্পরিক সংযোগকারীদের দিয়ে তারা ছড়িয়ে দেয় যে, সদর কার্য্যালয়ে নয়, সেই লোকটি আসলে আছে ভার্জিনিয়ায় উইলিয়ামসবার্গে তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেখানকার ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় করে পরিশ্রান্ত হয়ে শেষে রিপোর্ট পাঠালেন, ‘সব কটাকেই সন্দেহ হয়। কাকে ছেড়ে কাকে ধরব ?’ বেশ কিছুদিন ধরে তারা এও প্রচার করল, হাওয়ার্ডই আসল লোক। তারপর সন্দেহ ঘুরিয়ে দিল এই বার্তা দিয়ে যে, সি আই এ-র তথ্যাদি ফাঁস হওয়ার জন্য কোন মানুষ নয়, দায়ী আসলে তাদের ঢিলেঢালা কর্মপ্রণালী। তা বিশ্বাস করে সি আই এ-র কর্তারা সদর দপ্তরে কাগজপত্র বিনিময়, নিষ্কাশন এবং ব্যবহার করার ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে কিছু কড়াকড়ি জারি করলেন। যে সব সূত্ররা মস্কোতে বন্দী হয়েও তখনো জীবিত ছিল, তাদের দিয়ে তাদের সি আই এ বা এম আই-৬ সংযোগদের ফোন করে বলানো হল, তাদের আসলে কিছুই হয়নি এবং অচিরেই তারা সহযোগের কাজে ফিরে যাবে।

ওদিকে সূত্রদের অন্তর্ধান চলতেই থাকল।

--------------- ০ -----------------

এমিস ওয়াসিংটনে ফিরে আসার আড়াই বছর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। বিভাজিত দেশগুলিতে এবং পূর্ব ইওরোপে কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রগুলি আর রইল না। কে জি বি রূপান্তরিত হল রাশিয়ার এস ভি আর-এ। কিন্তু এমিসের সঙ্গে কে জি বি বা এস ভি আর-এর যোগাযোগ ক্ষুন্ন হয়নি।

সদর কার্য্যালয়ে ফিরে আসার পর সেখানকার দক্ষিণ-পূর্ব ইওরোপ দপ্তরের তৎকালীন অধ্ক্ষ্য তাকে নিতে চাইলেন না। তাঁর ঘোরতর আপত্তি সত্বেও সে পশ্চিম ইওরোপ সংক্রান্ত বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়, এবং পশ্চিম ও পূর্ব ইওরোপে সি আই এ-র সব ক্রিয়াকর্মের তথ্যই অবগত হয়। কিন্তু সেখানে সে মাত্র তিন মাসই ছিল। এর পর তাকে পাঠানো হল চেকোস্লাভাকিয়া বিভাগে। সেখানে তার মন বসল না। স্বাভাবিকভাবেই সে মনেপ্রাণে চাইচিল সোভিয়েত সংক্রান্ত কাজকর্ম, এবং বিভিন্ন স্তরে তার জন্য তদ্বির চালিয়ে যাচ্ছিল। এমন কি মস্কোতেও নিয়োগ চেয়েছিল। তবে এই চেক বিভাগে কাজের সময় অধস্তন অফিসাদের পদোন্নতি বিষয়ক এক কমিটিতে সে নিযুক্ত হয়, যার ফলে এইসব অফিসারদের কাজকর্ম সংক্রান্ত সমস্ত বিবরণ তার গোচরে আসে। সেই অধ্যক্ষের বিরোধিতার ফলে তাকে দক্ষিণ-পূর্ব ইওরোপ অবশেষে ছাড়তে হয়। সে একটা পদ জোটায় কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স দপ্তরে। এই বিভাগে দ্বৈত চরদের অপারেশন সম্বন্ধে অতি সংবেদনশীল তথ্য সে জেনে ফেলে। এক বছর সেখানে কাজ করার পর সে কোনভাবে আবার ফিরে আসে দক্ষিণ-পূর্ব ইওরোপ বিভাগে একটি কে জি বি সংক্রান্ত কার্যকরী গোষ্ঠির প্রধান হয়ে। সক্রিয় চরবৃত্তির ক্রিয়াকলাপে যুক্ত না হলেও দক্ষিণ-পূর্ব দপ্তরের অফিসারদের অপারেশন সম্পর্কিত বহু তথ্য তার বিচারাধীন থাকত। অবশ্য সেখানেও তাকে তিন মাসের বেশী রাখা হল না। ১৯৯১-র ডিসেম্বরে তাকে বদলি করা হল কাউন্টার-নারকোটিকস অর্থাৎ মাদক-দমন শাখায়। ঘন ঘন না হলেও, এর পরও তার সংযোগ চলত এস ভি আর-এর সঙ্গে।

ভেতরে ভেতরে এমিস সি আই এ এবং এফ বি আই-এর সন্দেহভাজনদের মধ্যে এসে গিয়েছিল, এবং কিছু কানাঘুষো এইসব বিভাগীয় উর্ধতনরা জানলেও, সঠিক নির্দেশনা না থাকায়, সংবেদনশীল এবং গোপন তথ্যাদি তার আয়ত্তের থেকে সীমায়িত করার কোন প্রচেষ্টা হয়নি।

-------------- ০ -------------

রোম থেকে ফিরে আসার পর দেশের মাটিতে সোভিয়েত চক্রের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ আর হত না। বার্তা এবং অর্থ বিনিময় হত এক অন্য পদ্ধতিতে। এমিস কোন একটি পূর্ব-নিরধারিত জায়গায় সংকেত চিহ্ন রেখে আসত যে গোপন তথ্য সংক্রান্ত কাগজাদি নিয়ে অন্য কোন জায়গায় রেখে দেবে। প্রথম জায়গাটিকে বলা হত ‘সিগনাল’ স্থল, এবং দ্বিতীয়টিকে ‘ডেড ড্রপ’ স্থল। ‘সিগনাল’ হত চক বা পেন্সিলের দাগ। কে জি বি এই সংকেত চিহ্ন দেখে নিয়ে মুছে ফেলত, তারপর ‘ডেড-ড্রপ’ সাইট থেকে কাগজপত্র উঠিয়ে আনত। পারিতোষিকের নগদ টাকাও এই ভাবেই হাতবদল হত। এই সব জায়গাগুলি ওয়াসিংটন ডিসি-র ভেতরেই অতি সাবধানতার সঙ্গে নির্বাচন করা হয়েছিল যেখানে নজরদারির সম্ভাবনা নেই, এবং আপাত পক্ষে নিরাপদ। এদের এক একটি সাংকেতিক নামও দেওয়া হত। যেমন ‘সিগনাল’ স্থলের নাম ‘স্মাইল’, ‘হিল’,‘ডেড-ড্রপ’ স্থলের নাম ‘ব্রীজ’, ‘গ্রাউন্ড’ ইত্যাদি।

মুখোমুখি সাক্ষাতও হয়েছিল, তবে বিদেশে। এই সময়ের মধ্যে এমিস বেশ কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণ করে, কখনও ব্যক্তিগত ভ্রমণ, কখনও কাজ-সংক্রান্ত সফর। এই মিটিঙগুলি ঘটেছিল ভিয়েনা, বোগোটা ও ক্যারাকাসে। ভিয়েনাতে তার পুরোনো বন্ধু কে জি বি-র ‘ভ্লাদ’-এর সাথে দেখা হয়, বোগোটাতে মিলিত হয় আর এক কে জি বি অফিসারের সঙ্গে যার নাম ‘অন্দ্রে’। এই সব মিটিঙে তথ্য এবং অর্থ বিনিময় তো হতই, তার সঙ্গে স্থির হত ওয়সিংটনে এবং বিদেশে কবে কোথায় পরবর্তী সময়ে আদান প্রদান হবে, তার খসড়া সুচী।

