সম্পাদকীয়




































সম্প্রতি সমাজ মাধ্যমে দেখা গেল একটি অদ্ভুত দৃশ্য। একটি লোকাল ট্রেনের মহিলাদের জন্য নির্ধারিত কামরায় উঠেছেন একজন বিক্রেতা। মহিলাদের জন্য নানান সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে উঠলেও তিনি পুরুষ। গোল বাধল এখানেই। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং সেইমতো, আইনের রক্ষাকর্তা একজন অবতীর্ণ হলেন আইন প্রতিষ্ঠায়।

এক আশ্চর্য পরিস্থিতির উদ্ভব হল সেই মুহূর্তে। মহিলা যাত্রীরাই বাধা দিলেন সেই বিক্রেতাকে কামরা থেকে নামিয়ে কোনও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ায়।

মানব মনের একটি বিশেষ দিক নিরুচ্চার প্রতিষ্ঠা পেল এই প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। আসলে 'ঠিক' আর 'ভুল' - একই মুদ্রার দুই পিঠের মধ্যে রয়েছে এক অদৃশ্য রেখা, ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে প্রায়শই যেটি মুছে যায়। অথচ মানুষের জন্মগত স্বাভাবিক প্রবণতা সাধারণত থাকে 'ঠিক' এর দিকে ঝুঁকে।

পৃথিবীর যাবতীয় মৌলবাদের জন্ম কি এইভাবেই হয় না? এমনকি 'নারীবাদ' - এর প্রচলিত সংজ্ঞায়নও এর আওতার বাইরে নয়। আরও মজার বিষয়, এই ধরনের ধ্যান - ধারণায় প্রভাবিত মানুষদের মধ্যে তথাকথিত 'শিক্ষিত' মানুষের সংখ্যা অনেক। মনুষ্য সমাজ হিসাবে আজ আমরা এই বিরাট বিপদের মুখোমুখি।

সুস্থ থাকুন। সতর্ক থাকুন।

শুভেচ্ছা নিরন্তর।

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - সুকান্ত ঘোষ









তারা আপনাকে দেখেই ঠিক করে ফেলেছে

১৯৯০ সালের কথা - স্যান্ড্রা ফরসাইথ নামে মায়ামি ইউনিভার্সিটির এক গবেষক একটা বেশ সাধারণ কিন্তু আবার চালাকি মেশানো পরীক্ষা করলেন। তিনি চারজন মহিলাকে ভিডিওতে রেকর্ড করলেন, যাঁরা একটা ম্যানেজমেন্ট পোষ্টের জন্য ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। চারজনের প্রত্যেককে চার রকমের পোশাকে, যে পোশাকগুলো সাজানো হয়েছিল ‘পুরুষালি’ হবার মাত্রা অনুযায়ী। এক নম্বর পোশাক সবচেয়ে নরম, মেয়েলি; চার নম্বর সবচেয়ে কড়া, কাটা-কাটা, প্রায় পুরুষের স্যুটের মত। তারপর ব্যাঙ্কিং আর মার্কেটিং জগতের ১০৯ জন লোককে সেই ভিডিও দেখানো হল আওয়াজ বন্ধ করে। মানে, কে কী বলছেন তা শোনার উপায় নেই, শুধু দেখা যাচ্ছে। বলা হল যে মহিলারা ইন্টারভিউ দিয়েছেন তাঁদের সবার যোগ্যতা, ডিগ্রী, অভিজ্ঞতা সমান – এবার আপনারা নম্বর দিন।

ফলাফল কি হল অনুমান করতে পারছেন? যাঁরা বেশী ‘পুরুষালি’ পোশাক পরেছিলেন, তাঁদের অনেক বেশী মাত্রায় দৃঢ়চেতা, আত্মনির্ভর, ক্ষিপ্র, আক্রমণাত্মক এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম বলে মনে করা হল। এবং তাঁদের চাকরী দেবার সুপারিশও বেশী এল। মজার ব্যাপার, ইন্টারভিউ যিনি নিচ্ছেন তিনি পুরুষ না মহিলা, ব্যাঙ্কার না মার্কেটিং-এর লোক, তাতে বিশেষ কিছু হেরফের হল না। মানে, সবাই একই ছাঁচে ভাবছে।

এবার আপনি বলতেই পারেন, ভাই বড়ই সরলীকরণ করে ফেললে কেসটা। এমন ব্যাপার স্যাপার হলে তো সব কোম্পানীর বড় পোষ্টের লোকজনকে ব্র্যাড পিট হতে হবে! কিন্তু আমরা জানি তা তো হয় না। তার মানে ভিতরে থাকলে বা বাকিদের থেকে লক্ষণীয় ভাবে ভালো হলে এই সব পোষাক ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হয় না। আর যদি গড়পড়তা লোক হয়ে বাকিদের সাথে ফাইট দিতে হয়, তাহলে একটা চান্স থেকে যায় পোষাক দিয়ে প্রভাব ফেলার বা প্রভাবিত হবার।

ফরসাইথ-ও সেটা জানতেন না এমন নয়! তিনি নিজেও কিন্তু সৎ ভাবে লিখেছিলেন যে পোশাকের প্রভাব ব্যক্তির নিজের প্রভাবের তুলনায় ছোট – মুখ, ভঙ্গী, হাসি, হাত নাড়ার ধরণ, এ সবের ওজন বেশী। কিন্তু তারপরেই তিনি এমন একটা কথা লিখেছেন যা বেশ জোরালোঃ পোশাক জিনিসটা সহজে বদলানো যায়, মুখ বদলানো যায় না! এবং এই ‘সহজে বদলানো যায়’ বলেই গোটা একটা শিল্প গড়ে উঠেছে আমাদের ঘাড়ে চেপে। সেই পোষাক এবং ফ্যাশন ইন্ডাষ্ট্রি নিয়ে কথা পরে হবেক্ষণ।

তবে কিনা এই নিয়ে গবেষণার লিষ্ট লম্বা, এবং প্রায় সবই এক দিকে ঝুঁকে আছে। ফর্ম্যাল জামা পরা টিচিং অ্যাসিষ্ট্যান্টদের ছাত্ররা বেশী বুদ্ধিমান ভাবে, কিন্তু কম ইন্টারেষ্টিং। ফর্ম্যাল পোশাক পরা থেরাপিষ্টের কাছে ক্লায়েন্ট দ্বিতীয়বার ফিরে আসে বেশী। হাই স্কুলের ছেলেমেয়েদের জামাকাপড়ের ধরণ দেখে বন্ধু এবং শিক্ষক – দু’পক্ষই ঠিক করে ফেলে ছেলেটি বা মেয়েটি পড়াশুনায় কেমন। আর সবচেয়ে বাজে তৈরী হওয়া ধারণাটি হল - উঁচু পদের চাকরীতে কোন মহিলা যদি একটু বেশী আকর্ষণীয় করে সাজেন, তাঁকে কম যোগ্য বলে মনে হয়। মানে মেয়েদের জন্য দড়িটা এত সরু যে হাঁটাই মুশকিল, বেশী মেয়েলি হলে অযোগ্য, বেশী পুরুষালি হলে ‘অ্যাগ্রেসিভ’, আর সুন্দরী হলে তো কথাই নেই! খুবই গুণী এবং তার সাথে প্রচন্ড সুন্দরী একজনাকে খুবই কাছাকাছি একছাদের তলায় দীর্ঘদিন দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আমরা এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করতাম, এমনকি নিজেদের মধ্যে ছোটখাট পরীক্ষাও, সেই সব নিয়েও দীর্ঘ লেখা লিখে ফেলা যাক। তবে সে সবই কিন্তু বাকি প্রকাশিত স্টাডিগুলির সমর্থনসূচকই ছিল বেশীর ভাগ সময়।


সুন্দর দেখতে বলেই আপনি ঠিক কথা বলছেন না

ওদিকে চেহারার বাজারদর মাপার কাজটা করেছেন অর্থনীতিবিদরা। ড্যানিয়েল হ্যামারমেশ প্রায় গোটা কেরিয়ার এই নিয়ে খরচ করেছেন – ‘পালক্রোনমিক্স’ বলে ইয়ার্কি করে ডাকা হয় জিনিসটাকে, সৌন্দর্যের অর্থনীতি। তাঁর হিসেব অনুযায়ী আমেরিকায় এক জন সুশ্রী মানুষ গোটা কর্মজীবনে গড়ে প্রায় দুই লক্ষ তিরিশ হাজার ডলার বেশী রোজগার করেন গড়পড়তা-থেকে-কম-দেখতে সহকর্মীর তুলনায়। শতাংশের হিসেবটা ছোট – দু-তিন-চার শতাংশ – কিন্তু তিরিশ বছর ধরে জমলে আর ছোট থাকে না। সুন্দর লোকেরা চাকরী বেশী পান, প্রোমোশন বেশী পান, ব্যাঙ্কে লোন পান সহজে, সুদটাও তাঁদের দিতে হয় একটু কম। এ জিনিসও আমি নিজে সামনা সামনি দেখেছি – পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরতে গিয়ে কত জিনিসের ডিসকাউন্ট পেয়েছি কেনার সময়, অনেক সময় না চাইতেই, কেবল সাথে সুন্দরী একজন ছিল বলে!

এবার একটা ইনটারেষ্টিং পরীক্ষার কথা বলি, যেটা আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়েও একটু খোঁচা দিয়ে যায়! আগে থেকে জানা ছিল যে ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের ভোটাররা বেশী সুশ্রী বলে মনে করেন – অষ্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা – চার জায়গার নির্বাচনের ডাটাতেই এইরকম ফলের ইঙ্গিত দিয়েছিল একসময়। এখন প্রশ্ন হল, কেন? দুটো ব্যাখ্যা সম্ভব। এক, ডানপন্থী লোকজন এমনিতেই দেখতে ভালো – কারণ সুন্দর লোকেরা বেশী রোজগার করেন, আর বেশী রোজগেরে লোকেরা সম্পদের পুনর্বন্টন কম পছন্দ করেন। একটা নিখুঁত গোল বৃত্ত। দুই, ডানপন্থী দলে প্রার্থী বাছাই করার সময়েই চেহারার উপর বেশী জোর দেওয়া হয়।

হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটির জান-এরিক লনভিষ্ট এই দুটোকে আলাদা করার জন্য এক দারুণ ভাবনা বেছে নিলেন। তিনি রাজনীতিবিদদের ছেড়ে ধরলেন বুদ্ধিজীবীদের – ডানপন্থী ও বামপন্থী পত্রিকায় যাঁরা লেখেন, সেই সব অধ্যাপক-লেখকদের ছবি। যুক্তিটা সহজ: বুদ্ধিজীবী হবার জন্য কেউ কাউকে সুন্দর হতে বলে না। ওই লাইনে সুশ্রী মুখের কোন বাজারদর নেই।

ফল বেরুলো - বিচারকরা ছবি দেখে দিব্যি আন্দাজ করতে পারলেন কে বামপন্থী আর কে ডানপন্থী (মুখ দেখে রাজনীতি চেনা যায়, এ এক আলাদা অস্বস্তিকর গল্প)। কিন্তু সৌন্দর্য? ডানপন্থী বুদ্ধিজীবীরা মোটেই বেশী সুশ্রী নন। উল্টে, ছবির কোয়ালিটি আর ‘গ্রুমিং’-এর হিসেব বাদ দিয়ে দেখা গেল বেশী সুশ্রী মানুষরা বরং বামপন্থী পত্রিকাতেই বেশী লিখছেন। ডানপন্থীরা যেখানে এগিয়ে, সেটা সৌন্দর্য নয় – সেটা হল পরিপাট্য। চুল আঁচড়ানো, দাড়ি কামানো, জামার ভাঁজ। মানে, ঈশ্বরপ্রদত্ত মুখ নয়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খরচ করা সময়।

লনভিষ্টের পেপারটার নাম, যার থেকে ভালো নাম হতে পারত না, ‘Just because you look good, doesn’t mean you’re right’। দেখতে ভালো বলেই আপনার কথাটা ঠিক, তা নয়। ইংরেজীতে ‘right’ শব্দটার দুটো মানে – ‘ঠিক’ এবং ‘ডান’। লনভিষ্ট ভাষার সাথে একটু খেলা করেছেন আর কি!

