প্রবন্ধ - সনাতন সিংহ








কলকাতা যে ভেনিস হওয়ার নয়, তা জানা ছিল সবারই। সাধারণ থেকে আবহাওয়াবিদরাও সে ধারণায় ছিল বদ্ধ পরিকর। কিন্তু তাদের সেই ধারণার ধারাপাতকে ভুল বলে প্রতিষ্ঠিত করল বৃষ্টির বর্ণমালা। পুরো কলকাতায় শুধু দুয়ারে নয়, চৌকাঠ ডুবিয়ে দরবার করল ছলাৎ ছলাৎ করে। সঙ্গে আবার সুরোধনীও নেমে এল জোয়ারে জোয়ারে। তবে ভাগীরথের পূর্ব পুরুষদের উদ্ধারে নয়। অমাবস্যার হাত ধরে মেঘমল্লারের গণ-সমাবেশে।

বানভাসি হল কলকাতা। ডুবে গেল, ভেসে গেল শরৎচন্দ্র, শরদিন্দু, বিদ্যাসাগর, জগদীশ গুপ্তরা। সাঁতার দিল ব্যোমকেশ। আরো আরো অনেকেই। কফি হাউস চত্তর ছেড়ে পিচের উপর উর্মিমালার চপল ছন্দে যেন মরণ আড্ডা দিল বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি, স্প্যানিশ, জার্মানি ছাড়াও অন্যান্য অক্ষরেরা। সলিল সমাধি হল ছাপা অক্ষরের। আগমনীতেই বিসর্জন হল শারদীয়া পত্রিকাগুচ্ছের। দম বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিল হাজার হাজার পাঠ্যপুস্তক। অক্ষর শিল্পের কারিগর, কর্মচারী এমনকি তাদের মালিকরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল তাদের সেই মৃত্যুকে। নালায় মিশে গেল বর্ণমালা। ইতিহাস তৈরি করল বৃষ্টি। আটাত্তরের ইতিহাসকে মলিন করে নতুনভাবে ইতিহাস লিখল তিলোত্তমা। নিম্নচাপের উস্কানিতে মেঘেরা দল বেঁধে নেমে পড়ল কল্লোলিনীর বুকে। তলিয়ে গেল ছাপাযন্ত্র, কম্পিউটার, পাণ্ডুলিপি। অক্ষরদের টেনে নিয়ে গেল গঙ্গার বুকে।

গত আমফানে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বই পাড়ায়, তাকে এবার টপকে গেল কলেজস্ট্রিট। লে-আউটের পর লে-আউটে জমা জল। সংরক্ষিত ছিল লেখকদের ছাপানো অক্ষরের প্রতিলিপি। যার মধ্যে কোনোটা আবার যন্ত্রের বুকে থেকে বেরিয়ে এসেছিল প্রিন্টের শরীরে মলাটবদ্ধ হয়ে। আবার অপেক্ষায় ছিল বা কোনোটা। তারাও, তারাও অনেকেই প্রাণ হারাল বৃষ্টির কাছে। ডুবিয়ে দিয়ে গেল তাদের সৃষ্টি সম্ভারকে। কর্মচারী বা মালিক, প্রকাশকদের হাত পড়ল মাথায়। ছোটো থেকে মাঝারি, বা বড়ো ব্যবসায়ী সকলেই হা-হুতাশ করল নিরুপায় হয়ে। কেউ কেউ আবার চোখের জলে নিজের সর্বনাশের দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলকে। রাতেই অনেকে গিয়ে ছিল পড়িমরি করে, যদি কিছু রক্ষে হয়। কিন্তু পেরে ওঠেনি তখন। ভোরে যখন নাভি সমান জল, দুপুরেও তা প্রায় কোমর। ঢেউ চলল সদ্য জন্মানো ভেনিসের বুকে।