‘সিগনাল’ ও ‘ডেড ড্রপ’ পদ্ধতি এমিসের খুব একটা পছন্দ ছিল না। এর মাধ্যমে গোপন দস্তাবেজ এবং নগদ অর্থ দুয়েরই আদানপ্রদানের পরিধি সীমাবদ্ধ। একবার তো ‘সিগনাল’ স্থলে যে দাগ সে রেখে এসেছিল, পরে গিয়ে দেখল, সে দাগ তেমনই রয়ে গেছে, কে জি বির লোক তা মোছেনি। ফলে ‘ডেড ড্রপ’ স্থলে রাখা কাগজপত্র তাকে ফেরত আনতে হয়। সে কে জি বি-কে লিখে জানিয়েও ছিল, তার যে পরিমান টাকা প্রয়োজন, এই ব্যবস্থায় সে তেমন পাচ্ছে না। কিন্তু পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অন্য কোন সুযোগ ছিল না।

সি আই এ-র দপ্তর থেকে আগের মত থলিতে করে দিস্তে দিস্তে কাগজ বার করে আনার সুবিধাও তখন বিধিনিষেধের কড়াকড়ির জন্য আর সম্ভব ছিল না। এমিস অন্য উপায় করেছিল। অফিসের কম্পিউটার থেকে প্রয়োজনীয় দলিল, ই-মেইল, কেবল, সব ফ্লপি ডিস্কে কপি করে এনে বাড়িতে তার ব্যক্তিগত ল্যাপটপে ডাউনলোড করে নিত। ব্যক্তিগত কম্পিউটারে এ সব রাখা সুরক্ষারীতির ঘোরতর উল্লঙ্ঘন। একবার সে নিজের নিরাপত্তাও প্রায় বিপন্ন করে বসে। মাদক-দমন শাখায় যখন সে কাজ করছিল, সে সময় তুরস্কে এক কনফারেন্সে তাকে পাঠানো হয়। সে নিজের ল্যাপটপ সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। তার সাথে ছিলেন আর একজন ঊর্ধতন অফিসার। সেই ভদ্রলোক এক সন্ধ্যায় দেখলেন এমিস তার ল্যাপটপে গেম খেলছে। তিনিও খেলতে চাইলেন, এবং এমিস তাকে খেলতেও দিল। ঘটনাক্রমে সেই অফিসার দেখে ফেললেন, এমিসের ল্যাপটপ অতি গোপনীয় ও সংবেদনশীল নথিপত্রে ভরা। তার মধ্যে ‘ভ্লাদ’ শীর্ষক একটি ফাইলও ছিল, কিন্তু তিনি সেটি খুলে দেখেননি। ওয়াসিংটনে ফিরে তিনি এমিসের বিভাগীয় প্রধানকে এ কথা জানান। কিন্তু লিখিত অভিযোগ করেননি, কোন ব্যবস্থাও এমিসের বিরূদ্ধে নেওয়া হয়নি।

------------- ০ -------------

১৯৮৫-৮৬ সালের সূত্রদের অন্তর্ধান তদন্ত করতে সি আই এ একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করেছিল। ১৯৮৬ সালে এফ বি আই-এরও দু’জন সূত্র গায়েব হয়ে গেলে তারা সি আই এ-র সহযোগিতা চায়। বেশ কিছুদিন ধরে দুই পক্ষের মিটিং চলে। সংবেদনশীল তথ্যের অধিকারী হিসেবে এমিসের নামও পর্যালোচনায় ছিল। কিন্তু সি আই এ-র টাস্ক ফের্সের আধিকারিকরা তাদের আভ্যন্তরীন বিষয়বস্তু সম্পর্কে এফ বি আই-এর ‘অত্যন্ত জিজ্ঞাসু’ মনোভাব নিয়ে ঊর্ধতনদের কাছে নালিস করেন। সি আই এ অপারেশন সম্পর্কিত কোন ফাইল এফ বি আই-কে হস্তান্তর করতে অসম্মত হয়। এর মধ্যে আর একটি ঘটনা ঘটে। ভিয়েনায় ক্লেটন লোনট্রী নামে এক মেরিন সুরক্ষা কর্মী স্বীকার করে যে মস্কোতে কাজ করার সময় সে কে জি বি-কে সাহায্য করেছিল, মার্কিন দূতাবাসে ঢুকতেও দিয়েছিল। এই ঘটনা তোলপাড় তোলে, এবং পরে লোনট্রী সব কিছু আবার অস্বীকার করলেও, বেশ কিছুদিনের জন্য আদি বিষয় লক্ষ্যপটের বাইরে চলে যায়। ফলে যা হবার তাই হল। সি আই এ ও এফ বি আই-এর যুগ্ম তদন্ত এর পরেও চলতে থাকলেও তা ছিল নেহাতই গতানুগতিক, ঠোস কিছুই পাওয়া গেল না। এমিস পরে স্বীকার করেছিল, লোনট্রী তাকে সেবার বাঁচিয়েছিল।

১৯৮৯-এর নভেম্বরে এমিস রোম থেকে ফেরার কিছুদিন পর তার এক সহকর্মী সি আই এ-কে প্রথম অবহিত করে যে এমিস দম্পতি যে ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা নির্বাহ করে তা তার বেতনক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমিসদের সঙ্গে সে ভাল করেই পরিচিত ছিল। সে তাদের নতুন বাড়ী, গাড়ী, দামী আসবাবপত্র, ডিজাইনার পোশাক-আশাক, রন্ধন সামগ্রী ইত্যাদি কেনাকাটার এবং তাদের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়েও তথ্যাদি কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স দপ্তরকে ক্রমাগত সরবরাহ করতে লাগল। যা সব সন্দেহ উদ্রেককারী বিবরণ সামনে এসেছিল, তা এই রকম:

ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে ৫,৪০,০০০ ডলার দিয়ে কেনা বিলাসবহুল বাড়ি, যা পুরোটাই নগদ টাকায় কেনা, এবং যার জন্য সে কোন সংস্থা থেকে ধার নেয়নি। এমিস সবাইকে বলে বেড়াত, তাদের এক পুত্র সন্তান জন্মানোর পর রোজারিওর মামা খুশী হয়ে বোগোটায় তাদের সম্পত্তি উপহার দিয়েছিলেন, যা বিক্রী করে সে এই বাড়ি কিনেছিল।


তিন বছরের মধ্যে দুটি জাগুয়ার গাড়ী। প্রথমটি বেচে নতুন মডেলের দ্বিতীয়টি কিনেছিল ৫০,০০০ ডলার দিয়ে।


বাড়ির আভ্যন্তরীন পুনর্বিন্যাস ও আসবাবপত্রের জন্য ৯৯,০০০ ডলার খরচা।


মাসিক ৫,০০০ ডলারের টেলিফোন বিল। বেশীটাই কলম্বিয়ায় রোজারিও পরিবারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক দুরভাষ।


ফিলিপাইন্স থেকে আনা গৃহসহায়ক, যার অন্তর্রাষ্ট্রীয় যাতায়াত খরচা এমিসরা বহন করত।


মাসিক ক্রেডিট কার্ডের বিল জমা করার অঙ্ক এমিসের মাসিক বেতনের অধিক।


দাঁতের প্রসাধনী সৌন্দর্যবর্ধন, সস্তার পোশাক-আশাক থেকে হঠাৎ দর্জি দিয়ে বানানো স্যুট, রোজারিওর ডিজাইনার অঙ্গসজ্জা – ইত্যাদি।