নোবেলজয়ী লেখক আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার এক জায়গায় লিখেছিলেন, পোশাকের ভিতরে এক অদ্ভুত ক্ষমতা লুকিয়ে থাকে। কথাটা কেবল কথার কথা নয়, ওটা মাপা যায় বা মাপার চেষ্টা অন্তত অনেকেই করেছেন দীর্ঘদিন ধরে। তাই সেই নিয়ে গবেষণাও কম নেই।

এখন এটা একটু কমেছে গত কিছু বছর হল, বিজনেস ক্লাসের লাইনে দাঁড়ালে (বিশেষ করে ভারতে), গেট খুলে বোর্ডিং-এর আগে একবার করে এসে টিকিট চেক করে যায়। এমন নয় যে আগে করত না, কিন্তু আগে মাঝে মাঝে ফট করে হয়ত লাইনে দাঁড়ানো কাউকে বলেই দিত, “আপনার লাইন এটা নয়, ওটা ওদিকে”। আমার সাথে অনেকবার হয়েছে এটা। টিকিট চেক না করে কি দেখে তারা বিজনেস ক্লাস বা ইকনমি ক্লাসের পার্থক্য করত তারা বলে আপনার মনে করেন? যেহেতু ট্রাভেল একটু বেশিই করতে হয় – তাই পরীক্ষাও চালিয়ে ছিলাম আগে কখন এরা আর জিজ্ঞেস করবে না আমি ইকনমি ক্লাসে কিনা। দেখেছিলাম হাতে ইংরাজি বই থাকলে প্রশ্ন কম করে।

বহু আগে এই সব নিয়ে বেশ বিরক্ত হতাম। সুধা ম্যাডাম এই নিয়ে ফুটেজ দেবার বহু আগে থেকেই এই জিনিস চলে আসছে। তো এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই একদিন আবিষ্কার করলাম, আমি যা নিয়ে বিরক্ত হচ্ছি, গত পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়ার সাইকোলজিষ্ট, সমাজতত্ত্ববিদ, আর ইকনমিষ্টরা তা নিয়ে রীতিমতন ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। এবং তাঁদের ফলাফল আমার বিরক্তিকে সমর্থনই করে, আরো খানিকটা অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে।


এবার উল্টো দিক – জামাকাপড় আপনাকে কী করে?

এতক্ষণ যা বললাম তা হল, অন্যরা আপনাকে জামা দেখে বিচার করে। সেটা তো জানা কথাই, শুধু মাপজোখ হয়েছে। আসল চমকটা এল ২০১২ সালে।

নর্থওয়েষ্টার্ন ইউনিভার্সিটির দুই গবেষক, হাইয়ো অ্যাডাম আর অ্যাডাম গ্যালিনস্কি একটা শব্দ বানালেন: ‘এনক্লোদ্‌ড কগনিশন’। বাংলায় বলা যেতে পারে ‘পরিহিত মনন’, যদিও তাতে জিনিসটার মজাটা মরে যায়। তাঁদের বক্তব্য এই যে জামাকাপড় শুধু অন্যের চোখে আপনাকে বদলায় না, জামাকাপড় আপনার নিজের মাথার ভিতরের ধারণাটাও বদলে দেয়।

তাঁরা বেছে নিলেন সাদা ল্যাব কোট। প্রথমে ৩৮ জনকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলেন যে হ্যাঁ, লোকে সাদা ল্যাব কোট দেখলে মনে করে – মনোযোগী, সতর্ক, দায়িত্বশীল, বৈজ্ঞানিক। তাহলে যদি আপনি সেই কোটটা গায়ে চড়ান, আপনার মনোযোগ কি বাড়বে?

প্রথম পরীক্ষা করা হল স্ট্রুপ টেস্ট। যাঁরা জানেন না, ব্যাপারটা এই: স্ক্রীনে একটা শব্দ ভেসে উঠবে, ধরুন ‘লাল’ – কিন্তু লেখাটা নীল কালিতে। আপনাকে বলতে হবে কালির রঙ, শব্দটা নয়। শুনতে সহজ, করতে গিয়ে মাথা ঘুরে যায়, কারণ মস্তিষ্ক পড়া বন্ধ করতে পারে না। ১৯৩৫ সাল থেকে এই টেস্টকে মনোযোগ মাপার সোনার কাঠি বলা হয়। দেখা গেল, যাঁরা ল্যাব কোট পরে বসেছেন, তাঁরা কঠিন প্রশ্নগুলোতে প্রায় অর্ধেক কম ভুল করছেন সেই তুলনায় যাঁরা নিজের জামাতেই আছেন।

এখানেই থামলে গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না হয়ত। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সাদা কোটটা তো নিছক ‘ডাক্তার’ কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাতেই কাজ হচ্ছে না তো? গায়ে চড়ানোর দরকার কী?
তাই দ্বিতীয় পরীক্ষা। ৭৪ জন ছাত্রছাত্রীকে তিন ভাগে ভাগ করা হল। এক দলকে একই ডিসপোজেব্‌ল সাদা কোট পরানো হল, বলা হল এটা ডাক্তারের কোট। আর এক দলকে একদম হুবহু সেই একই কোট পরানো হল, শুধু বলা হল এটা শিল্পীর কোট, ছবি আঁকার সময় পরে। তৃতীয় দলকে কোটটা পরানো হল না, শুধু টেবিলে সাজিয়ে রাখা হল সামনে, বলে দেওয়া হল ওটা ডাক্তারের কোট। তারপর সবাইকে ‘দুটো ছবির মধ্যে চারটে তফাৎ খুঁজে বার করুন’ ধরণের কাজ দেওয়া হল – মনোযোগ ধরে রাখার পরীক্ষা।

ফল: ডাক্তারের কোট গায়ে থাকা দলটা বাকি দুই দলকে হারিয়ে দিল। আর বাকি দুই দলের মধ্যে, শিল্পীর কোট পরা দল আর ডাক্তারের কোট দেখা দল, কোন তফাৎই নেই!
অর্থাৎ কাপড়টা এক, সুতোটা এক, ওজন এক। বদলেছে শুধু নামটা। কোটের গায়ে যে অদৃশ্য লেবেলটা সাঁটা আছে – ‘ডাক্তার’ না ‘শিল্পী’ – সেটাই আপনার মনোযোগ ঠিক করে দিচ্ছে। এবং শুধু লেবেল যথেষ্ট নয়, গায়ে চড়াতেই হবে। দেখলে হবে না।

অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি লিখলেন, এনক্লোদ্‌ড কগনিশনের দুটো শর্ত: এক, জামার প্রতীকী অর্থ; দুই, জামাটা সত্যি সত্যি গায়ে দেওয়ার শারীরিক অভিজ্ঞতা। দুটো একসাথে না হলে কিছু হয় না।


এবং তারপর সেই পরীক্ষা ভেঙে পড়ল

অ্যাডাম-গ্যালিনস্কির পেপারটা হইহই করে বিখ্যাত হয়ে গেল। ছ’বছরে দুশোর বেশী উদ্ধৃতি, খবরের কাগজে লেখালিখি, টেড টক-এর মালমশলা। এবং তারপর, ২০১৯ সালে, ডেভিন বার্নস আর তাঁর সহকর্মীরা কাজটা আবার করলেন। এবারে আগে থেকে সব কিছু ঘোষণা করে – কী মাপব, কতজনের উপর, কীভাবে হিসেব কষব, সব রেজিষ্টার করা, যাতে ফল দেখে পরে অঙ্ক পাল্টানো না যায়। অনেক বেশী লোক, অনেক বেশী ট্রায়াল।


ভাবছেন কি পাওয়া গেল পরীক্ষায়? ল্যাব কোটের কোন প্রভাবই পাওয়া গেল না!

বার্নস দেখালেন, তাঁদের যন্ত্রপাতি এতই সূক্ষ্ম যে সাত মিলিসেকেন্ডের তফাৎও ধরা পড়ছে। কাজেই ‘ভুলটা আমাদের যন্ত্রের’ – এ ওজর চলবে না। ল্যাব কোটের এফেক্ট যদি থেকেও থাকে, সেটা এত ছোট যে মূল পরীক্ষায় ওটা ধরা পড়ারই কথা নয়।

এবার এই সময়েই বিজ্ঞানীদের সঠিক চরিত্র বোঝা যায়। অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি একই জার্নালে একটা উত্তর লিখলেন যা পড়ে উনাদের প্রতি সম্মান বেড়ে যেতে বাধ্য। তাঁরা লিখলেন, রিপ্লিকেশনের কাজটা যোগ্য হাতে হয়েছে, এবং তার ফল তাঁদের নিজেদের স্ট্রুপ-ফলাফল নিয়ে সত্যিকারের সন্দেহ তৈরী করছে। ঝগড়া নয়, গোঁজামিল নয়, ‘আমাদের বোঝোনি’ নয়। তারপর তাঁরা বললেন – কিন্তু মূল ধারণাটা, যে আমরা যা পরি তা আমাদের ভাবা-অনুভব-করা-আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটা অন্য অনেক পরীক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে।

এবং সেটা মিথ্যে নয়। যেমন ধরুন মাইকেল স্লেপিয়ানের কাজ, পাঁচটা পরীক্ষায় তিনি দেখিয়েছেন, ফর্ম্যাল পোশাক পরলে মানুষ বেশী বিমূর্ত ভাবে ভাবতে শুরু করে। গাছের দিকে না তাকিয়ে জঙ্গলটা দেখে, ছোট ছোট বিশদের বদলে বড় ছবিটা ধরে। মাঝখানে যে জিনিসটা কাজ করছে তা হল ‘ক্ষমতার অনুভূতি’ – টাই বাঁধলে যেমন নিজেকে খানিকটা তফাতের, খানিকটা উপরের মানুষ মনে হয়, আর দূর থেকে দেখলে সব কিছুই বড়-বড় দাগে দেখা যায়।

