১৯
বের্নহার্ড ঘড়ির দিকে একঝলক তাকায়… ‘লোকে ভাবতে পারে যে আমরা রুগি… মানে ডাক্তার দেখাতে এসেছি।’ চার্লসের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল।
বিষণ্ণ, গম্ভীরমুখে চার্লস গভীর মনোযোগ সহকারে আদর্শ পিতামাতার করণীয় বিষয়ে শিক্ষামূলক চার্টগুলো ঝুঁকে পড়ে দেখছিল।
ঠিক তখনই দরজাটা খুলে গেল এবং জেরাল্ড ঘরে প্রবেশ করল। দ্রুত ছেলেদের দিকে এগিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বিশেষ উষ্ণতার সঙ্গে তাদের স্বাগত জানাল। বিস্ময়ে বের্নহার্ড একটু অপ্রস্তুত বোধ করতে লাগল। লাল হয়ে উঠল তার মুখমণ্ডল। পাস্সিতে প্রথম দিনে সঙ্গীতশিক্ষকের বাড়িতে এই ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার। এখনও পরিষ্কারভাবে সেদিন বিকেলের সব খুঁটিনাটি কথা তার মনে আছে। সে সবে বাজাতে শুরু করেছিল। বাজাতে বাজাতে আবেশে চোখ বন্ধ করেছিল সে। হঠাৎ এক ফাঁকে চোখ খুলতেই সে দেখেছিল এক অপরিচিত আগন্তুক নিবিষ্টমনে তাকে নিরীক্ষণ করে চলেছে। সেই মানুষটিই জেরাল্ড। জেরাল্ডের চোখের দৃষ্টিটা অদ্ভুত মনে হয়েছিল বের্নহার্ডের। তার মনে হয়েছিল কী যেন এক গভীর অনুভব আছে সেই দৃষ্টিতে, যে অনুভব উঠে এসেছে এক মহান বিষাদের অতল থেকে।
কিন্তু জেরাল্ড কি তাকে চিনতে পেরেছে? জেরাল্ড প্রথমে চার্লসকে অভিবাদন জানায়, তারপর এই ছোট্ট চেহারার ব্লন্ড ছেলেটির দিকে তাকায়। তার চাহনিতে কোনও বিস্ময় নেই, বরঞ্চ এক বন্ধুত্বপূর্ণ অনাবিল হাসিতে সে বুঝিয়ে দেয় যে সে বের্নহার্ডকে বিলক্ষণ চিনতে পেরেছে…
-“আমি কবে থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি” জেরাল্ড বলে যায়… “যদিও আপনার শিক্ষকের কাছ থেকে আপনার বিষয়ে সব খবরাখবর আমি পেয়ে যাই। আপনি দ্রুত উন্নতি করছেন শুনেছি। আমি অত্যন্ত প্রীত হয়েছি এ কথা শুনে।”
চার্লস সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দু’জনের দিকেই। জেরাল্ড সেটা লক্ষ্য করে ছেলেদের ডেকে নেয় তার এপার্টমেন্টের ভিতরের দিকে। ইথানল আর কার্বলিকের গন্ধে ভারি একটা আধো-অন্ধকার ঘরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় তারা। ঘরটা একেবারে ফাঁকা, কিছু সাদা রঙের আসবাব আর ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য একটা চওড়া উঁচু বেড রাখা আছে। ঘরটার মেঝে ঠাণ্ডা, মসৃণ, পা ফেললে কোনও শব্দ হয় না। ঘরটার জানালাগুলোর পাল্লা অর্ধেকটা টানা।
“এটা আমার রুগি পরীক্ষার ঘর”… জেরাল্ড বলে যায়… “আপনাদের কোনও প্রয়োজনে আমার কাছে আসতে পারেন।”
হে পাঠক, এখন আপনি বের্নহার্ডের সঙ্গে জেরাল্ডের এপার্টমেন্টের একদম ভিতরে প্রবেশ করছেন। ডাক্তারের এই আলোআঁধারি ঘরের দুই পাল্লার স্লাইডিং দরজা ঠেলে আপনি এসে দাঁড়িয়েছেন একটা অপেক্ষাকৃত ছোট ঘরের মধ্যে, যেটার দেওয়ালে ম্যাট ফিনিশ করা অপূর্ব নীল রং। অথচ দেওয়ালে কোথাও কোনও ছবি ঝুলছে না। বের্নহার্ডের মনে পড়ল যে বাইরের যে ঘরে বসে তারা অপেক্ষা করছিল, সেই ঘরের দেওয়ালে অনেক সুন্দর অয়েলপেইন্টিং ফ্রেম করা