অথচ এমিসের বাৎসারিক বেতন ৭০,০০০ ডলার কখনো অতিক্রম করেনি। সে এও খবর দিল যে কলম্বিয়ায় রোজারিওর পরিবার অত্যন্ত কিছু বিত্তশালী নয়। এই সব তথ্য যাচাই করার জন্য আভ্যন্তরীন সুরক্ষা বিভাগকে এমিসের আর্থিক অবস্থা ও লেনদেন ইত্যাদি বিষয়ে তদন্তের ভার দেওয়া হল। তদন্তকারী অফিসার কিছুদিন কাজ করার পরই প্রথমে একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে গেলেন, তারপর বদলি হয়ে গেলেন। বিভিন্ন আর্থিক সংস্থাও তাদের গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করতে অস্বীকার করে। সরকারী দপ্তরগুলি থেকে কিছু অঙ্ক পাওয়া যায়, কিছু আবার অজানাই থেকে যায়। তদন্তকারী অফিসার এমিসের কাছেও কিছু ফর্ম পাঠিয়েছিলেন ভর্তি করে ফেরত দেবার জন্য, যা সে কখনই দেয়নি। এই অফিসার তার পলিগ্রাফ টেস্টের পরামর্শ দেন। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এই আর্থিক তদন্ত চলে। শেষে অফিসার রিপোর্টে বলেন যে, এমিসের ধন-সম্পত্তির উৎস আরও তদন্তসাপেক্ষ, তবে গোয়েন্দা কার্য ব্যহত করতে পারে, এমন কোন সম্ভাবনা তিনি পাননি। কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স বিভাগ উপসংহারে আসে যে এই তদন্তে এমন কিছু পাওয়া যায়নি যা তাঁরা ইতিমধ্যেই জানতেন না।

পাঁচ বছর অন্তর যে নিয়মমাফিক পলিগ্রাফ টেস্ট হয়, ১৯৯১ সালে এমিস সে পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়। তার আর্থিক তদন্ত বিষয়ে পরীক্ষককে কিছুই জানানো হয়নি, তাই তিনিও তা নিয়ে কোন প্রশ্ন করেননি। বরং এমিসই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ব্যয়বহুল স্বচ্ছলতা বিষয়ে তার পুরোনো গল্প শুনিয়ে দেয়।

-------------------- ০ ------------------

ওদিকে সেই বছরই এপ্রিল মাসে সি আই এ-র দু’জন অফিসার, যাঁরা এফ বি আই-র সঙ্গে আগের যৌথ তদন্তে যুক্ত ছিলেন, তাঁরা এফ বি আই-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান যে সেই তদন্ত তাঁরা আবার পুনরুজ্জীবিত করতে চান। দুই এজেন্সিই সহমত হয় যে, যে ক্ষতি হয়েছে, তার শেকড়ে পৌঁছনো যায়নি মূলত উভয় পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার অভাবে। এবার নতুন উদ্দমে আবার তদন্ত শুরু হয়।

এই যুগ্ম গোষ্ঠি এবার ১৯৮জনকে সনাক্ত করে যাদের ১৯৮৫-৮৬ সালে সোভিয়েত সংক্রান্ত তথ্য এবং দস্তাবেজে ব্যবহারিক অধিকার ছিল। এদের মধ্যে ২৯ জনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়। অবশ্যই এমিসের নামও ছিল। একজন তদন্তকারী অফিসার সময় অনুসারে এমিসের কাজকর্মের সম্পূর্ণ তালিকা বানালেন। অন্যদের সাথে তারও জিজ্ঞাসাবাদ হল। নিজের ওপর সন্দেহ এড়াবার জন্য সে বলেছিল, অফিসের একটি আলমারি খোলা রেখে দেওয়ার জন্য তাকে নাকি দু’বার মৌখিক ভর্ৎসনা করা হয়েছিল। যেন সেই খোলা আলমারিই অনবধানে তথ্য ফাঁসের জন্য দায়ী।

যৌথ তদন্তকারীরা কিন্তু এবার আর অত সহজে বিভ্রান্ত হলেন না। ১৯৯৩এর মার্চ মাস পর্যন্ত পুরোদমে যৌথ তদন্ত চলল। তাঁরা অপারেশন ডিপার্টমেন্টের কম্পিউটার ঘেঁটে এমিস বিষয়ক সব তথ্য এবং নথি নিষ্কাশন করলেন। এফ বি আই-ও তাদের কাছে রাখা এমিসের সমস্ত পুরোনো রেকর্ড বার করে সি আই এ-র কাগজপত্রের সঙ্গে একটা সমন্বয় করার চেষ্টা করল। তা ছাড়া সব সন্দেহভাজনদের মধ্যে একমাত্র এমিসেরই ব্যাপক আর্থিক তদন্ত করা শুরু হল, কারণ এই ধন্দ কখনোই পরিষ্কার করা হয়নি। সি আই এ এই প্রথম সংবিধান প্রদত্ত অধিকার প্রয়োগ করে বিভিন্ন সংস্থা থেকে এমিসের জমা-খরচের বিষয়ে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করতে লাগল। যা সামনে এল, তা মোটামুটি এই রকম:

ওয়াশিংটন ও রোমে এমিস বারংবার সোভিয়েত যোগসূত্রদের সঙ্গে মুখোমুখি যোগাযোগ করেছিল, যার সব রিপোর্ট সে দাখিল করেনি।


ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণ সি আই এ-কে অবগত করানো নিয়ম হলেও অনেক বারই সে তা করেনি।


দেশে বিদেশে এমিসের ও রোজারিওর অনেকগুলি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ১৯৮৫ সালের পর থেকে তখন পর্যন্ত এই সব অ্যাকাউন্টে সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ লক্ষ ডলার জমা পড়েছে, যে অঙ্ক এমিসের বেতনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


শুভাখিন ও অন্য যোগসূত্রদের সঙ্গে মিটিঙের তারিখগুলির অব্যবহিত পরেই অ্যাকউন্টগুলিতে টাকা জমা হতে দেখা যায়।


ডলারের লেনদেন একাধিক ব্যাঙ্কের জটিল পথ পরিক্রমা করেছে, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি ব্যাঙ্কের যোগসূত্র পাওয়া যায়, সেটি জুরিখের ক্রেডিট সুইস ব্যাঙ্ক।


এমিসের কোন অ্যাকান্টে তার শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে কখনও কোন টাকা জমা হয়নি। বরং এমিসই তার শাশুড়িকে একাধিক বার মোটা অংকের টাকা পাঠিয়েছে।

১৯৯৩এর মার্চ মাসে এই যৌথ টীম তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। ততদিনে তারা প্রায় নিশ্চিত ছিল যে এমিসই সেই আভ্যন্তরীণ ছুছুন্দর। কিন্তু রিপোর্টে তারা কোন নাম উল্লেখ করেনি। তার দু’টি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত এমিস বা তার পরিচিতদের জানতে না দেওয়া যে তাকে নিয়ে সক্রিয় তদন্ত চলছে। দ্বিতীয়ত, তখনো পর্যন্ত এমিস ও সোভিয়েতদের সহযোগী কার্যকলাপের কোন অব্যর্থ সরাসরি সাবুদ তারা পায়নি। তবে বলা হল যে, ব্যক্তিটি নিশ্চিতভাবেই সি আই এ-র অন্দরমহলের কেউ, এবং যেহেতু এফ বি আই আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক তদন্তের অধিকারপ্রাপ্ত এজেন্সি, তাদের এই কাজ সমাপ্ত করতে দেওয়া হোক। সেই বছর মার্চ মাসে এফ বি আই এককভাবে তদন্ত হাতে নেয়।