তার মানে, সাদা কোট পরে বসে থাকলেই আপনি খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করবেন - এই সহজ, লোভনীয়, ইনস্টাগ্রামে-ছড়ানোর-মত সিদ্ধান্তটা টেকে না। কিন্তু জামার সাথে মনের একটা যোগ আছে – সেটা একটা ঘটনা।


সাঁতারের পোশাক এবং একটা অঙ্ক পরীক্ষা

জামা যে কেবল আত্মবিশ্বাস বাড়ায় তা নয়। কখনো কখনো সে কেস কেলো-ও করে দেয়।

১৯৯৮ সালে বারবারা ফ্রেডরিকসন এবং তাঁর সহকর্মীরা একটা পরীক্ষা করেছিলেন যেটার কথা আমি প্রথমবার পড়ে বেশ ভেবেছিলাম। ছাত্রছাত্রীদের বলা হল, এটা ‘আবেগ এবং ক্রেতা-আচরণ’ নিয়ে একটা গবেষণা – তাদের কিছু জিনিসপত্র পরে দেখে মতামত দিতে হবে। তারপর প্রত্যেককে একা একা একটা ট্রায়াল রুমে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, সামনে আয়না। অর্ধেককে দেওয়া হল একটা সোয়েটার। বাকি অর্ধেককে সাঁতারের পোশাক। সেই পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই তাদের কিছু প্রশ্নপত্র ভরতে দেওয়া হল, তারপর কিছু খাবার চাখতে দেওয়া হল, এবং শেষে একটা অঙ্ক পরীক্ষা।


ঘরে আর কেউ নেই, কেউ দেখছে না। তবুও -

মেয়েদের ক্ষেত্রে সাঁতারের পোশাক জন্ম দিল লজ্জা এবং একটা তীব্র আত্ম-বিতৃষ্ণার। তারা খাবার কম খেলো, নিজেকে সংযত করলো এবং অঙ্ক পরীক্ষায় খারাপ করলো সোয়েটার-পরা মেয়েদের তুলনায়। গবেষকদের ব্যাখ্যা: শরীরটাকে যখন বাইরের একজোড়া চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করি, তখন মাথার একটা বড় অংশ ওই পাহারা দেওয়ার কাজেই খরচ হয়ে যায়। অঙ্ক করার জন্য যা পড়ে থাকে, তা কম।

ছেলেদের ক্ষেত্রে? সাঁতারের পোশাক পরে তারা লজ্জা তো পায়নি বটেই বরং পেয়েছে তাদের হাসি। তারা লিখেছে নিজেদের ‘বোকা-বোকা’, ‘অস্বস্তিকর’, ‘হাস্যকর’ লাগছে। গবেষকরা রিপোর্টে লিখেছেন, ট্রায়াল রুমের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে কয়েকজনের হাসির আওয়াজ পাওয়া গিয়েছিল। তাঁদের খাওয়ায় কোন হেরফের হয়নি। অঙ্কেও না, বরং সামান্য ভালোই করেছিলেন।
একই ঘর, একই আয়না, একই কম কাপড়। একদলের কাছে সেটা ঠাট্টা, আর একদলের কাছে বিচারসভা।

এটা আমাদের বাড়ির ভিতরেও রোজ ঘটে, শুধু আমরা নাম দিই না। মেয়েটির ‘এই জামায় আমাকে মোটা লাগছে না তো?’ আর ছেলেটির ‘যা হোক একটা গলিয়ে নিয়েছি’ – এই দুটো বাক্যের মধ্যে যে অসমান দূরত্ব, তার একটা মাপ আছে, এবং সেই মাপটা কারো তৈরী করা।


বাজার এই পেপারগুলো পড়ে ফেলেছে

ভাবছেন এই যে সব গবেষণাপত্রের কথা লিখলাম, তারা শুধু জার্নালের পাতায় ধুলো খাচ্ছে? মোটেই না – মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টগুলো এগুলো আমাদের অনেক আগে পড়েছে।
‘অ্যাথলেজার’ শব্দটা শুনেছেন? অ্যাথলেটিক আর লেজার মিলিয়ে বানানো – ব্যায়ামের পোশাক, যা ব্যায়ামের বাইরেও পরা হয়। লেগিংস, জগার, হুডি, ইয়ো গা প্যান্ট। যে জিনিসটা জিমে পরার কথা ছিল, সেটা এখন অফিসে, ব্রাঞ্চে, মুদির দোকানে, বিমানবন্দরে। বাজারের মাপ? সমীক্ষা-সংস্থাগুলোর হিসেব একেক রকম, কিন্তু সবাই একমত যে ২০২৫ সালে এটা চারশো বিলিয়ন ডলারের [১ বিলিয়ন ডলার মানে মোটামুটি ১০০ কোটি টাকা] আশেপাশে দাঁড়িয়ে এবং আগামী দশ বছরে দ্বিগুণেরও বেশী হবে। একটা প্যান্টের ব্যবসা, যেটা কার্যত পঁচিশ বছর আগেও ছিল না।

২০১৯ সালে সারা লিপসন এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রথমবার এই ট্রেন্ডটাকে শরীর-ভাবনার আয়নায় ফেললেন – কুড়িজন নিয়মিত অ্যাথলেজার-পরা মহিলার সাথে দীর্ঘ কথাবার্তা। যা বেরিয়ে এল, তা প্রায় নিখুঁত এক ফাঁদের নকশা।

এক, লেগিংস পরলে তাঁদের মনে হয় তাঁরা ফিট, স্বাস্থ্যসচেতন, আত্মবিশ্বাসী – পোশাকটা যেন একটা লাইফস্টাইলের সদস্যপত্র। এনক্লোদ্‌ড কগনিশন হাতেনাতে।

দুই, একই পোশাক শরীরটাকে এমন ভাবে ধরে রাখে যে যেখানে যেখানে ‘সমস্যা’, সেগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একজন বলেছেন, আঁটোসাঁটো জিনিস পরলে আমি ঠিক বুঝতে পারি কোথায় কোথায় কাজ করতে হবে। আর একজন আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, এই কারণেই তাঁর মাথায় প্লাষ্টিক সার্জারির কথা আসতে শুরু করেছে।

তিন, তাই তাঁরা জিমে যান। জিমে গিয়ে শরীর বদলায়, বদলটা লেগিংসে দেখা যায়, দেখে ভালো লাগে, আরো জিমে যান।

চার, এবং এটাই সবচেয়ে মনে হয় ইন্টারেষ্টিং – কুড়ি জনের মধ্যে উনিশ জনই স্পষ্ট বলেছেন যে এই গোটা ব্যাপারটা অবাস্তব, অসম্ভব, বিজ্ঞাপনের দুনিয়া বাস্তবের সাথে সম্পর্কহীন। তাঁরা জানেন, কিন্তু তবুও -

এটাকে গবেষকরা বলেছেন ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’। আমি বলব, এটাকে বলে ভালো ব্যবসা। আমার পিসতুতো দাদা অরবিন্দ যেটা ভালো বোঝে খুব! যে পণ্যটা আপনার অভাববোধ তৈরী করে এবং সেই অভাব মেটানোর পথও দেখায়, এবং যার দাম আশি ডলার – সেই পণ্যের চেয়ে নিখুঁত জিনিস বাজারে খুব বেশী নেই। জিমের সদস্যপদটা পর্যন্ত এত ভালো কাজ করে না, কারণ জিমে না গেলে অন্তত ব্যাপারটা চোখে পড়ে না। লেগিংস রোজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিসেব চায়!


ইউনিফর্ম – ক্ষমতার সবচেয়ে সস্তা রূপ

এবার একটু অন্য দিকে তাকানো যাক। আমাদের হাউসিং সোসাইটির সিকিউরিটি গার্ডরা অনেকেই যেভাবে ডেলিভারী বয়-গুলোকে হ্যাটা করে সেটা দিনের পর দিন দেখার পর এই দিকটা নিয়ে না কিছু লিখলে আমার নিজেরই খারাপ লাগবে।

১৯৯৬ সালে আমেরিকার শিক্ষা দপ্তর হিসেব করে দেখল, মাত্র ৩ শতাংশ সরকারী স্কুলে ইউনিফর্ম বাধ্যতামূলক। প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন বললেন, ইউনিফর্ম ক্লাসঘরকে বেশী শৃঙ্খলাবদ্ধ, বেশী সুশৃঙ্খল করে তোলে – স্কুলগুলোর উচিত এটা চালু করা। ২০০৫ সালের মধ্যে সংখ্যাটা দাঁড়াল ১৪ শতাংশে। চারগুণেরও বেশী।


কিন্তু সত্যিই কি এত পজিটিভ এফেক্ট পাওয়া যায় ?

এলিসাবেতা জেন্টিলে আর স্কট ইমবারম্যান দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকার এক বিশাল শহুরে স্কুল ডিষ্ট্রিক্টের তথ্য নিয়ে বসলেন। সুবিধেটা এই যে সেখানে প্রতিটা স্কুল নিজে ঠিক করে ইউনিফর্ম চালু করবে কিনা, এবং আলাদা আলাদা বছরে করে। ফলে একই ছাত্রকে ইউনিফর্মের আগে আর পরে দু’ভাবেই দেখা যায়।

ফল? উঁচু ক্লাসে হাজিরা সামান্য বাড়ে, বছরে বাড়তি আধখানা দিন মত। শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় কোন উল্লেখযোগ্য হেরফের নেই। পরীক্ষার নম্বরে কার্যত কিছুই না।

তবে একটা জায়গায় বেশ বড় প্রভাব পাওয়া গেল, এবং সেটা প্রায় কেউ ভাবেইনি: প্রাথমিক স্কুলে ইউনিফর্ম চালু হবার পর শিক্ষকরা চাকরী ছেড়ে যাওয়া অনেক কমে গেল। গড়ে যেখানে পঁচিশ শতাংশ শিক্ষক প্রতি বছর চলে যেতেন, সেখানে পাঁচ শতাংশ কমে গেল।

অর্থাৎ ইউনিফর্মে ছেলেমেয়েদের কিছু বিশেষ হল না। যা হল, তা হল শিক্ষকদের। একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্লাসঘরের চেহারা দেখলে শিক্ষকের নিজের মনে হয় জায়গাটা চালানোর মত। মজাটা এখানেই – ইউনিফর্ম শিশুদের বদলায় না, বদলায় শিশুদের দিকে তাকিয়ে থাকা লোকটাকে।

এই বিভ্রম কতদূর যেতে পারে, তার একটা মোক্ষম উদাহরণ পাওয়া যায় বেসরকারী নিরাপত্তারক্ষীদের ইউনিফর্ম নিয়ে লেখাপত্রে। আমেরিকার প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের লোকেদের প্রায়-পুলিশ পোশাক পরিয়ে এসেছেন – গাঢ় নীল শার্ট, ব্যাজ, বেল্টে ঝোলানো সরঞ্জাম। কারণ? লোকে ভয় পাবে, কথা শুনবে। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনে এটা রীতিমতন নিষিদ্ধ – পোশাক এমন হতে পারবে না যাতে মনে হয় লোকটি সরকারী আইনরক্ষী।

আর যাঁরা এই নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা বলছেন, আইন বাদ দিলেও ব্যাপারটা ব্যবসার দিক থেকেই বোকামি। কারণ পুলিশের পোশাক পরলে মানুষ পুলিশের মত সেবা আশা করে – যা এঁরা দিতে পারেন না, দেবার অধিকারও নেই। আবার পুলিশের প্রতি মানুষের যত রাগ, বিরক্তি, তিক্ত অভিজ্ঞতা – সে সবও ছিটকে এসে এঁদের গায়ে লাগে। ঠকানোর চেষ্টা ধরা পড়লে মানুষ ক্ষমা করে না। লেখকদের যুক্তিটা চমৎকার: কর্তৃত্ব আসে আইন থেকে, আর ব্যক্তিগত গুণ থেকে। পোশাকের রঙ থেকে নয়। পৃথিবীর নানা দেশে পুলিশের পোশাক সাদা, খাকি, বাদামী, সবুজ, কালো – সব রকমই আছে। তাহলে কর্তৃত্ব কোন রঙে?