আছে। তাছাড়া বেশ কিছু স্কেচ এবং উডকাটের কাজও আছে সেই ঘরে। কিন্তু এই ঘরে সেরকম কিছুই নেই। দেওয়াল একেবারে ফাঁকা। ঘরের মাঝখানের অংশটাও একদম ফাঁকা। ফলে ঘরটা বেশ বড় দেখাচ্ছে। ঘরের একদিকের দেওয়ালে একটা ডিভান রাখা আছে, ডিভানের উপরে ফক্স ফারের ঢাকনা। আরেক দিকের দেওয়ালে লাগোয়া একটা টেবিল, সেটাও ম্যাটপালিশ করা। সেটার উপরে একটা ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, এক কিশোরী কন্যার মূর্তি, দু হাত ছড়ানো, হাঁটুদুটি খুব সরু, শিশুর মত। মাথাটা একদিকে কাত করা, এক অদ্ভুত বিষাদের অভিব্যক্তি মুখমণ্ডলে।
মনে হচ্ছে যে এই ঘরে কেউ বাস করে না। হয়তো এটা একটা প্রদর্শনীকক্ষ। কিন্তু যে কেউ ভাবতে পারে যে ঘরের আসবাবসজ্জা এখনও অসম্পূর্ণ। জেরাল্ড এই ঘরে দাঁড়ায় না। একঝলক তাকায় ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যটার দিকে, তারপর বলে ওঠে… “এখানে অপেক্ষা থেকে যায়।” ছেলেরা এই কথাটার অর্থ বুঝতে পারে না। এর পর আপনি জেরাল্ডের নিজের ঘরটা দেখতে পাবেন। মৃদু আলোয় আলোকিত বড় ঘরটির মেঝে ধূসর কার্পেটে ঢাকা। দেওয়ালগুলিতেও একই রং এবং সরু কাঠের ফালি দিয়ে দেওয়ালের বর্ডার করা। এই ঘরেও খুব বেশি আসবাব নেই। একটা বিশাল পিয়ানোর উল্টোদিকে একটা টেবিল ভর্তি কাগজপত্র, একটা চওড়া ডিভান। তবে এই ঘরের ডিভানে ফক্স-ফার নয়, হালকা ধূসর রঙের কম্বল আর বালিশ রাখা। ডিভানের পাশে একটা নিচু গোলটেবিলে ফুল সাজানো আছে ফুলদানিতে। ফুলদানির পাশে সিগারেট। গোলটেবিলের পাশে একই রকম নিচু নিচু কিছু চেয়ার আছে ধূসর ভেলভেটে ঢাকা। সরু কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো বেশ কিছু ছবি এলোমেলো ভাবে দেওয়ালে টাঙানো, সেগুলো দেখে বের্নহার্ডের একটু অদ্ভুত মনে হল।
ছবিগুলো শুধুমাত্র অল্পবয়সী বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের, সাদা কলারওয়ালা জামা সবার পরনে। একঝলক দেখে যে কারো মনে হতে পারে যে তারা সবাই ভাই- বোন, মুখের যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। সবারই চোখ বড় বড় এবং চোখ বিশেষ বড় করে খুলে ছবিগুলো তোলানো, যাতে চোখের মণিগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু সবার মুখেই একটা অদ্ভুত বেদনাদায়ক উদ্বেগের অভিব্যক্তি।
কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় যায় যে এই সাদৃশ্যটা মুখের আদলে নয়, সম্ভবত সবারই কাছাকাছি বয়স, একই প্রকৃতির প্রাণশক্তির উচ্ছ্বাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে। প্রায় একই ধরনের ভঙ্গিমায় ছবিগুলি তোলা। কিছু মেয়ে খুবই সুন্দরী। ম্যাডোনার মত একটু পাংশু গাত্রবর্ণ এবং হাসির মধ্যে বিষণ্ণ গাম্ভীর্য মিশে আছে সবারই। হাতগুলো অনেকেরই পূর্ণযৌবনা নারীদের মত সমান এবং সুন্দর। একমুহূর্তের জন্য বের্নহার্ডের তার পুরনো বন্ধু হান্সের মায়ের কথা মনে পড়ল। হান্সের মায়েরও এমন সুন্দর, সাদা, মখমলের মত মসৃণ হাত।