তারা আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগ করল। এমিসের অফিসে ও বাড়িতে ইলেকট্রনিক নজরদারি বসানো হল। তার টেলিফোনে আড়ি পাতা হল। গাড়ির গতিবিধি অনুসৃত হতে লাগল। এমিসের অফিসে অনুসন্ধান করে ১৪৪টি অতি গোপনীয় নথি উদ্ধার করা হল যার অধিকাংশের সঙ্গেই তার অধীনস্থ কাজকর্মের কোন সম্পর্ক ছিল না। আবর্জনাদানি থেকেও ছেঁড়া কাগজ, টাইপ রাইটারের বাতিল রিবন ইত্যাদি সংগ্রহ করে তাদের পাঠোদ্ধার করা হতে লাগল। এমিসে বাড়িতেও তাদের অবর্তমানে তল্লাসি হল। ওদিকে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ আর্থিক তদন্তে পাওয়া গেল প্রায় সাড়ে তেরো লাখ ডলারের হিসাব বহির্ভূত আয়।

এই সব যখন চলছে, তখনও এমিস নিশ্চিন্তে কে জি বি-র সঙ্গে আদান-প্রদান চালিয়ে যাচ্ছে। ছেঁড়া কগজ, বাতিল রিবন থেকে এফ বি আই বোগোটা ও ক্যারাকাসে তাদের গোপন মিটিং সম্বন্ধে জেনে গেল। রোজারিওর সঙ্গে এমিসের ফোনালাপে আড়ি পেতেও এই মিটিঙের সম্বন্ধে আলোচনা পাওয়া গেল। আরও জানা গেল ‘সিগনাল’ ও ‘ডেড ড্রপ’ স্থলের হদিস। এমিসের গাড়ি অনুসরণ করে একটি ‘সিগনাল’ স্থলের কাছে তারা পৌঁছেও গেল, যেখানে একটি ডাকবাক্সে সকালে সে চকের দাগ রেখে এসেছিল, যা বিকেলে মুছে যায়। এমিসের কম্পিউটার থেকে বিভিন্ন ফাইল ঘেঁটে এই ডাকবাক্সটির উল্লেখ মেলে। কে জি বি-র সঙ্গে এমিসের সম্পর্ক বিষয়ে আরো বহু চাঞ্চল্যকর নথি পাওয়া যায়। যেমন গোপন যোগাযোগের ব্যবস্থাপনা, সি আই এ-র গুপ্ত অপারেশন, তাদের চরদের সম্পর্কে তথ্য, ইতিপূর্বে কে জি বি-র থেকে পাওয়া পারিশ্রমিকের হিসাবপাতি ইত্যাদি। সে সময় এমিসকে প্রায় ২৪ ঘন্টার অবিচ্ছিন্ন নজরদারিতে রাখা হচ্ছিল।

এফ বি আই অপেক্ষা করছিল শুধু একটি সুযোগের যেখানে তারা এমিস ও তার কে জি বি পরিচালকদের একসাথে হাতেনাতে ধরতে পারে। কিন্তু তেমনটি আর হল না। ১৯৯৪এর গোড়াতে যখন তারা জানতে পারল যে এমিস ফেব্রুয়ারী মাসে মস্কোতে একটি কনফারেন্সে যাচ্ছে, তখন স্থির করা হল যে আর অপেক্ষা করা যায় না।

---------------- ০ -----------------

প্রায় ন’ বছর ধরে অবিরাম বিশ্বাসঘাতকতা চালিয়ে যাওয়ার পর ১৯৯৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী আমেরিকার ইতিহাসে সব থেকে কুখ্যাত গুপ্তচর অলড্রিচ হেজেন এমিস এফ বি আই এ-র হাতে ধরা পড়ে। নিজের বাড়ির সামনে যখন সে তার সাধের জাগুয়ার গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল, এফ বি আই-এর গোয়েন্দা পুলিশের দল তাকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং গ্রেফতার করে। ‘তোমরা ভুল লোককে ধরছ’, এমিস চেঁচিয়ে বলেছিল।

কয়েক মিনিট পরে বাড়ির ভেতর থেকে রোজারিওকেও গ্রেফতার করা হয়।

একটা প্রশ্ন তদন্তকারীদের বিবেচনায় বরাবরই ছিল, রোজারিও এমিসের কার্যকলাপ সম্বন্ধে কতটা অবগত ছিল ? জিজ্ঞাসাবাদের সময় দু’জনেই দাবী করে যে ১৯৯২-এর গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত রোজারিও এ বিষয়ে কিছুই জানত না। একদিন এমিসের মনিব্যাগের মধ্যে থেকে একটি চিরকুট সে ঘটনাক্রমে দেখতে পায় যার থেকে সে বুঝতে পারে এমিস কে জি বি-র সঙ্গে এমন কিছু করে চলেছে যাতে তার নিজের এবং তার পরিবারের নামও ব্যবহৃত হচ্ছে। সে দাবী করে যে সে এমিসকে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছিল। কিন্তু এমিস তাকে বোঝায় যে এখন আর সরে আসার রাস্তা নেই, তা করলে তার নিজের জীবনও বিপন্ন হবে। তা ছাড়া বোগোটায় রোজারিওর মা-ও আর্থিক সংকটে পড়বেন। তারপর সে আর পীড়াপীড়ি করেনি। এফ বি আই দু’জনের টেলিফোন কথোপকথন থেকে জানতে পারে, বিদেশে কে জি বি-র সঙ্গে মিটিং নিয়ে, নগদ টাকা বিদেশ থেকে আনার বিষয়ে, ‘সিগনাল’ ও ‘ডেড ড্রপ’ স্থলে কার্যকলাপ সম্বন্ধে দু’জনের বার্তালাপ হত।

আদালতে বাদীপক্ষ এফ বি আই-কে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি, কারণ এমিস নিজের বিরূদ্ধে আনা সব অভিযোগ স্বীকার করে নেয়। ১৯৯৪ সালের ২৮শে এপ্রিল তাকে কখনো কোন রকম শর্তাধীন সাময়িক মুক্তিরও অধিকার-বঞ্চিত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি কারণ কোন কোন রাজ্যে বহাল থাকলেও জাতীয় স্তরে মৃত্যুদণ্ড তখনও লাগু হয়নি। সে বছরই পরে জাতীয় স্তরে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ সংক্রান্ত বিধিকে মঞ্জুরী দেওয়া হয়। রোজারিওকে গুপ্তচরবৃত্তিতে প্রতিপক্ষ দেশকে সহায়তা ও আয়কর ফাঁকির অভিযোগে ৬ বছর কারাবাসের সাজা দেওয়া হয়। তাদের পাঁচ বছরের ছেলেকে তার দিদিমা কলম্বিয়ায় নিয়ে চলে যান।

আদালতে এমিস খোলাখুলি জানিয়েছিল, তার জানা সি আই এ ও মিত্রশক্তিদের সাহায্যকারী প্রায় সমস্ত সোভিয়েত ও রুশ চরদের নাম সে কে জি বি এবং এস ভি আর-এর কাছে ফাঁস করেছিল। তা ছাড়াও আমেরিকার বিদেশ- ও প্রতিরক্ষা-বিষয়ক বিপুল পরিমাণ তথ্য সে সরবরাহ করেছিল। অনুমান করা হয়, তার কৃতকর্মের জন্য সি আই এ ও মিত্র এজেন্সিগুলির প্রায় শতাধিক অপারেশন বানচাল হয়ে যায়, এবং অন্ততপক্ষে দশ জন সূত্রের মৃত্যু হয়। ১৯৮৫ সালে লন্ডনে সোভিয়েত কে জি বি কেন্দ্রের প্রধান ওলেগ গর্ডিয়েভস্কি, যিনি গোপনে এম আই-৬কে সাহায্য করতেন এবং যাঁর নামও সম্ভবত এমিস ফাঁস করেছিল, আনুগত্য পরিবর্তন করার পরে একটি সাক্ষাতকারে জানিয়েছিলেন, এমিস যে বিশাল পরিমাণ তথ্য যুগিয়েছিল, তার গুরুত্ব ছিল অসীম। সোভিয়েত পক্ষ তাকে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গণ্য করতেন। বছরের পর বছর সি আই এ তাকে সনাক্ত করতে অসমর্থ হওয়ায় আমেরিকার কংগ্রেসে তুমুল শোরগোল ওঠে, এবং সি আই এ-র তৎকালীন ডাইরেক্টর জেমস ঊলসিকে কঠিন জেরার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি সাধ্যমত আত্মপক্ষ সমর্থন করে গেলেও পরে পদত্যাগ করেন।