লাল স্নিকার এবং যাঁরা নিয়ম ভাঙার লাইসেন্স পান

এতক্ষণ পড়ে যদি ভাবেন তাহলে সবাই স্যুট পরাই ভালো, তাঁদের বলি একটু সবুর করুন। আমি নিজে যেহেতু কোট, স্যুট ইত্যাদি পরি না, তাই সেগুলো না পরলেও তেমন কিছু পার্থক্য হয় না এমন কিছু স্টাডির প্রতি দুর্বলতা আছে।

সিলভিয়া বেলেৎসা, ফ্রান্সেসকা জিনো আর অ্যানাট কেইনান, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের এই তিনজন এক অদ্ভুত জিনিস দেখালেন, যার নাম দিয়েছেন ‘লাল স্নিকার এফেক্ট’। ধরুন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ফর্ম্যাল মিটিং-এ ঢুকলেন লাল স্নিকার পায়ে। বা ধরুন এক ভদ্রলোক দামী বুটিকে ঢুকলেন জিমের পোশাকে। ছাত্র বা দোকানের বিক্রেতা কী ভাবে?
গবেষণা বলছে – তাঁরা লোকটিকে বেশী উঁচু জাতের, বেশী ক্ষমতাশালী, বেশী যোগ্য বলে ধরে নেন। কারণ যুক্তিটা মাথার ভিতরে এই রকম চলে: এই লোকটা তো জানে নিয়মটা কী। তবুও ভাঙছে। মানে ভাঙার সামর্থ্য আছে। মানে ভয় পাবার কিছু নেই। মানে বড় লোক।

এই যুক্তিটা দিয়েই সিলিকন ভ্যালির হুডি, স্টিভ জবসের কালো টার্টলনেক, বিলিয়নেয়ারের ছেঁড়া জিন্স।

কিন্তু – এবং এই ‘কিন্তু’-টা বেশ জটিল - গবেষকরা খুব যত্ন করে দেখিয়েছেন কখন এই ম্যাজিক কাজ করে না। এক, যদি দর্শক জায়গাটাকে না চেনে (মানে নিয়মটাই যদি না জানে, তাহলে নিয়ম ভাঙাটা দেখবে কী করে?)। দুই, যদি মনে হয় লোকটা ইচ্ছে করে নয়, বেখেয়ালে ভুল করেছে। তিন, যদি সেখানে ফর্ম্যাল হবার কোন প্রত্যাশাই না থাকে।

অর্থাৎ, নিয়ম ভাঙার লাইসেন্স পাওয়া যায় কেবল তখনই, যখন সবাই জানে যে আপনার নিয়ম মানার আর দরকার নেই। আমার মত লোক টি-শার্ট পরে গেলে কোন ফ্যাক্টরির গেটে হয়ত দাঁড় করিয়ে দেবে – আর মার্ক জুকারবার্গ হুডি পরে গেলে সেটা দর্শন।

এ ব্যাপারটা আমাদের গ্রামের দিকে অন্য চেহারায় বহুদিন ধরে আছে। বড়লোক বড়ির কর্তা ময়লা ধুতি পরে বাজার করতে বেরুতে পারেন, তাতে কারো ভুল হয় না। ভুল হয় না কারণ সবাই জানে ধুতিটা কার। দারিদ্র্য আর সাদাসিধেপনার মধ্যে যে তফাৎ, সেটা কাপড়ে নয় – সেটা দর্শকের মাথায়।


লিফটের পাশের আয়না

সমাজতত্ত্বে এই গোটা ব্যাপারটার একটা সুন্দর ব্যাখ্যা আছে, যেটা দিয়েছিলেন গ্রেগরি স্টোন, ১৯৬২ সালে। তাঁর মতে পোশাক দিয়ে পরিচয় তৈরী হয় দুটো ধাপে। প্রথম ধাপ – যাকে তিনি বলেছেন ‘প্রোগ্রাম’ – আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি এবং ঠিক করি আমি কী বলতে চাইছি। দ্বিতীয় ধাপ – ‘রিভিউ’ – অন্যরা আমাকে দেখে এবং প্রতিক্রিয়া জানায়। দুটো যদি মিলে যায়, আমার ‘আমি’-টা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যদি না মেলে? তাহলে, স্টোন বলছেন, মানুষ নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে। ভাবলে বেশ ভজকট মনে হয়! মানে আমার নিজের সম্পর্কে ধারণাটা পুরোপুরি আমার নিজের হাতে নেই। ওটা একটা যৌথ প্রকল্প, যেখানে ভোট দেয় বাসের সহযাত্রী, অফিসের রিসেপশনিষ্ট, আর গেটের সিকিউরিটি ছেলেটি।

সাংগঠনিক পোশাক নিয়ে কাজ করা এক গবেষকদলের একটা কথা মাথায় গেঁথে গেছে। তাঁরা বলছেন, অফিসের সবচেয়ে অবহেলিত অথচ সবচেয়ে ক্ষমতাশালী যন্ত্রটি হল আয়না এবং লক্ষ্য করুন, আয়নাগুলো সাধারণত বসানো থাকে লিফটের পাশে। কেন? কারণ ঠিক ওইখানেই দুটো জগতের সীমানা - ঘর আর অফিস, ব্যক্তিগত আর সরকারী। কলার ঠিক করে নেওয়া, চুলে হাত বুলিয়ে নেওয়া, শাড়ির আঁচলটা টেনে দেওয়া – ওটা প্রসাধন নয়। ওটা সীমান্তে পাসপোর্ট দেখানো।


এবং একটা নতুন জামার গন্ধ

তাহলে কি দাঁড়ালো মোটের উপর? এত পরীক্ষা, এত পরিসংখ্যান, এত ব্যাখ্যা! কিন্তু আমাদের অনেকের মনে যে ছবিটা বা ছবিগুলো আসল হিসেবে গেঁথে থাকে, সেটা কোন জার্নালে ছাপা নেই।

ছোটবেলায় বছরে জামা হত কটা? গোটা কয়েক এবং তাদের প্রায় সব কটাই কেনা হত দুর্গা পুজোয়। কেনা হত মাসখানেক আগে, তারপর আলমারীতে তোলা থাকত, প্লাষ্টিকের প্যাকেট সমেত। মাঝে মাঝে খুলে দেখা হত বাড়িতে কেউ এলে। শুঁকে দেখা হত। নতুন কাপড়ের সেই গন্ধ – একটু কড়া, একটু মিষ্টি, খানিকটা রঙ আর খানিকটা মাড় – ওটা আসলে গন্ধ ছিল না, ওটা ছিল একটা প্রতিশ্রুতি। পুজোর সকালে ওটা গায়ে চড়ালে আমি একটু অন্য মানুষ হয়ে যাব।

এবং হতাম না কি আমরা? আমার তো মনে হয় সত্যিই হতাম এবং এখনো অনেকেই হয়। বুক চিতিয়ে হাঁটতাম, পাড়ার যে ছেলেটার সাথে ঝগড়া তার সামনে দিয়ে বার তিনেক ঘুরে আসতাম, আর মন্ডপে যে মেয়েটি প্রতি বছর আসত তার দিকে খানিকটা বেশী সাহস নিয়ে তাকাতাম। অ্যাডাম আর গ্যালিনস্কি এটার নাম দিয়েছেন এনক্লোদ্‌ড কগনিশন। আমরা নামটা জানতাম না, কিন্তু জিনিসটা জানতাম।

তফাৎ শুধু এই যে তখন জামাটা ছিল একটা ঘটনা – বছরে একবার। আর এখন জামা একটা অবিরাম ব্যবস্থা। এখন কেউ আপনাকে প্রতিশ্রুতি বিক্রী করে না; বিক্রী করে একটা অভাববোধের সাবস্ক্রিপশন। লেগিংস কিনবেন যাতে ফিট মনে হয়, ফিট নন বলে জিমে যাবেন, জিমের জন্য আরো লেগিংস কিনবেন। স্যুট কিনবেন যাতে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়, তারপর দেখবেন সহকর্মীর স্যুটটা আরো ভালো।

গবেষণাগুলো পড়ে আমি এই সিদ্ধান্তে আসিনি যে কাল থেকে টি-শার্ট পরে অফিস যাব – সেটাতে নতুন কিছু নেই, কারণ আমি ট-শার্ট আর জিন্স পরেই অফিস যাই। তাহলে এই বিষয়ের পেপারগুলো পড়ি কেন? আসলে ব্যাপারটা বুঝতে চাই – বুঝতে চাই মানুষের মনস্তত্ত্ব। তো যা বুঝলুম তার একটা দিক হল, সরল ভাবে বললে - সকালে একটা জামা বাছি যেটা পরে অফিসে যাব, আর সারাদিন ধরে অন্যের জামা দেখে তাদের বিচার করি। প্রথম কাজটা নিয়ে আমরা অনেক ভাবি, অনেক খরচ করি, অনেক দুশ্চিন্তা করি।

দ্বিতীয় কাজটা নিয়ে আমরা কার্যত কিছুই ভাবি না। ওটা হয়ে যায়, আপনা আপনি, নিঃশব্দে, চোখের পলক পড়ার আগেই। ফরসাইথের ভিডিওতে আওয়াজ ছিল না – তবুও ১০৯ জন লোক দিব্যি বলে দিলেন কে চাকরীটা পাবার যোগ্য।

আমার মনে হয়, বদলানোর জায়গাটা ওইখানে। নিজের জামাকাপড় নিয়ে যত মাথা ঘামাই, তার এক শতাংশও যদি অন্যের জামাকাপড় নিয়ে নিজের জাজমেন্ট-টাকে চ্যালেঞ্জ করার কাজে খরচ করতাম, তাহলে হয়ত সামগ্রিক পরিস্থিতি উন্নতি হবার ব্যাপারে আমার নিজের একটু অবদান থাকত!

এখন প্রশ্ন হল, আজ সকালে আপনি যে পোষাকটা পরে বেরিয়েছেন – সেটা কে বেছেছে? আপনি? না কি আজ যাদের সাথে দেখা হবে, তারা?