এছাড়াও আরও কিছু মুখমণ্ডলের ছবি আছেঃ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে চেয়ে থাকা কিছু মুখ। চোখগুলো বড় বড়, উজ্জ্বলভাবে পুরোটা খোলা, ঝকঝকে মুখ, সাহসী কপাল, যেন অচিরেই তাদের ভবিষ্যতের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ হতে চলেছে, সত্যি হতে চলেছে তাদের স্বপ্নগুলো।
বের্নহার্ড ঠিক বুঝতে পারছে না এই মুখগুলো ছেলেদের নাকি মেয়েদের। সবগুলো মুখ একইরকম দেখাচ্ছে, কারণ সবারই মুখে একই ধরনের ধার্মিক স্থৈর্য এবং বীরত্বের দীপ্তি। তাদের কাঁধগুলো সরু ধরনের এবং সবাই সামনের দিকে ঘাড় উঁচু করে আছে। মনে হচ্ছে তারা যেন অনেক আশা নিয়ে বিশেষ কোনও প্রতিশ্রুতির কথা শুনছে। তাদের সরু কাঁধ, আশাবাদী ভঙ্গিমা বের্নহার্ডকে স্পর্শ করছে। সে জানে না কেন তার মনে কষ্ট হচ্ছে এদের ছবি দেখে। হঠাৎ তার গের্টের কথা মনে পড়ল। যদিও তার মুখে কখনোই ধার্মিক স্থৈর্যের লেশমাত্র ছিল না, কিন্তু হঠাৎ গের্টের কথা মনে পড়াতে এক অদ্ভুত বিষাদ তার মনকে আচ্ছন্ন করল।
কিছু বাচ্চার হাত অদ্ভুত ধরনের। শান্ত ম্যাডোনাসুলভ মেয়েদের যেরকম নরম সাদা হাত, সেরকম নয় একেবারেই। বড়, চওড়া পরিণত ধরনের হাত। দেখে মনে হয় বলিষ্ঠ, তরুণ ক্রুসেডারেরা যে ধরনের হাত দিয়ে তরোয়াল ঘোরাতে সক্ষম ছিল, ঠিক সেই ধরনের হাত কিছু বাচ্চার। তবে তাদের হাতের মধ্যেও একই রকম প্রাণচঞ্চল মসৃণতা রয়েছে। যদিও ভঙ্গিমার মধ্যে এটা পরিষ্কার যে হয়তো অনেক কষ্ট এবং বেদনার অভিজ্ঞতা আছে এদেরও। সম্ভবত অল্প বয়সেই এরা জেনে গিয়েছে জীবনের অনিশ্চয়তা।
একটা ছবির সামনে বের্নহার্ড একটু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। কী পেলব, নমনীয়, মিষ্টি মুখ! তবে এই মুখটাও ছেলে না মেয়ের মুখ, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে যে ছেলের মুখ, যদিও মুখের রেখাগুলি খুব কোমল; কোনও কৌণিক কঠোরতা নেই সেরকম। পাংশু কপাল ঘিরে খেলা করা সোনালি চুলের গুচ্ছ ঝিকমিক করছে। যেন তুলি দিয়ে আঁকা ভ্রুযুগল সুন্দর আয়ত, ঘনবর্ণ চোখের অনেকখানি উপরে অবস্থান করছে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে বের্নহার্ডের এই ছবিটার সামনে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে হয়তো মনে মনে আপনিও ছবির মানুষটির সঙ্গে বাক্যালাপ করতে আরম্ভ করে দেবেন। একটু হেসে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ বাক্যের জন্য অপেক্ষা করবেন ছবির মানুষটির জন্য এবং কেমন যেন বিভ্রান্ত বোধ করবেন শৈশবের নিষ্কলুষ বায়নাক্কা এবং দাবিদাওয়ার সামনে।
বের্নহার্ডকে এই অদ্ভুত সুন্দর শিশুটির ছবির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জেরাল্ড আলতোভাবে তার কাঁধ স্পর্শ করে প্রশ্ন রাখে ফরাসি ভাষায়… “আপনার এই ছবিটা পছন্দ?” খুব নরমভাবে প্রায় ফিসফিস করে বলে সে “ভোয়েজেলমেই?” (Vous l'aimez?) বের্নহার্ড নজর সরায় না ছবিটার দিক থেকে। ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। জেরাল্ড বের্নহার্ডের কাঁধের থেকে হাত সরায় না, ফিসফিস করে বলে… “হয়তো আপনি এই মেয়েটির ভাই হতে পারতেন, কে জানে! শিশুটি গত শীতে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। মাত্র তেরো বছর বয়স ছিল তার।”