আদালতে দন্ডাদেশ শোনানোর সময় এমিস এক অন্য তত্বের অবতারনা করে। রাগতস্বরে সে বলে, আমেরিকার গুপ্তচরতন্ত্র আমলাদের দ্বারা পরিচালিত এক লজ্জাজনক বিষয়, যার মূল্য এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমেরিকান প্রজন্মদের ধোঁকা দেওয়া হয়ে এসেছে। পরে কারাগার থেকে দেওয়া একাধিক সাক্ষাতকারে সে বলেছিল, তার বিশ্বাসঘাতকতার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল অবশ্যই আর্থিক। পরে এই কাজ সে চালিয়ে যায়, কারণ যে হারে সূত্ররা উধাও হচ্ছিল, তাতে সি আই এ-র থেকে কে জি বি-কেই সে বেশী ভয় করতে শুরু করে।

এমিসকে বিভিন্ন সর্বোচ্চ সুরক্ষিত কারাগারে রাখা হয়েছিল। ২০২৬এর ৫ই জানুয়ারী কাম্বারল্যান্ডের ফেডেরাল কারেকশনাল ইস্টিট্যুশনে ৮৪ বছর বয়সে অলড্রিচ এমিসের জীবনাবসান হয়।


অলড্রিন হেজেন এমিস


এমিস, রোজারিও ও তাদের পুত্র



সিগনাল সাইট - ডাকবাক্সে চকের দাগ



এমিসকে গ্রেফতার করা হচ্ছে



এমিস ও রোজারিওকে কোর্টে দাখিল করা হচ্ছে



প্রবন্ধ - সনাতন সিংহ








কলকাতা যে ভেনিস হওয়ার নয়, তা জানা ছিল সবারই। সাধারণ থেকে আবহাওয়াবিদরাও সে ধারণায় ছিল বদ্ধ পরিকর। কিন্তু তাদের সেই ধারণার ধারাপাতকে ভুল বলে প্রতিষ্ঠিত করল বৃষ্টির বর্ণমালা। পুরো কলকাতায় শুধু দুয়ারে নয়, চৌকাঠ ডুবিয়ে দরবার করল ছলাৎ ছলাৎ করে। সঙ্গে আবার সুরোধনীও নেমে এল জোয়ারে জোয়ারে। তবে ভাগীরথের পূর্ব পুরুষদের উদ্ধারে নয়। অমাবস্যার হাত ধরে মেঘমল্লারের গণ-সমাবেশে।

বানভাসি হল কলকাতা। ডুবে গেল, ভেসে গেল শরৎচন্দ্র, শরদিন্দু, বিদ্যাসাগর, জগদীশ গুপ্তরা। সাঁতার দিল ব্যোমকেশ। আরো আরো অনেকেই। কফি হাউস চত্তর ছেড়ে পিচের উপর উর্মিমালার চপল ছন্দে যেন মরণ আড্ডা দিল বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি, স্প্যানিশ, জার্মানি ছাড়াও অন্যান্য অক্ষরেরা। সলিল সমাধি হল ছাপা অক্ষরের। আগমনীতেই বিসর্জন হল শারদীয়া পত্রিকাগুচ্ছের। দম বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিল হাজার হাজার পাঠ্যপুস্তক। অক্ষর শিল্পের কারিগর, কর্মচারী এমনকি তাদের মালিকরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তাদের সেই মৃত্যুকে। নালায় মিশে গেল বর্ণমালা। ইতিহাস তৈরি করল বৃষ্টি। আটাত্তরের ইতিহাসকে মলিন করে নতুনভাবে ইতিহাস লিখল তিলোত্তমা। নিম্নচাপের উস্কানিতে মেঘেরা দল বেঁধে নেমে পড়ল কল্লোলিনীর বুকে। তলিয়ে গেল ছাপাযন্ত্র, কম্পিউটার, পাণ্ডুলিপি। অক্ষরদের টেনে নিয়ে গেল গঙ্গার বুকে।

গত আমফানে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বই পাড়ায়, তাকে এবার টপকে গেল কলেজস্ট্রিট। লে-আউটের পর লে-আউটে জমা জল। সংরক্ষিত ছিল লেখকদের ছাপানো অক্ষরের প্রতিলিপি। যার মধ্যে কোনোটা আবার যন্ত্রের বুকে থেকে বেরিয়ে এসেছিল প্রিন্টের শরীরে মলাটবদ্ধ হয়ে। আবার অপেক্ষায় ছিল বা কোনোটা। তারাও, তারাও অনেকেই প্রাণ হারাল বৃষ্টির কাছে। ডুবিয়ে দিয়ে গেল তাদের সৃষ্টি সম্ভারকে। কর্মচারী বা মালিক, প্রকাশকদের হাত পড়ল মাথায়। ছোটো থেকে মাঝারি, বা বড়ো ব্যবসায়ী সকলেই হা-হুতাশ করল নিরুপায় হয়ে। কেউ কেউ আবার চোখের জলে নিজের সর্বনাশের দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলকে। রাতেই অনেকে গিয়ে ছিল পড়িমরি করে, যদি কিছু রক্ষে হয়। কিন্তু পেরে ওঠেনি তখন। ভোরে যখন নাভি সমান জল, দুপুরেও তা প্রায় কোমর। ঢেউ চলল সদ্য জন্মানো ভেনিসের বুকে।

কার বই কার সঙ্গে মিশে গেছে, তা নিজেরাও ঠিক করে উঠতে পারেনি। কারোর বা র‍্যাকের পর র‍্যাক ডুবে ছিল বইয়ের স্তূপে। কারোর বা ছোটো দোকান উল্টে ভাসছিল মৃতের মতো। বাসের আনা-গনায় ঢেউ চলল জোরে। ধাক্কা দিয়ে দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাদের। জল, বই, অক্ষর মিলেমিশে একাকার। কলেজস্ট্রিট ভরে গেল ভাসমান বইয়ের মিছিলে। চারদিকে যখন পূজো পুজো গন্ধ তখন কলেজ স্ট্রিটে কান্নার রোল। হাহাকারের বাতাস। বইপাড়ায় শোক নামল চোখের জলে। ফোঁটা ফোঁটা বেদনারবিন্দু মিশে গেল জমা জলে।

সালটা তখন ১৮১৭। ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে তৈরি হল হিন্দু কলেজ। এই কলেজ লাগোয়া, (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) রাস্তাই কলেজস্ট্রিট নামে খ্যাতি অর্জন করে। কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, ওয়েলেশলি স্ট্রিটের নাম বদলালেও কলেজস্ট্রিট স্বমহিমায় জীবিত রইল আগের নামেই। তারই পাশাপাশি গড়ে ওঠা একের পর এক কলেজ ও বিশ্ব-বিদ্যালয়।