তথ্যসূত্র


1) Adam, H., & Galinsky, A. D. (2012). Enclothed cognition. Journal of Experimental Social Psychology, 48(4), 918–925.
2) Burns, D. M., Fox, E. L., Greenstein, M., Olbright, G., & Montgomery, D. (2019). An old task in new clothes: A preregistered direct replication attempt of enclothed cognition effects on Stroop performance. Journal of Experimental Social Psychology, 83, 150–156.
3) Adam, H., & Galinsky, A. D. (2019). Reflections on enclothed cognition: Commentary on Burns et al. Journal of Experimental Social Psychology, 83, 157–159.
4) Slepian, M. L., Ferber, S. N., Gold, J. M., & Rutchick, A. M. (2015). The cognitive consequences of formal clothing. Social Psychological and Personality Science, 6(6), 661–668.
5) Forsythe, S. M. (1990). Effect of applicant's clothing on interviewer's decision to hire. Journal of Applied Social Psychology, 20(19), 1579–1595.
6) Fredrickson, B. L., Roberts, T.-A., Noll, S. M., Quinn, D. M., & Twenge, J. M. (1998). That swimsuit becomes you: Sex differences in self-objectification, restrained eating, and math performance. Journal of Personality and Social Psychology, 75(1), 269–284.
7) Lönnqvist, J.-E. (2017). Just because you look good, doesn't mean you're right. Personality and Individual Differences, 108, 133–135.
8) Berggren, N., Jordahl, H., & Poutvaara, P. (2017). The right look: Conservative politicians look better and voters reward it. Journal of Public Economics, 146, 79–86.
9) Hamermesh, D. S. (2011). Beauty Pays: Why Attractive People Are More Successful. Princeton University Press.
10) Lipson, S. M., Stewart, S., & Griffiths, S. (2020). Athleisure: A qualitative investigation of a multi-billion-dollar clothing trend. Body Image, 32, 5–13.
11) Gentile, E., & Imberman, S. A. (2012). Dressed for success? The effect of school uniforms on student achievement and behavior. Journal of Urban Economics, 71(1), 1–17.
12) Bellezza, S., Gino, F., & Keinan, A. (2014). The red sneakers effect: Inferring status and competence from signals of nonconformity. Journal of Consumer Research, 41(1), 35–54.
13) Johnson, K., Lennon, S. J., & Rudd, N. (2014). Dress, body and self: Research in the social psychology of dress. Fashion and Textiles, 1:20.
14) Johnson, K. K. P., Yoo, J.-J., Kim, M., & Lennon, S. J. (2008). Dress and human behavior: A review and critique. Clothing and Textiles Research Journal, 26(1), 3–22.
15) Lennon, S. J. (2012). Clothing and adornment: Social psychology perspectives. In Encyclopedia of Body Image and Human Appearance (pp. 321–327). Elsevier.
16) Fredrickson, B. L., & Roberts, T.-A. (1997). Objectification theory: Toward understanding women's lived experiences and mental health risks. Psychology of Women Quarterly, 21(2), 173–206.
17) Stone, G. P. (1962). Appearance and the self. In A. M. Rose (Ed.), Human Behavior and Social Processes. Houghton Mifflin.
18) Sena, J. F. (2015). Presenting a professional image. In Conflict Management for Security Professionals (Ch. 4). Elsevier/Butterworth-Heinemann.
19) Harding, N., & Tomkins, L. (2012/2013). 'Do I look right?' De-familiarizing the organizational fashioning of the body. European Management Journal (organizational dress and the mirror).
20) Glick, P., Larsen, S., Johnson, C., & Branstiter, H. (2005). Evaluations of sexy women in low- and high-status jobs. Psychology of Women Quarterly, 29(4), 389–395.
21) Morris, T. L., Gorham, J., Cohen, S. H., & Huffman, D. (1996). Fashion in the classroom: Effects of attire on student perceptions of instructors in college classes. Communication Education, 45(2), 135–148.
22) Fortune Business Insights / Grand View Research (2026). Athleisure Market Size, Share & Growth Reports (global market estimates, 2025–2026).




 ***গুরুচন্ডালী প্ল্যাটফর্মে সুকান্ত ঘোষের নিজস্ব ব্লগ থেকে নেওয়া। 

প্রবন্ধ - অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়







শ্রাবণ তার চরিত্র এতটুকু বদলায়নি। এক অদ্ভূত মাস এই শ্রাবণ। সারা গ্রীষ্মের তাপে বাষ্পীভূত মেঘ আষাঢ়ে ঘন শ্যামলচ্ছায়া থেকে বিশুদ্ধ পরিস্রুত জল ঝরিয়ে দেয় এক বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। মেঘের ভার যখন কমে আসে আষাঢ় তার কাজ শেষ করে শ্রাবণকে পাঠায়। এই শ্রাবণ জলভরা মেঘের ঘনত্ব ও আয়তন কমাতে থাকে ধীরে ধীরে। কমতে থাকে বৃষ্টির তেজ ঝাঁঝ। মেঘ টুকরো হতে থাকে নানা আকারে ফলে আর অনেকটা এলাকা জুড়ে আর বর্ষণ নয়, বরং এলাকাভিত্তিক মেঘের চোরপুলিশ খেলা রোদ্দুরের সাথে। এই শ্রাবণের চরিত্রের কথাই বলতে ইচ্ছে করছে। ছোটবেলা থেকেই আকাশ দেখার শখ আর তা থেকে প্রকৃতির চক্র বোঝা যা ঋতুচক্রও বটে। সেই ছোটবেলায় যেমনটি দেখেছিলাম শ্রাবণ আজও তেমনই চঞ্চল। আকাশের কোনও একটা দিগন্ত থেকে উঠে আসে কাজল মেঘ, ছেয়ে যায় মাথার ওপর দিয়ে অন্য প্রান্তের দিকে আর যাবার সময় ঝাঁপিয়ে ঝরিয়ে দেয় সঞ্চিত জল। অল্পসময় ভারি বর্ষণে যা হবার তাই হয়, প্লাবিত রাস্তা আর মন্থর চলাচলের যান, ফলত, যানজট। বৃষ্টি থেমে যাবার পর কিছুটা সময় জলীয় বাষ্প মাখা শীতল আমেজ আর তারপরেই কুলকুল বহে নদ-নদী শরীর বেয়ে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি, দুপুরে পশ্চিম থেকে ভেসে এল ঘন কালো মেঘ আর তুমুল বর্ষণ। এলোমেলো হাওয়ায় জলকণার ওড়াউড়ি যেমন চলছে তার সাথে ভারী মোটা দানার পতন। কোনরকম পূর্বঘোষিত বার্তা ছাড়াই এলোমেলো বাতাসে দক্ষিণের বারান্দা আর জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছিটে এসে ঘরদোর ভাসিয়ে দেয়। ভাল লাগে বাহাত্তুরে বুড়োর দুষ্টু নাতনির সাথে এই খেলা খেলতে। সারাটা সকাল ঘেমে-নেয়ে অস্থির হবার পর স্বাভাবিকভাবেই দেখতে ভাল লাগছিল, জলকণায় ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম শরীর। একঘন্টা মত এরকম চলার পর আকাশ ফর্সা। যেন কিছুই হয়নি, শুধু রাস্তা জলমগ্ন।

অন্যসময় এই শ্রাবণ ভালোই লাগে কিন্তু জবরদস্তি অন্তরালে একা থাকা আর থেকে থেকে বৃষ্টি আরও যেন বন্দিদশায় একাকীত্ব বাড়িয়ে দেয়। মন চায় ছুটে দূরে কোথাও চলে যেতে। মনে পড়ে গেল চার বছর আগের এমন এক শ্রাবণ। সত্যি বলতে কি, সেবার প্রায় মাসখানেক ধরেই মনটা উড়ুউড়ু করছিল। নানা গ্রুপের বন্ধুদের উস্কানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলাম, শেষে পঞ্চাশ বছর আগের কলেজের বন্ধুরাই একমত হলাম। কাছাকাছি কোথাও একরাত কাটানো, নিজের বাড়ির ঘরের সেই একঘেয়ে চার দেয়ালের বাইরে থাকা একটা রাত, কিছুটা সময়, আর অফুরন্ত আড্ডা। আহামরি কিছু না হলেও সেটা সম্ভব হল আর চার বন্ধুর অফুরন্ত জীবনীশক্তির জন্যে। সেটা ছাড়াও বেরিয়ে একটা অন্য উপলব্ধি হয়েছে, সেটা বলার জন্যে একটা চাপ আসছে ভেতর থেকে।

এই যে আমরা স্থানান্তরে ভ্রমণে যাই সেটা তো পৃথিবীর ঘাড়ে চেপেই রোজ হচ্ছে। সৌরমণ্ডলের যে অবস্থানে আমরা আছি তা তো অনবরত বদলে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে আমার যেখানে অবস্থান পৃথিবীই তো ঠেলে বদলে দিচ্ছে তার ঠিকানা প্রতিনিয়ত। আপন অক্ষের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে রোজ কত ঘুরিয়ে দিচ্ছে। উত্তর গোলার্ধে যারা আছে তারা যেমন আবর্তিত হচ্ছে তেমনই দক্ষিণ গোলার্ধের লোকেরাও। আর শুধু কি তাই? ভেবে দেখলে এটাও সত্যি আমাদের এই গ্যালাক্সির সূর্য সমেত সব নক্ষত্রই ঘূর্ণায়মান, তার অবস্থান পালটে যাচ্ছে অনবরত। তার মানে আমরা এক অর্থে মহাকাশচারীও বটে। এটা সত্যি, বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যি। কিন্তু বিজ্ঞান জ্ঞানের সন্ধান দিলেও মনটা মানবে কি করে। তার বিজ্ঞান তো অন্য। তার পরিচালনার ভার প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন, বিচিত্র। আমাদের মন কি চায়? তার ভ্রমণের অর্থ ইন্দ্রিয় দ্বারা চেনা পরিচিত জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া। তার মূল্য আবর্তনের হিসেবে নয়, ভৌগোলিক দূরত্ব হওয়া চাই, বস্তু হিসেবে ইংরেজিতে যাকে বলে মেটিরিয়ালিস্টিক। ভাবের নদীতে তরী বেয়ে আমরা কত জায়গায় ভ্রমণ করি, তাতে মনের একটা আবেগ যাকে ভাবাবেগ বলে সন্তুষ্ট হলেও হতে পারে কিন্তু বস্তুবাদী আবেগ কান্নাকাটি করে, সে চায় নির্দিষ্ট ভাবে আক্ষরিক স্থানান্তর, পৃথিবীর ঘাড়ে চেপে নয়, রীতিমতো গাড়িঘোড়া চেপে অন্যকোথাও অন্যকোনোখানে। আর তাতেই মজা। প্রকৃতির অন্য রূপ, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অথবা মনুষ্যকৃত স্থাপত্যের আরেক প্রদর্শনী এসবই আমাদের মনকে আপ্লুত করে, সাময়িক বিশ্রাম পায় একঘেয়ে জীবনের দিনলিপি। এটাই ভ্রমণের আনন্দ বলে আহ্লাদিত হই।