সবাই নীরব থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর জেরাল্ড ছেলেদের নিয়ে সেই নিচু গোলটেবিলের সামনে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। বাটলার তাদের কাপে এখনই চা ঢেলে দেবে।
অবশেষে তারা চার্লসের বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ করে। প্রথমদিকে তাদের মধ্যে একটা দ্বিধাবোধ, জড়তা ছিল। ধীরে ধীরে সেটা কাটিয়ে তারা সাহসীভাবে তাদের বক্তব্য পেশ করে, কারণ জেরাল্ড যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে তাদের সব কথা শুনছিল। কিন্তু চার্লস এখনো বেশ উত্তেজিত। তার মতে যে মানুষটি তাকে কুৎসিতভাবে সবার সামনে অপমান করেছিল, তার সামনে সে নিজের ভাবনা কী ভাবে সঠিক ভাষায় প্রকাশ করবে? তার পরিষ্কার মনে আছে মিকার সামনে তাকে বলা হয়েছিল সিগারেট না খেতে এবং সেই অদ্ভুত মেকআপ করা বার-গার্লদের কথাও তার মনে আছে। বের্নহার্ড যখন শান্তভাবে আর্থিক সমস্যার ব্যাপারে বলতে শুরু করেছিল, তখন চার্লস অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে বলেছিল যে পয়সা রোজগার করবার বিষয়ে অত লজ্জা করা একদম অর্থহীন এবং এই প্রসঙ্গ এখানে উত্থাপন করাটাই অপ্রাসঙ্গিক। তারপর সে একতরফা নিজের বিষয়েই বলে যেতে থাকে; কিন্তু যত সে মূল বক্তব্যের দিকে এগোতে থাকে, তত তার উত্তেজনা বাড়তে থাকে। জেরাল্ড তাকে অপমান করেছিল, এই কথাটা বোঝাতে গিয়ে তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত বিকৃত হয়ে যায়। চোখ যেন জ্বলতে থাকে, মুখ, ঠোঁট শুকিয়ে যায়, হাত মুঠো করে সে নিজের হাঁটুদুটো আঁকড়ে ধরে।
বের্নহার্ডের কাছে পুরো ব্যাপারটা অসহনীয়, কষ্টকর বলে মনে হচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল যে চার্লস পরিস্থিতি বোঝাতে গিয়ে নিজেকে অতিরিক্ত কষ্ট দিচ্ছে। সে একটু আকস্মিকভাবে এবং দয়ালুস্বরে বলে ওঠে… ‘চার্লস খুবই অপমানিত বোধ করেছিল সেদিন। তার মনে হয়েছিল যে আপনি তাকে একেবারে অপদার্থ ছেলে বলে ভাবেন এবং সেই কারণেই আপনি তাকে বাড়ি চলে যেতে বলেছিলেন।’
শুনেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে চার্লস। প্রবল উত্তেজনা এবং ক্রোধে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সে বের্নহার্ডের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে… “তুমি আমাকে এভাবে অপমান করতে পারো না। আপনাদের কেউই আমাকে এভাবে অপমান করতে পারেন না। আমি খুব ভালভাবেই জানি যে জেরাল্ড আমাকে একেবারেই পছন্দ করেন না।”
চার্লস চেয়ার থেকে উঠে লাফ দিয়ে জানালার কাছে যায়। জানালার পাল্লার হাতল দু’হাত দিয়ে সজোরে চেপে ধরে সে। তারপর চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। তার অশ্রুমাখা গাল সে জানালার ঠাণ্ডা ধাতব ফ্রেমের উপর চেপে ধরে।
(চলবে)

No comments:
Post a Comment