এই রাস্তাই প্রাণকেন্দ্র। গড়ে ওঠে বই-দোকান। প্রথমে পুরনো ও দুর্লভ বইয়ের পসরা নিয়ে বসলেও তা কলেবরে বৃদ্ধি পায় ধীর গতিতে। প্রথমে অনেকেই চট পেতে বই বিক্রি করতে শুরু করেন। একটা বইয়ে জন্য অপেক্ষা করতে হত অনেকক্ষণ। অনেকেই পড়ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

১৮৪৭, তার প্রায় শুরুর দিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজেই এগিয়ে এলেন। গড়ে তুললেন বইয়ের দোকান 'সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি'। ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটির ছাপাখানা কলেজস্ট্রিট চত্তর লাগোয়া। ইংরাজি বই সেই সময় তারাই ধারাবাহিকভাবে ছাপতে শুরু করে। ১৮২৬ সালেও তারাও তৈরি করে বইয়ে দোকান। ইংরাজি বইয়ে অন্যতম জোগানদার তারাও। পুরানো ব্যবসায়ীদের মধ্যে গিরিন্দ্রনাথ মিত্র ও উপেন্দ্রনাথ ধর উল্লেখ্যযোগ্য।

কিন্তু আজকের বই-পাড়ার সঙ্গে পার্থক্য ছিল বিস্তর। এর যাত্রা শুরু প্রায় আশির দশকে। থ্যাকারের ডাইরেক্টরি থেকে জানা যায়, সেই সময় বইয়ের দোকান ছিল খান-সাতেক। কন্স ডাইরেক্টরি আবার অন্য কথা বলে, তখন দোকানমাত্র দুটো। তবে মতান্তর থাকলেও তার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে ১৮৯৯ সালে। বেড়ে হয় ছত্রিশ। এস. কে. লাহিড়ী, দ্য ক্যানিং লাইব্রেরি, দ্য চ্যাটার্জি ব্রাদার্স, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, দাশগুপ্তা এন্ড কোম্পানি ছাড়াও আরো অনেকেই তখনকার দিনে অন্যতম পুরনো।

প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে নানান প্রকাশক ও বইয়ের দোকান। কোনোটা ছোটো, কোনোটা আবার বড়ো। আনন্দ, পত্র ভারতী, দেব সাহিত্য কুঠির, সাহিত্যম ছাড়াও অনেক অনেক প্রকাশক। সার দিয়ে রয়েছে রাস্তার দুধারের ফুটপাত জুড়ে। কত শত বই-ওয়ালা, বিক্রেতা। কেউ কেউ আবার ফুটপাতের বুকেই কাতারে কাতারে বিছিয়ে দেয় পুরানো বই। অনেকে পড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আবার দরদাম করে ব্যাগবন্দী করে অনেকেই।

পাঠ্য বইয়ে ঠাসা দোকান, ফুটপাত। স্কুল, কলেজের পড়ুয়া, শিক্ষক- শিক্ষিকা, পাঠক-পাঠিকা, সাহিত্যিক কারা আসে না সেখানে? লক্ষ লক্ষ টাকার বই। প্রীতি-উপহার, পাঠ্য-পুস্তক বা নিজের জন্য বই কিনতে হাজির হয় সেখানে। রাস্তা জুড়ে শুধু বইয়ের গন্ধ। তারই একদিন আন্তর্জাতিক শ্রীবৃদ্ধি হল, ২০০৭। কলেজস্ট্রিটকেই টাইম ম্যাগাজিন 'এশিয়ার সেরা' বলে স্বীকৃতি দিল। আপ্লুত সকলে। ধন্য হল শিক্ষা-সাহিত্যের পীঠস্থান।

তবে এই বইপাড়াই বিশ্বের দ্বিতীয় ও ভারতের বৃহত্তম বই-বাজারও বটে। পাঠ্য বইয়ের সঙ্গে দেশ-বিদেশের বিপুল ভাণ্ডার। শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রাণ কেন্দ্র এই কলেজস্ট্রিট। সম্প্রতি এই সব দোকানের সঙ্গে নতুন নতুন প্রকাশক-বিক্রেতা আবার নতুন ঠিকানা পেয়েছে, বিদ্যাসাগর টাওয়ারে। কিন্তু চলতি পথে কলেজস্ট্রিটের দোকানরাই বেশি উপযোগী ও সহজলভ্য অনেকের কাছে।

ইদানিং অনলাইনে বই কেনার প্রবণতা লক্ষ্যনীয়। কেউ কেউ আবার বইয়ের চাহিদা মেটাচ্ছে পিডিএফে। তার কারণ অবশ্য ভিন্ন। ছাপা খরচ বেড়েছে। দাম বেড়েছে কাগজের। ছাপানো বইয়ের বিকল্পে ডিজিটাল বই প্রকাশের দিকে এগিয়েছে প্রকাশক থেকে লেখক। তবুও ছাপানো অক্ষরের মহত্ব তার তুলনায় অনেক বেশি অনেকের কাছে।

বইমেলা বই বিক্রীর অন্যতম একটা মাধ্যম। এই কলেজস্ট্রিটের অনেক প্রকাশক-ব্যবসায়ী হাজির হয় লক্ষ লক্ষ পাঠক ও ক্রেতার কাছে। কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা ছাড়াও জেলায় জেলায় সেই উৎসবে তারাও থাকে বইয়ের সম্ভারে। কিন্ত ওটুকু ছাড়া সারা বছর জুড়ে তারা কিন্তু পড়ে থাকেন এই বই-পাড়ায়।

শহরের উত্তরে কলেজস্ট্রিটের এই পসরা প্রায় দুশো বছরের। দক্ষিণে গড়িয়াহাট থেকে গোলপার্কের ফুটপাতেও পুরনো বইয়ের সম্ভার চোখে পড়ার মতো। ক্রেতাকে হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে থেকে ঝেড়ে মুছে হাতে তুলে দিচ্ছে অমূল্য সম্পদ। তেমন ছবি দেখা যায় মির্জা গালিব স্ট্রিটেও।

সেসব ভাণ্ডার অমূল্য। কিন্তু প্রাণ-ভোমরা, কলেজস্ট্রিট ডুব-সাঁতার দিয়েছে কালো পিচের সমুদ্রে। সে ক্ষতি অপরিমেয়। যে অক্ষর জলে ভেসে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না কল্লোলিনীর বুকে।


ধারাবাহিক - নন্দিনী সেনগুপ্ত






















১৯

বের্নহার্ড ঘড়ির দিকে একঝলক তাকায়… ‘লোকে ভাবতে পারে যে আমরা রুগি… মানে ডাক্তার দেখাতে এসেছি।’ চার্লসের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল।

বিষণ্ণ, গম্ভীরমুখে চার্লস গভীর মনোযোগ সহকারে আদর্শ পিতামাতার করণীয় বিষয়ে শিক্ষামূলক চার্টগুলো ঝুঁকে পড়ে দেখছিল।

ঠিক তখনই দরজাটা খুলে গেল এবং জেরাল্ড ঘরে প্রবেশ করল। দ্রুত ছেলেদের দিকে এগিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বিশেষ উষ্ণতার সঙ্গে তাদের স্বাগত জানাল। বিস্ময়ে বের্নহার্ড একটু অপ্রস্তুত বোধ করতে লাগল। লাল হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। পাস্‌সিতে প্রথম দিনে সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে এই ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার। এখনও পরিষ্কারভাবে সেদিন বিকেলের সব খুঁটিনাটি কথা তার মনে আছে। সে সবে বাজাতে শুরু করেছিল। বাজাতে বাজাতে আবেশে চোখ বন্ধ করেছিল সে। হঠাৎ এক ফাঁকে চোখ খুলতেই সে দেখেছিল এক অপরিচিত আগন্তুক নিবিষ্টমনে তাকে নিরীক্ষণ করে চলেছে। সেই মানুষটিই জেরাল্ড। জেরাল্ডের চোখের দৃষ্টিটা অদ্ভুত মনে হয়েছিল বের্নহার্ডের। তার মনে হয়েছিল কী যেন এক গভীর অনুভব আছে সেই দৃষ্টিতে, যে অনুভব উঠে এসেছে এক মহান বিষাদের অতল থেকে।