কার বই কার সঙ্গে মিশে গেছে, তা নিজেরাও ঠিক করে উঠতে পারেনি। কারোর বা র‍্যাকের পর র‍্যাক ডুবে ছিল বইয়ের স্তূপে। কারোর বা ছোটো দোকান উল্টে ভাসছিল মৃতের মতো। বাসের আনা-গনায় ঢেউ চলল জোরে। ধাক্কা দিয়ে দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাদের। জল, বই, অক্ষর মিলেমিশে একাকার। কলেজস্ট্রিট ভরে গেল ভাসমান বইয়ের মিছিলে। চারদিকে যখন পূজো পুজো গন্ধ তখন কলেজ স্ট্রিটে কান্নার রোল। হাহাকারের বাতাস। বইপাড়ায় শোক নামল চোখের জলে। ফোঁটা ফোঁটা বেদনারবিন্দু মিশে গেল জমা জলে।

সালটা তখন ১৮১৭। ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে তৈরি হল হিন্দু কলেজ। এই কলেজ লাগোয়া, (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) রাস্তাই কলেজস্ট্রিট নামে খ্যাতি অর্জন করে। কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট, ওয়েলেশলি স্ট্রিটের নাম বদলালেও কলেজস্ট্রিট স্বমহিমায় জীবিত রইল আগের নামেই। তারই পাশাপাশি গড়ে ওঠা একের পর এক কলেজ ও বিশ্ব-বিদ্যালয়।

এই রাস্তাই প্রাণকেন্দ্র। গড়ে ওঠে বই-দোকান। প্রথমে পুরনো ও দুর্লভ বইয়ের পসরা নিয়ে বসলেও তা কলেবরে বৃদ্ধি পায় ধীর গতিতে। প্রথমে অনেকেই চট পেতে বই বিক্রি করতে শুরু করেন। একটা বইয়ে জন্য অপেক্ষা করতে হত অনেকক্ষণ। অনেকেই পড়ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

১৮৪৭, তার প্রায় শুরুর দিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজেই এগিয়ে এলেন। গড়ে তুললেন বইয়ের দোকান 'সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি'। ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটির ছাপাখানা কলেজস্ট্রিট চত্তর লাগোয়া। ইংরাজি বই সেই সময় তারাই ধারাবাহিকভাবে ছাপতে শুরু করে। ১৮২৬ সালেও তারাও তৈরি করে বইয়ে দোকান। ইংরাজি বইয়ে অন্যতম জোগানদার তারাও। পুরানো ব্যবসায়ীদের মধ্যে গিরিন্দ্রনাথ মিত্র ও উপেন্দ্রনাথ ধর উল্লেখ্যযোগ্য।

কিন্তু আজকের বই-পাড়ার সঙ্গে পার্থক্য ছিল বিস্তর। এর যাত্রা শুরু প্রায় আশির দশকে। থ্যাকারের ডাইরেক্টরি থেকে জানা যায়, সেই সময় বইয়ের দোকান ছিল খান-সাতেক। কন্স ডাইরেক্টরি আবার অন্য কথা বলে, তখন দোকানমাত্র দুটো। তবে মতান্তর থাকলেও তার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে ১৮৯৯ সালে। বেড়ে হয় ছত্রিশ। এস. কে. লাহিড়ী, দ্য ক্যানিং লাইব্রেরি, দ্য চ্যাটার্জি ব্রাদার্স, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, দাশগুপ্তা এন্ড কোম্পানি ছাড়াও আরো অনেকেই তখনকার দিনে অন্যতম পুরনো।

প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে নানান প্রকাশক ও বইয়ের দোকান। কোনোটা ছোটো, কোনোটা আবার বড়ো। আনন্দ, পত্র ভারতী, দেব সাহিত্য কুঠির, সাহিত্যম ছাড়াও অনেক অনেক প্রকাশক। সার দিয়ে রয়েছে রাস্তার দুধারের ফুটপাত জুড়ে। কত শত বই-ওয়ালা, বিক্রেতা। কেউ কেউ আবার ফুটপাতের বুকেই কাতারে কাতারে বিছিয়ে দেয় পুরানো বই। অনেকে পড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আবার দরদাম করে ব্যাগবন্দী করে অনেকেই।