চার বছর আগে যেখানে গেছিলাম সেটা বিস্তীর্ণ ধানখেতের মধ্যে একটা আলের ওপর কৃত্রিম গড়ে তোলা গ্রামের আবছায়া, রিসর্ট। নাম সুন্দরগ্রাম। বলে রাখি, কৃত্রিমে আমার একটা অ্যালার্জি আছে। যাই হোক, বর্ষার শেষের দিকে এখন সেখানে ধানগাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে। সেটা মন্দ নয়। নীরবতা ছেয়ে চারিদিক। কিছু দোয়েল, ফিঙে, বুলবুল নিশ্চিন্তে ওড়াউড়ি করছে, মাঝেমধ্যে কেউ একটা শিস দিয়ে সাথীকে ডাকছে অথবা আপন খেয়ালে আকাশের দিকে মুখ তুলে আনন্দ প্রকাশ করছে। কাছেই ইটভাটা, সেখানে কিছু কর্মচারী রয়েছে পরিবার নিয়ে। আর রিসর্টে আমাদের মত কিছু পর্যটক, কর্মচারী। এছাড়া জনমনিষ্যি চারপাশে নেই। আড়াই কিলোমিটার দূরে অন্য গ্রাম।

এরকম বাইরে যাবার দুটো উদ্দেশ্য, পরিবার নিয়ে দু-এক দিন চেনা জগৎ থেকে পালিয়ে মুক্তির স্বাদ চেটেপুটে নেওয়া, আনন্দ ভাগ করা আর নয়তো বন্ধুদের সাথে চূড়ান্ত আড্ডা মারা, ফিরে যাওয়া স্মৃতির তরণী বেয়ে ছাত্র জীবনে। আমরা শেষেরটায় পরিপূর্ণ হয়েছি। কিছুটা হলেও বাড়তি অক্সিজেন সঞ্চয় হয়েছে। এটাও শ্রাবণের দান।

এবার বলি এবছর আষাঢ়-শ্রাবণকে সাক্ষী রেখে গেছিলাম দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানে শীতকাল চলছে। একটা কথা বলতেই হয়, আসলে আমাদের পৃথিবীতে সাকুল্যে দুটো ঋতু যা সূর্যের আছড়ে পড়া তাপে ভূপৃষ্ঠের এবং তার ফলে আবহাওয়ার তাপমাত্রায় হেরফের করে গরম আর শীত। এই গরম আর শীতের মধ্যে কোনও স্পষ্ট বিভেদরেখা নেই বরং গড়ানে। গরমের তাপ গড়াতে গড়াতে ঠান্ডার দিকে চলতে চলতে যে তাপমাত্রায় পরিবর্তন তার থেকেই আমরা শরত আর হেমন্ত করে নিয়েছি আর শীত থেকে গরমের মাঝের সময়ে বসন্ত। এই ভেদ কিন্তু খুব কম জায়গায়, বলা যায় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে তাও সর্বত্র নহে সে প্রস্ফুটিত। তবে এই বাংলায় তার রূপখানি অতি চমৎকার। এটি রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। আমরাও প্রজাপতির মত আনন্দে নাচি নাচি। তবে বর্ষা কিন্ত দুটো, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন। বাংলায় গ্রীষ্মের বর্ষা প্রকট আর দক্ষিণভারতে শীতের বৃষ্টি। অক্ষরেখা মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা অনেকটা আমাদের প্রকৃতির রীতি মেনে চলে। সেখানে এখন বৃষ্টি নেই। তাবলে কি বৃষ্টির স্বাদ নেব না? চলে গেলাম জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত এলাকায়। বিশাল জলরাশি একশো মিটার মত পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিচে আর তার প্রতিঘাতে বাতাসে ভেসে উঠছে জলকণা। সেই জলকণা কিছুটা উপরে উঠে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসছে মাথায়। আকাশে নেই একফোঁটা মেঘ আর এদিকে ভিজে একসা। এও এক প্রকৃতির ম্যাজিক ম্যাজিক খেলা।

তবু, আকাশের দিকে চেয়ে বলতে ইচ্ছে হয়, শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে।




প্রবন্ধ - ইন্দ্রনীল মজুমদার









আগেকার দিনে বিধবাদের দুঃখ ও কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা খুব দুঃসাধ্যের কাজ। সমাজের কড়া নিয়মের জাঁতাকলে পিষে যেত বিধবাদের জীবন ও ইচ্ছে। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে, খুব কমবয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। আর বিয়ে হত কোনো বয়স্ক মানুষের সাথে যাঁর মৃত্যু হলে বিধবা মেয়েটির জীবনে নেমে আসত এক ঘোর অন্ধকার। এই বিধবাদের কষ্ট দূর করতে সমাজ সংস্কারক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় লর্ড ক্যানিংয়ের আমলে ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন (The Hindu Widows' Remarriage Act, 1856) আইনটি প্রণয়ন করা হয়। উক্ত আইনের অধীনেই ঐ বছরের ৭ই ডিসেম্বর উত্তর কলকাতায় প্রথম বৈধ বিধবা বিবাহ সম্পন্ন হয়। আচ্ছা, এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, প্রথম বিধবা বিবাহ কে করেছিলেন? যিনি করেছিলেন তাঁকে হয়তো আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছি। আজ এই লেখার মধ্যে তাঁকে আমরা আমাদের বিস্মৃতির অতল সাগর থেকে তুলে এনে স্মরণ করব। তিনি হলেন শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন।

শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন বাঙালি সমাজ সংস্কারক। তিনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগী। তিনি ছিলেন অবিভক্ত চব্বিশ পরগনা জেলার প্রাচীন কুশদহ পরগনার গোবরডাঙ্গা খাঁটুরার বাসিন্দা। তাঁর পিতা ছিলেন খ্যাতনামা কথক রামধন তর্কবাগীশ এবং দাদা গণেশচন্দ্র। শ্রীশচন্দ্র কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করে 'বিদ্যারত্ন' উপাধি পেয়েছিলেন এবং সংস্কৃত কলেজে প্রথমে অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারির পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং পরে সাহিত্যশাস্ত্রের অধ্যাপনাও করেছিলেন।

আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগে ১৮৫৬ সালে যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ আইন সরকারি অনুমোদন লাভ করে তখন কেউ বিধবা বিবাহ করতে তেমন এগিয়ে আসেনি। কিন্তু, প্রচলিত সমস্ত সামাজিক প্রথা ও সংস্কার অগ্রাহ্য করে সর্বপ্রথম বিধবা বিবাহ করতে এগিয়ে আসেন তৎকালীন মুর্শিদাবাদের জজ পণ্ডিত শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। ৭ই ডিসেম্বর ১৮৫৬ সালে উত্তর কলকাতায় অবস্থিত রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে বিদ্যাসাগর মহাশয় তো বটেই এমনকি রমাপ্রসাদ রায়, নীলকমল মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, প্যারীচাঁদ মিত্র, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ সে যুগের উল্লেখযোগ্য বিশিষ্ট পণ্ডিতবর্গ তথা বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে শ্রীশচন্দ্র বিবাহ করেছিলেন বর্ধমানের পলাশডাঙার প্রয়াত ব্রক্ষানন্দ মুখ্যোপাধ্যায়ের দশ বছরের বাল‍্য‍-বিধবা মেয়ে কালীমতী দেবীকে। কালীমতী দেবীর প্রথম বিবাহ হয়েছিল মাত্র চার বছর বয়সে। আর তিনি বিধবা হন ছয় বছর বয়সে। সকলের উপস্থিতিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কনের মা লক্ষ্মীদেবীকে দিয়ে কন্যা সম্প্রদান করিয়েছিলেন।

প্রায় আটশো জনকে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রথম বিধবা বিবাহ বাড়িতে নিমন্ত্রিতদের বেশ ভালোই ভিড় ছিল। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ সেদিন এই বিবাহ পণ্ড করার চেষ্টা করলেও, রাস্তায় ব্রিটিশ পুলিশ প্রহরা থাকায় তারা কোনোরকম বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। রাস্তায় এই ব্রিটিশ পুলিশের পাহারার মাঝে রাতের দ্বিতীয় প্রহর পালকি চেপে বিয়ে করতে এসেছিলেন শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন।

বিধবা বিবাহ আইন পাশের পর এই প্রথম বিধবা বিবাহের অধিকাংশ ব্যয়ভার বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বয়ং বহন করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে এই বিধবা বিবাহ নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল বিদ্যাসাগর মহাশয়কে।

বঙ্গের তথা দেশের এই প্রথম ‘বিধবা বিবাহ’ করে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় প্রবর্তিত ‘বিধবা বিবাহ আইন’-কে সামাজিক ক্ষেত্রে প্রচলন করেন। তবে, বিধবা বিবাহ করার পর শ্রীশচন্দ্রকে অনেক সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। প্রথম বিধবা বিবাহ করার ফলে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন তিনি। গোবরডাঙার বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ পবিত্র মুখ্যোপাধ্যায়ের মতে, “সমাজ সংস্কারক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নকে শুধুমাত্র বিধবা বিবাহ করার জন্য গোবরডাঙায় তাঁর পৈত্রিক ভিটেতে আসতে নিরুতসাহিত করেন তৎকালীন ব্রাক্ষণ সমাজের মাথারা।”

এদেশের তৎকালীন গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজ না দিলেও বিধবা বিবাহের মতো কাজ করার জন্য ইংরেজ সরকার এই সমাজ সংস্কারককে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছিল। শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন একসময় বঁনগার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদেও উন্নিত হয়েছিলেন। ১৮৭০ সালে গোবরডাঙা পৌরসভা স্থাপিত হলে তিনিই প্রথম পৌরপিতা হন। স্ত্রী কালীমতী দেবীর মৃত্যুর পর সমাজ ব্যবস্থার চাপে প্রায়শ্চিত্ব করে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নকে গোবরডাঙায় তাঁর পৈত্রিক ভিটেতে আসতে হয়। প্রথম পৌরপিতা হিসেবে তিনি গোবরডাঙার বিপুল উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন। গোবরডাঙা পৌরসভা স্থাপন তো বটেই এমনকি তিনি রেললাইন স্থাপন করেছিলেন। তাঁর পৌর এলাকার রাস্তাঘাট সংস্কার করে পাল্টে দিয়েছিলেন গোবরডাঙ্গা শহরকে। জানা যায় যে, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রতিষ্ঠিত খাঁটুরার বাওড়-তীরের ঘাট ও ১৮৬৮ সালে তাঁর মায়ের নামে গোবরডাঙার কঙ্কনা বাওড়ের ধারে পোড়ামাটির ভাস্কর্যের দুটি শিবমন্দির এখনো বিদ্যমান রয়েছে।