কিন্তু জেরাল্ড কি তাকে চিনতে পেরেছে? জেরাল্ড প্রথমে চার্লসকে অভিবাদন জানায়, তারপর এই ছোট্ট চেহারার ব্লন্‌ড ছেলেটির দিকে তাকায়। তার চাহনিতে কোনও বিস্ময় নেই, বরঞ্চ এক বন্ধুত্বপূর্ণ অনাবিল হাসিতে সে বুঝিয়ে দেয় যে সে বের্নহার্ডকে বিলক্ষণ চিনতে পেরেছে…

-“আমি কবে থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি” জেরাল্ড বলে যায়… “যদিও আপনার শিক্ষকের কাছ থেকে আপনার বিষয়ে সব খবরাখবর আমি পেয়ে যাই। আপনি দ্রুত উন্নতি করছেন শুনেছি। আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি এ কথা শুনে।”

চার্লস সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দু’জনের দিকেই। জেরাল্ড সেটা লক্ষ্য করে ছেলেদের ডেকে নেয় তার এপার্টমেন্টের ভিতরের দিকে। ইথানল আর কার্বলিকের গন্ধে ভারি একটা আধো-অন্ধকার ঘরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় তারা। ঘরটা একেবারে ফাঁকা, কিছু সাদা রঙের আসবাব আর ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য একটা চওড়া উঁচু বেড রাখা আছে। ঘরটার মেঝে ঠাণ্ডা, মসৃণ, পা ফেললে কোনও শব্দ হয় না। ঘরটার জানালাগুলোর পাল্লা অর্ধেকটা টানা।

“এটা আমার রুগি পরীক্ষার ঘর”… জেরাল্ড বলে যায়… “আপনাদের কোনও প্রয়োজনে আমার কাছে আসতে পারেন।”

হে পাঠক, এখন আপনি বের্নহার্ডের সঙ্গে জেরাল্ডের এপার্টমেন্টের একদম ভিতরে প্রবেশ করছেন। ডাক্তারের এই আলোআঁধারি ঘরের দুই পাল্লার স্লাইডিং দরজা ঠেলে আপনি এসে দাঁড়িয়েছেন একটা অপেক্ষাকৃত ছোট ঘরের মধ্যে, যেটার দেওয়ালে ম্যাট ফিনিশ করা অপূর্ব নীল রং। অথচ দেওয়ালে কোথাও কোনও ছবি ঝুলছে না। বের্নহার্ডের মনে পড়ল যে বাইরের যে ঘরে বসে তারা অপেক্ষা করছিল, সেই ঘরের দেওয়ালে অনেক সুন্দর অয়েলপেইন্টিং ফ্রেম করা আছে। তাছাড়া বেশ কিছু স্কেচ এবং উডকাটের কাজও আছে সেই ঘরে। কিন্তু এই ঘরে সেরকম কিছুই নেই। দেওয়াল একেবারে ফাঁকা। ঘরের মাঝখানের অংশটাও একদম ফাঁকা। ফলে ঘরটা বেশ বড় দেখাচ্ছে। ঘরের একদিকের দেওয়ালে একটা ডিভান রাখা আছে, ডিভানের উপরে ফক্স ফারের ঢাকনা। আরেক দিকের দেওয়ালে লাগোয়া একটা টেবিল, সেটাও ম্যাটপালিশ করা। সেটার উপরে একটা ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, এক কিশোরী কন্যার মূর্তি, দু হাত ছড়ানো, হাঁটুদুটি খুব সরু, শিশুর মত। মাথাটা একদিকে কাত করা, এক অদ্ভুত বিষাদের অভিব্যক্তি মুখমণ্ডলে।

মনে হচ্ছে যে এই ঘরে কেউ বাস করে না। হয়তো এটা একটা প্রদর্শনীকক্ষ। কিন্তু যে কেউ ভাবতে পারে যে ঘরের আসবাবসজ্জা এখনও অসম্পূর্ণ। জেরাল্ড এই ঘরে দাঁড়ায় না। একঝলক তাকায় ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটার দিকে, তারপর বলে ওঠে… “এখানে অপেক্ষা থেকে যায়।” ছেলেরা এই কথাটার অর্থ বুঝতে পারে না। এর পর আপনি জেরাল্ডের নিজের ঘরটা দেখতে পাবেন। মৃদু আলোয় আলোকিত বড় ঘরটির মেঝে ধূসর কার্পেটে ঢাকা। দেওয়ালগুলিতেও একই রং এবং সরু কাঠের ফালি দিয়ে দেওয়ালের বর্ডার করা। এই ঘরেও খুব বেশি আসবাব নেই। একটা বিশাল পিয়ানোর উল্টোদিকে একটা টেবিল ভর্তি কাগজপত্র, একটা চওড়া ডিভান। তবে এই ঘরের ডিভানে ফক্স-ফার নয়, হালকা ধূসর রঙের কম্বল আর বালিশ রাখা। ডিভানের পাশে একটা নিচু গোলটেবিলে ফুল সাজানো আছে ফুলদানিতে। ফুলদানির পাশে সিগারেট। গোলটেবিলের পাশে একই রকম নিচু নিচু কিছু চেয়ার আছে ধূসর ভেলভেটে ঢাকা। সরু কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো বেশ কিছু ছবি এলোমেলো ভাবে দেওয়ালে টাঙানো, সেগুলো দেখে বের্নহার্ডের একটু অদ্ভুত মনে হল।

ছবিগুলো শুধুমাত্র অল্পবয়সী বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের, সাদা কলারওয়ালা জামা সবার পরনে। একঝলক দেখে যে কারো মনে হতে পারে যে তারা সবাই ভাই- বোন, মুখের যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। সবারই চোখ বড় বড় এবং চোখ বিশেষ বড় করে খুলে ছবিগুলো তোলানো, যাতে চোখের মণিগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সবার মুখেই একটা অদ্ভুত বেদনাদায়ক উদ্বেগের অভিব্যক্তি।

কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় যায় যে এই সাদৃশ্যটা মুখের আদলে নয়, সম্ভবত সবারই কাছাকাছি বয়স, একই প্রকৃতির প্রাণশক্তির উচ্ছ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে। প্রায় একই ধরনের ভঙ্গিমায় ছবিগুলি তোলা। কিছু মেয়ে খুবই সুন্দরী। ম্যাডোনার মত একটু পাংশু গাত্রবর্ণ এবং হাসির মধ্যে বিষণ্ণ গাম্ভীর্য মিশে আছে সবারই। হাতগুলো অনেকেরই পূর্ণযৌবনা নারীদের মত সমান এবং সুন্দর। একমুহূর্তের জন্য বের্নহার্ডের তার পুরনো বন্ধু হান্সের মায়ের কথা মনে পড়ল। হান্সের মায়েরও এমন সুন্দর, সাদা, মখমলের মত মসৃণ হাত।

এছাড়াও আরও কিছু মুখমণ্ডলের ছবি আছেঃ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে চেয়ে থাকা কিছু মুখ। চোখগুলো বড় বড়, উজ্জ্বলভাবে পুরোটা খোলা, ঝকঝকে মুখ, সাহসী কপাল, যেন অচিরেই তাদের ভবিষ্যতের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ হতে চলেছে, সত্যি হতে চলেছে তাদের স্বপ্নগুলো।