পাঠ্য বইয়ে ঠাসা দোকান, ফুটপাত। স্কুল, কলেজের পড়ুয়া, শিক্ষক- শিক্ষিকা, পাঠক-পাঠিকা, সাহিত্যিক কারা আসে না সেখানে? লক্ষ লক্ষ টাকার বই। প্রীতি-উপহার, পাঠ্য-পুস্তক বা নিজের জন্য বই কিনতে হাজির হয় সেখানে। রাস্তা জুড়ে শুধু বইয়ের গন্ধ। তারই একদিন আন্তর্জাতিক শ্রীবৃদ্ধি হল, ২০০৭। কলেজস্ট্রিটকেই টাইম ম্যাগাজিন 'এশিয়ার সেরা' বলে স্বীকৃতি দিল। আপ্লুত সকলে। ধন্য হল শিক্ষা-সাহিত্যের পীঠস্থান।

তবে এই বইপাড়াই বিশ্বের দ্বিতীয় ও ভারতের বৃহত্তম বই-বাজারও বটে। পাঠ্য বইয়ের সঙ্গে দেশ-বিদেশের বিপুল ভাণ্ডার। শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রাণ কেন্দ্র এই কলেজস্ট্রিট। সম্প্রতি এই সব দোকানের সঙ্গে নতুন নতুন প্রকাশক-বিক্রেতা আবার নতুন ঠিকানা পেয়েছে, বিদ্যাসাগর টাওয়ারে। কিন্তু চলতি পথে কলেজস্ট্রিটের দোকানরাই বেশি উপযোগী ও সহজলভ্য অনেকের কাছে।

ইদানিং অনলাইনে বই কেনার প্রবণতা লক্ষ্যনীয়। কেউ কেউ আবার বইয়ের চাহিদা মেটাচ্ছে পিডিএফে। তার কারণ অবশ্য ভিন্ন। ছাপা খরচ বেড়েছে। দাম বেড়েছে কাগজের। ছাপানো বইয়ের বিকল্পে ডিজিটাল বই প্রকাশের দিকে এগিয়েছে প্রকাশক থেকে লেখক। তবুও ছাপানো অক্ষরের মহত্ব তার তুলনায় অনেক বেশি অনেকের কাছে।

বইমেলা বই বিক্রীর অন্যতম একটা মাধ্যম। এই কলেজস্ট্রিটের অনেক প্রকাশক-ব্যবসায়ী হাজির হয় লক্ষ লক্ষ পাঠক ও ক্রেতার কাছে। কলকাতার আন্তর্জাতিক বইমেলা ছাড়াও জেলায় জেলায় সেই উৎসবে তারাও থাকে বইয়ের সম্ভারে। কিন্ত ওটুকু ছাড়া সারা বছর জুড়ে তারা কিন্তু পড়ে থাকেন এই বই-পাড়ায়।

শহরের উত্তরে কলেজস্ট্রিটের এই পসরা প্রায় দুশো বছরের। দক্ষিণে গড়িয়াহাট থেকে গোলপার্কের ফুটপাতেও পুরনো বইয়ের সম্ভার চোখে পড়ার মতো। ক্রেতাকে হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে থেকে ঝেড়ে মুছে হাতে তুলে দিচ্ছে অমূল্য সম্পদ। তেমন ছবি দেখা যায় মির্জা গালিব স্ট্রিটেও।

সেসব ভাণ্ডার অমূল্য। কিন্তু প্রাণ-ভোমরা, কলেজস্ট্রিট ডুব-সাঁতার দিয়েছে কালো পিচের সমুদ্রে। সে ক্ষতি অপরিমেয়। যে অক্ষর জলে ভেসে গেছে, তা আর ফিরে আসবে না কল্লোলিনীর বুকে।


No comments:

Post a Comment