দুঃখের বিষয় এই যে, আজ শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের মতো একজন সমাজ সংস্কারক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সেরকম দেখা যায়নি। তাঁর বসত ভিটে আজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে, শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন যেহেতু প্রথম নির্বাচিত পৌরপ্রধান তাই সেই স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পৌরসভার পক্ষ থেকে খাঁটুরায় তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন সরনী’। তবে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে গোবরডাঙ্গা পৌরসভায় ‘শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ভবন’ নামটি সংরক্ষিত রয়েছে। গোবরডাঙা তথা বাংলার সমাজসংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এক উজ্জ্বল নাম। অথচ আজ তিনি অনেকটাই বিস্মৃতপ্রায়। তাঁর স্মৃতিকে সংরক্ষণ এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উদ্যোগের অভাব লক্ষ করা যায়। তবু সময়ের ধুলো তাঁর কীর্তিকে মুছে দিতে পারেনি; গোবরডাঙা তথা বাংলার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে এই মহান সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও জনহিতৈষী মানুষটিকে।

এই ছিল এই বঙ্গের তথা ভারতের মাটিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম বিধবা বিবাহের মাধ্যমে ঘটা এক বাঙালির সাহস, দৃঢ়তা ও সমাজ-সংস্কারের প্রতি অঙ্গীকারের ইতিহাস। ৭ই ডিসেম্বর, ১৮৫৬ তারিখটি এদেশে প্রথম বিধবা বিবাহ উপলক্ষ্যে এক উল্লেখযোগ্য ইতিহাস রচনা করেছে যা বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসের পাতায় স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে।



তথ্যসূত্রঃ-
সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান
বাংলা উইকিপিডিয়া





প্রবন্ধ - মনোজিৎকুমার দাস








পার্ল এস বাক মানবতাবাদী ঔপন্যাসিক।পার্ল এস বাক। পুরো নাম— পার্ল সিডনেসস্টিকার বাক।
পার্ল (সিডনেসস্টিকার) বাক ১৮৯২ সালের আজকের দিনে (২৬ জুন) ভার্জিনিয়ার হিলসবরোতে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর মিশনারী পিতা-মাতা দু'জনই বিয়ের পর চীনে স্থায়ী হন। ফলে তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে চীনে। নিজের ভাষা শোখার আগেই তিনি শিখেছিলেন চীনা ভাষা। তাই তাঁর লেখায় চীন জীবন্ত ও জ্বলন্ত।

১৯১৪ সালে তিনি জন লসিং বাক নামক একজন মিশনারীকে বিয়ে করেন। নিজেও মিশনারী হয়ে চীনের সজোতে বসবাস শুরু করেন। পরে তিনি মিশনারীর কাজ ছেড়ে দেন। সেখানকার পটভূমিতে লেখেন ‘গুড আর্থ’।

১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত বাক দম্পতি চীনের নানকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়াতে শুরু করেন। সেখানে একটি বাড়িও তৈরি করেন। মায়ের মৃত্যুর পর পার্ল এস বাক আমেরিকায় ফিরে যান। এবং সেখানে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষায় এমএ করেন।

নানজিং প্রদেশে থাকাকালে চীনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানা আন্দোলনে ঝুঁকির মধ্যে পড়েন পার্ল এস বাক দম্পতি। চিয়াং কাইশেকের দল, কমুনিস্ট পার্টি এবং কিছু যুদ্ধবাদী মানুষের সংঘর্ষে তাঁদের থাকা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে চীনে বিদেশি কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে পার্ল বিপন্নবোধ করেন। তাঁরা পালিয়ে জাপানে চলে যান। এরই মধ্যে পার্ল বাকের প্রথম বিয়ে ভেঙে যায়। এরপর তিনি প্রকাশক রিচার্ড ওয়ালশকে বিয়ে করেন।

পার্ল এস বাক লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে লিখেছেন, আন্দোলন করেছেন সমানতালে। নারী অধিকার, শিশু অধিকার, দারিদ্র দুরীকরণ, পরিচয়হীন সন্তানদের নানা বিষয়ে।

এতিম শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৪৯ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক সন্তান পালক সংস্থা বা আন্তর্জাতিক এ্যাডোপশন কমিটির প্রতিষ্ঠাতা হন পার্ল এস বাক। একইভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ওয়েলকাম হাউজ— যেখানে পাঁচ হাজার নিঃস্ব, অভিভাবকহীন সন্তান স্থান পায়।

এশিয়ান দেশগুলোর অভাব ও সন্তান প্রতিপালনে বাধা দূরীকরণে প্রতিষ্ঠা করেন— এ্যাডড্রেস পর্ভাটি এ্যান্ড ডিসক্রিমিনেশন ফেসড বাই চিলড্রেন ইন এশিয়ান কমুনিটি। বিশেষ করে যেখানে আমেরিকান সৈন্য গিয়ে অবাঞ্ছিত সন্তান জন্ম দিয়েছেন সেখানেই তাদের অধিকার আদায়ে চেষ্টা করেছেন পার্ল এস বাক।

দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনে এসব শিশুর জন্য এতিমখানা স্থাপন করেন। শিশুদের প্রতি অবিচারের প্রতিবাদ ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তিনি আমেরিকায় বর্ণবাদ প্রথা নিয়েও সোচ্চার ছিলেন।

তাঁর বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে— 'দ্য গুড আর্থ', 'দ্য সান', 'দ্য মাদার', 'কাম মাই বিলাভেড', 'সাটান নেভার স্লিপস', 'গডসমেন', 'লেটার ফ্রম পিকিং', 'দ্য চিলড্রেন হু নেভার গ্রো', 'মাই সেভারেল ওয়ার্লড', 'এ ব্রিজ ফর পাসিং', 'দ্য এক্সআইল' ও 'ফাইটিং এ্যাঞ্জেল'।

পার্ল এস বাক লিখেছেন ৪০টি উপন্যাস, ২১টি গল্প, ১২টি ননফিকশন, রান্নার বই ও ৪টি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ।

সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৩৮ সালে নোবেল পুরস্কার ছাড়াও ১৯৩২ সালে পুলিৎজার, ১৯৩৫ সালে উইলিয়াম ডিন হাওয়েলস মেডেল পান। তিনি শুধু লেখকই ছিলেন না, ছিলেন সম্পাদক, লেখক, প্রতিষ্ঠাতা এবং রাজনৈতিক সক্রিয় কর্মী। তিনি ১৯৭৩ সালের ৬ মার্চ পরলোক গমন করেন।
পার্ল এস বাক তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।

ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়





















পর্ব ২৭



সে এক সময় ছিল যখন দার্শনিকের দল পরমাত্মার অস্তিত্ব নিয়ে তর্কবিতর্কে

মেতে উঠতেন। তবে আজকাল তর্ক হচ্ছে গম উৎপাদন নিয়ে। দার্শনিকদের এক দল

বলছেন—দেশে যথেষ্ট গম উৎপন্ন হচ্ছে, শুধু শয়তান দোকানদারদের মজুত করে

গুদামে লুকিয়ে রাখার অভ্যাসের ফলে সমস্যা হচ্ছে।

দ্বিতীয় দলের অভিমত হল—গম বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে কি? থাকলেও এদেশে

তো নেই। এই অন্তহীন তর্কবিতর্কের ঢেউ একসময় শিবপালগঞ্জে পৌঁছে গেল।

লোকজন শুধু গম নয়, দুধ -দই- ঘি নিয়েও ওইরকম নাস্তিকতা দেখাতে লাগল।

এইরকম খাদ্যসংকটে কুস্তির আখড়া কি হাওয়া খেয়ে বা খাইয়ে বেঁচে থাকবে? ক’বছর

আগে ছেলেছোকরার দল ব্যায়াম আর কুস্তির দাঁও প্যাঁচের অভ্যাস করে ক্লান্তিতে চুর

চুর হয়ে বাড়ি এলে অন্ততঃ ভিজিয়ে রাখা ছোলা এবং ঘোল খেতে পেত। এখন সেটাও

গেছে। এটা এবং আরও কিছু জিনিস মিলে এমন এক পরিবেশ তৈরি হল যে গ্রামের

নওজোয়ানদের নিষ্কর্মা ও কুঁড়ে হওয়া ছাড়া কোন কাজ রইল না। ওরা ছেঁড়াখোঁড়া

পোষাকের উপর রঙিন পাতলুন-পায়জামা পরে রোগা পাতলা পা ঢাকল এবং বুকে মাংস

লাগুক -না- লাগুক, বুকের মধ্যে সায়রা বানুর সংগে শোয়ার স্বপ্ন ভরে অলিগলিতে

পানের পিক পিচ করে ফেলে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

ওদের মধ্যে বেশ ক’জন কখনও কখনও খেতখামার-কলকারখানা এবং জেলখানা ঘুরে

ফেরত এসে যেত। যারা ওদিকপানে যাবার সাহস জোটাতে পারে নি, তারা স্থানীয় কলেজে

মুখ্যু হওয়ার পাঠ নিতে ভর্তি হত। এই ধরণের কলেজ হামেশা কোন স্থানীয় জননায়কের

প্রেরণায় সাধারণ লোকের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের নাম নিয়ে খোলা হত। এর আসল

উদ্দেশ্য ওই জননায়ক ভদ্রলোকের জন্যে আগামী বিধানসভা অথবা লোকসভা

নির্বাচন জেতার জমি তৈরি করা এবং আসল কাজ বলতে কয়েকজন মাস্টার ও সরকারি

অনুদানের শোষণ করা। এইসব কলেজ সাময়িক ফ্যাশনের হিসেবে বিনা আগুপাছু ভেবে

চালিয়ে যাওয়া হয়। আর এটাও পাক্কা যে ওখানকার ছাত্রের দল নিজেদের জন্মসূত্রে

প্রাপ্ত আর্থিক ও সামাজিক অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকবে এবং কখনোই সেই জায়গা

ছাড়িয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করবে না। সরকারি উচ্চপদ এবং ব্যবসাপাতি যাঁদের হাতে,

তাঁদের মনোপলিতে ওই কলেজগুলোর থেকে কোন বাধা আসবে না।

সে যাই হোক, এইসব শোরগোলে আখড়া সংস্কৃতি খতম হওয়ার উপক্রম, আর গ্রামের

নবযুবকদের শারীরিক বিকাশ এখন ওদের মানসিক বিকাশের সংগে পাল্লা দিচ্ছে।

সেভাবে দেখলে শিবপালগঞ্জে একটা আখড়া থাকা এবং তাতে কিছু ছেলেছোকরার

নিয়মিত যাতায়াত এক মহত্বপূর্ণ তথ্য বটে।




বলার দরকার নেই যে এসব হচ্ছে বদ্রী পালোয়ানের সৌজন্যে। বেশ কয় বছর ধরে ও

নিয়মিত আখড়ায় গিয়ে ব্যায়াম করে, চ্যালাদের মধ্য কুস্তি প্রতিযোগিতা করায়। যখন

ওরা কাউকে তুলে আছাড় দেয়, বা শরীরের কোন অঙ্গে চোট লাগিয়ে দেয়, তখন সবাই

মেনে নেয় যে চ্যালাটি এখন পুরো পালোয়ান হয়ে গেছে।

আর বেশ ক’দিন কসরত করে এবং কুস্তি লড়ে কোন চ্যালা যদি উঃ আঃ করতে করতে

ঘরে ফেরে তো বুঝতে হবে ও আখড়ার কনভোকেশন থেকে ডিগ্রি নিয়ে বাড়ি এসেছে।

আজ আখড়া থেকে দুই পালোয়ান টলতে টলতে বেরোল। একজন বদ্রী, অন্যটি ছোটে।

দুজনেরই ন্যাড়া মাথা। তার উপর ঘাম আর মাটি মিশে যেন পলেস্তারা পড়েছে। ঘাড়ের

পেছনে গণ্ডারের মত বেশ ক’টা চামড়ার ভাঁজ। দুজনেই ল্যাঙগোটের এক প্রান্ত হাতির

শুঁড়ের মতন সামনে ঝুলিয়ে চলছে। ল্যাঙোটের সরু পট্টির পাশ থেকে অণ্ডকোষের

সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের নজরে স্পষ্ট হচ্ছে। তবে যেমন শিল্পের