বের্নহার্ড ঠিক বুঝতে পারছে না এই মুখগুলো ছেলেদের নাকি মেয়েদের। সবগুলো মুখ একইরকম দেখাচ্ছে, কারণ সবারই মুখে একই ধরনের ধার্মিক স্থৈর্য এবং বীরত্বের দীপ্তি। তাদের কাঁধগুলো সরু ধরনের এবং সবাই সামনের দিকে ঘাড় উঁচু করে আছে। মনে হচ্ছে তারা যেন অনেক আশা নিয়ে বিশেষ কোনও প্রতিশ্রুতির কথা শুনছে। তাদের সরু কাঁধ, আশাবাদী ভঙ্গিমা বের্নহার্ডকে স্পর্শ করছে। সে জানে না কেন তার মনে কষ্ট হচ্ছে এদের ছবি দেখে। হঠাৎ তার গের্টের কথা মনে পড়ল। যদিও তার মুখে কখনোই ধার্মিক স্থৈর্যের লেশমাত্র ছিল না, কিন্তু হঠাৎ গের্টের কথা মনে পড়াতে এক অদ্ভুত বিষাদ তার মনকে আচ্ছন্ন করল।

কিছু বাচ্চার হাত অদ্ভুত ধরনের। শান্ত ম্যাডোনাসুলভ মেয়েদের যেরকম নরম সাদা হাত, সেরকম নয় একেবারেই। বড়, চওড়া পরিণত ধরনের হাত। দেখে মনে হয় বলিষ্ঠ, তরুণ ক্রুসেডারেরা যে ধরনের হাত দিয়ে তরোয়াল ঘোরাতে সক্ষম ছিল, ঠিক সেই ধরনের হাত কিছু বাচ্চার। তবে তাদের হাতের মধ্যেও একই রকম প্রাণচঞ্চল মসৃণতা রয়েছে। যদিও ভঙ্গিমার মধ্যে এটা পরিষ্কার যে হয়তো অনেক কষ্ট এবং বেদনার অভিজ্ঞতা আছে এদেরও। সম্ভবত অল্প বয়সেই এরা জেনে গিয়েছে জীবনের অনিশ্চয়তা।

একটা ছবির সামনে বের্নহার্ড একটু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। কী পেলব, নমনীয়, মিষ্টি মুখ! তবে এই মুখটাও ছেলে না মেয়ের মুখ, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে যে ছেলের মুখ, যদিও মুখের রেখাগুলি খুব কোমল; কোনও কৌণিক কঠোরতা নেই সেরকম। পাংশু কপাল ঘিরে খেলা করা সোনালি চুলের গুচ্ছ ঝিকমিক করছে। যেন তুলি দিয়ে আঁকা ভ্রুযুগল সুন্দর আয়ত, ঘনবর্ণ চোখের অনেকখানি উপরে অবস্থান করছে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে বের্নহার্ডের এই ছবিটার সামনে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে হয়তো মনে মনে আপনিও ছবির মানুষটির সঙ্গে বাক্যালাপ করতে আরম্ভ করে দেবেন। একটু হেসে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ বাক্যের জন্য অপেক্ষা করবেন ছবির মানুষটির জন্য এবং কেমন যেন বিভ্রান্ত বোধ করবেন শৈশবের নিষ্কলুষ বায়নাক্কা এবং দাবিদাওয়ার সামনে।

বের্নহার্ডকে এই অদ্ভুত সুন্দর শিশুটির ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জেরাল্ড আলতোভাবে তার কাঁধ স্পর্শ করে প্রশ্ন রাখে ফরাসি ভাষায়… “আপনার এই ছবিটা পছন্দ?” খুব নরমভাবে প্রায় ফিসফিস করে বলে সে “ভোয়েজেলমেই?” (Vous l'aimez?) বের্নহার্ড নজর সরায় না ছবিটার দিক থেকে। ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। জেরাল্ড বের্নহার্ডের কাঁধের থেকে হাত সরায় না, ফিসফিস করে বলে… “হয়তো আপনি এই মেয়েটির ভাই হতে পারতেন, কে জানে! শিশুটি গত শীতে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। মাত্র তেরো বছর বয়স ছিল তার।”

সবাই নীরব থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর জেরাল্ড ছেলেদের নিয়ে সেই নিচু গোলটেবিলের সামনে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। বাটলার তাদের কাপে এখনই চা ঢেলে দেবে।

অবশেষে তারা চার্লসের বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ করে। প্রথমদিকে তাদের মধ্যে একটা দ্বিধাবোধ, জড়তা ছিল। ধীরে ধীরে সেটা কাটিয়ে তারা সাহসীভাবে তাদের বক্তব্য পেশ করে, কারণ জেরাল্ড যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে তাদের সব কথা শুনছিল। কিন্তু চার্লস এখনো বেশ উত্তেজিত। তার মতে যে মানুষটি তাকে কুৎসিতভাবে সবার সামনে অপমান করেছিল, তার সামনে সে নিজের ভাবনা কী ভাবে সঠিক ভাষায় প্রকাশ করবে? তার পরিষ্কার মনে আছে মিকার সামনে তাকে বলা হয়েছিল সিগারেট না খেতে এবং সেই অদ্ভুত মেকআপ করা বার-গার্লদের কথাও তার মনে আছে। বের্নহার্ড যখন শান্তভাবে আর্থিক সমস্যার ব্যাপারে বলতে শুরু করেছিল, তখন চার্লস অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলেছিল যে পয়সা রোজগার করবার বিষয়ে অত লজ্জা করা একদম অর্থহীন এবং এই প্রসঙ্গ এখানে উত্থাপন করাটাই অপ্রাসঙ্গিক। তারপর সে একতরফা নিজের বিষয়েই বলে যেতে থাকে; কিন্তু যত সে মূল বক্তব্যের দিকে এগোতে থাকে, তত তার উত্তেজনা বাড়তে থাকে। জেরাল্ড তাকে অপমান করেছিল, এই কথাটা বোঝাতে গিয়ে তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত বিকৃত হয়ে যায়। চোখ যেন জ্বলতে থাকে, মুখ, ঠোঁট শুকিয়ে যায়, হাত মুঠো করে সে নিজের হাঁটুদুটো আঁকড়ে ধরে।

বের্নহার্ডের কাছে পুরো ব্যাপারটা অসহনীয়, কষ্টকর বলে মনে হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল যে চার্লস পরিস্থিতি বোঝাতে গিয়ে নিজেকে অতিরিক্ত কষ্ট দিচ্ছে। সে একটু আকস্মিকভাবে এবং দয়ালুস্বরে বলে ওঠে… ‘চার্লস খুবই অপমানিত বোধ করেছিল সেদিন। তার মনে হয়েছিল যে আপনি তাকে একেবারে অপদার্থ ছেলে বলে ভাবেন এবং সেই কারণেই আপনি তাকে বাড়ি চলে যেতে বলেছিলেন।’

শুনেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে চার্লস। প্রবল উত্তেজনা এবং ক্রোধে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সে বের্নহার্ডের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে… “তুমি আমাকে এভাবে অপমান করতে পারো না। আপনাদের কেউই আমাকে এভাবে অপমান করতে পারেন না। আমি খুব ভালভাবেই জানি যে জেরাল্ড আমাকে একেবারেই পছন্দ করেন না।”

চার্লস চেয়ার থেকে উঠে লাফ দিয়ে জানালার কাছে যায়। জানালার পাল্লার হাতল দু’হাত দিয়ে সজোরে চেপে ধরে সে। তারপর চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। তার অশ্রুমাখা গাল সে জানালার ঠাণ্ডা ধাতব ফ্রেমের উপর চেপে ধরে।



(চলবে)