দোহাই দিয়ে হেনরি মিলার ও ডি এইচ লরেন্সকে অশ্লীলতার অভিযোগ থেকে ছাড়

দেওয়া হয়, তেমনই ভারতীয় ব্যায়ামের দোহাই দিয়ে ওই দুই পালোয়ানকেও ওসব

দেখানোর ছাড় দেওয়া হয়।

ছোটে পালোয়ানের সমাবর্তনের ডিগ্রি বেশ কয়েক বছর আগে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু

আজ বোধহয় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি পেয়েছে। তাই একটু পরে পরেই খুব ধীমে স্বরে

উঃ আঃ করছে। কিন্তু গুরুর সামনে আত্মসম্মান রক্ষা করতে আওয়াজ মুখ থেকে ‘হায়’

না হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসের সংগে মিশে ‘হাব্‌’ গোছের রূপ নিয়ে বেরোচ্ছে। বদ্রী চলছে

চুপচাপ, যেন ছোটের কষ্টের সংগে ওর কোন সম্পর্ক নেই।

আজ বদ্রী পালোয়ান ছোটে ব্যাটাকে ধোবী পাছাড় লাগিয়ে চিত করেছে।

এই প্যাঁচের প্রয়োগ করতে বদ্রী পালোয়ানকে এক অনেক উচ্চস্তরের কবির মত কাজ

করতে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “বিজয়িনী” কবিতায় এক নারীর কোন সরোবরের

স্নান করার সময় কামদেব আদি কিছু পাত্রের বিষয়ে অভূতপূর্ব কল্পনা করেছিলেন।

ধোবী পাছাড় প্যাঁচ কষার জন্যে বদ্রীকে তার চেয়ে বেশি অদ্ভূত কল্পনা করতে হয়েছে।

যেমন এটা আখড়া নয়, এক চমৎকার সরোবর--- “সমীরণ প্রলাপ বকিতেছিল

প্রচ্ছায়সঘন পল্লব-শয়নতলে---“।

ওই পরিবেশে ও নিজেকে এক ধোপা হিসেবে কল্পনা করল, আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোন

নারীর পেটিকোট। ফের ও সেই ব্যাটার হাত টেনে নিজের পিঠের দিক থেকে কাঁধের উপর

উঁচুতে তুলে আখড়ার মাটিতে আছড়ে ফেলল। আছড়ে ফেলার সময় খেয়াল রাখতে হয় যাতে

মাটিতে পড়ার সময় পেটিকোটের সামনের ভাগ উপরের দিকে থাকে। অর্থাৎ

প্রতিদ্বন্দ্বীকে এমন ভাবে পটকাতে হবে যাতে সে মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে।




তারপর?

“বিজয়! বিজয়! মহান বিজয়! শত্রু জানু পাতি বসি , নির্বাক বিস্ময়ভরে নতশিরে---“।

বদ্রী পালোয়ান আজ ছোটেকে আছাড় মারার সময় একটু বেশি কল্পনা করে ফেলল। ওর

কল্পনায় এটা আখড়া নয় পুকুর। আর এটা আখড়ার মাটির আল নয়, পুকুরের ঘাটের

সিঁড়ির পাথর। ফলে ছোটে পালোয়ানের যখন আখড়ায় চিৎ হয়ে আখড়ার উপর বিছিয়ে

থাকা ‘প্রচ্ছায় সঘনপল্লব” দেখার কথা, ও দেখল চোখ থেকে আগুনের ফুলকি

বেরোচ্ছে, কোমরের নিচের অংশ আখড়ার জমির বাইরে , উপরের অংশ আখড়ার ভেতর।

আর ও নেহাত বেহায়া, নইলে কোমর ভেঙে যাওয়ার কথা।

কপালগুণে বদ্রী হল ছোটে পালোয়ানের ওস্তাদ, নইলে এতক্ষণে ওর চোখ থেকে জল

আর মুখ থেকে হাজার গালির ফোয়ারা ছুটত। কিন্তু ওস্তাদের প্রতি সম্ভ্রম দেখিয়ে ও

চুপচাপ হাঁটছে, বেশি কষ্ট হলে মুখ থেকে একটা ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ বের করছে।

কিন্তু ওর বিপদ এখানেই শেষ হল না। চলতে চলতে বদ্রী পালোয়ান জিজ্ঞেস করল, “কী

হে, সেদিন জোগনাথের হয়ে সাক্ষী দিতে গিয়ে তুমি কীসব বলে এসেছ”?

“কোন শালা জোগনাথের সাক্ষী? আমি তো পুলিসের সাক্ষী ছিলাম”। ছোটে কোমরের

ব্যথা চেপে গিয়ে বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে বলল।

বদ্রী বেশ শান্ত স্বরে বলল, “সোজা প্রশ্নের সোজা জবাব চাই। এর মধ্যে শালা-

ভগ্নীপতিকে নিয়ে টানাটানি কেন”?

“কে আবার ত্যাড়া চাল দিচ্ছে”? ছোটে বলল বটে, কিন্তু গলার জোর যেন কমে গেল।

বদ্রী পালোয়ান এসব নিরর্থক কথাবার্তা এড়িয়ে সোজা প্রশ্ন করল, “তুমি সেদিন

সাক্ষী দেবার সময় বেলাকে নিয়ে কী বলেছ”?

“আমার কী বলার ছিল? তখন যা মুখে এল বলে দিলাম”।

বদ্রী পালোয়ান বড় নরম গলায় কথা বলছিল। এবার ছোটের হাথ ধরে বলল, “ওর

জোগনাথের সংগে কোন ইন্টুমিন্টু ছিল”?

ছোটে নিজের হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল। আঙুল ধরে বাহু ধরা যায়। আবার বাহু

ধরলে ধোবীপাট প্যাঁচ লাগিয়ে কাউকে চিত করা যায়—এটা ও একটু আগেই দেখেছে। কথা

পালটানোর জন্যে বলল, “আমি কি জানি কার সংগে কার ইন্টুমিন্টু চলছে? গাঁয়ের

চারপাশে অড়হরের খেত। তার আড়ালে কে কার সংগে লাগাচ্ছে, আমি কোথায় কোথায়

উঁকি দেব”?




বদ্রী আগের মতই নরম আওয়াজে বলল, “কিন্তু তুমি নাকি বলেছ যে নিজের চোখে

বেলাকে জোগনাথের সংগে সটরপটর অবস্থায় দেখেছ”?

“বললে কী হয়”?

বদ্রী পালোয়ান হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কড়া আওয়াজে বলল, “কেন হয় না? তুমি বলেছ কি

বলনি”?

এবার ছোটে পালোয়ানের একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ওর গলার স্বরে বেপরোয়া ভাব

গায়েব। শাশ্বত কালজয়ী সাহিত্যের লেখকও যেমন রেডিওর প্রশ্নকর্তার সামনে

হড়বড়িয়ে যায়, তো তো করে, তেমনই ছোটে বদ্রী পালোয়ানের সামনে হড়বড়িয়ে গেল।

মাফ চেয়ে বলল, “ গুরু, বলেছিলাম তো! বলতে গিয়ে অনেক কিছু বলেছিলাম। আদালতে

সাক্ষী দেওয়া বলে কথা! যা মুখে এল, বলতে থাকলাম। কে ওখানে সত্যি বলে”!

বদ্রী পালোয়ান অন্ধকারে খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। যে কাজটা কোন পালোয়ান

সহজে করতে পারে না, বদ্রী সেটাই করতে লাগল। অর্থাৎ কিছু একটা ভাব ছিল।

ছোটে এতে আরও ঘাবড়ে গেল। একটু তুতলে তুতলে বলল, “গুরু, কী নিয়ে এত চিন্তা-

ভাবনা? ভাবনাচিন্তা ছোটলোকের কাজ। আমাকে বল, হয়েছেটা কী”?

বদ্রী ধীরে ধীরে বলল, “ভাবছি, তোকে লাথি মেরে মেরে শায়েস্তা করি? নাকি জুতোপেটা

করি? শালা, তোর মুখে কুকুরের ছানা পেচ্ছাপ করে! থু ! থু !”

এই বলে ও বেশ ঘেন্নার সঙ্গে মাটিতে একদলা থুতু ফেলল।

ছোটে হক্কাবক্কা! থেমে থেমে অনুনয় করতে লাগল, “এমন কথা বল না গুরু! বলে দাও

কোথায় কী ভুল করেছি”।

“তুমি শালা বললেও বুঝতে পারবে কি? এক ভাল ঘরের মেয়ের সম্মান গোটা দুনিয়ার

সামনে ধূলোয় ছুঁড়ে ফেললে। তোমার চোখে এটা কিছুই নয়”?

ব্যস্‌ এইটুকু ব্যাপার! এবার ছোটে পালোয়ান শান্তিতে দম নিল। ফের বেপরোয়া ভাব

দেখিয়ে বলল, “গুরু, আমি যাই বলে থাকি, সেসব তো ভরা আদালতে ঈশ্বরের দিব্যি গেলে

বলেছি। সবাই জানে যে আদালতে যা বলা হয় তার কোন মাথামুণ্ডু নেই। এতে কার কী

ক্ষতি হোল”?

বদ্রীকে চুপ করতে দেখে ছোটের হিম্মত আরও বেড়ে গেল। অর্থাৎ নিজস্ব ঢঙে বাকি

দুনিয়াকে পোকামাকড় ভেবে ও নিজের কথাটা শেষ করল, “এই জন্যে আমাকে জুতো পেটা

করবে, গুরু? বাহ্‌ গুরু, তুমিও কখনও কখনও এমন সব কায়দা করে কথা বল যে আমিও

অবাক হয়ে ভাবতে থাকি—হয়েছেটা কী”?




বদ্রী পালোয়ান দুই হাতে নিজের গর্দান মালিশ করে তার উপর দু-চারটে তামাচা

লাগালো। এভাবে ও নিজের ঘাড়ে জমে প্লাস্টার হওয়া আখড়ার ধূলোমাটি ঝেড়ে ফেলল

এবং এতক্ষণ ধরে যা যা ভাবছিল সব এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলল। তারপর আচমকা হেসে

উঠে বলল, “তুই শালা খানদানী খচ্চর। ডাইনে বাঁয়ে দেখে চলতে হয় না? বেলা মেয়েটি

এখন তোর আম্মা হতে যাচ্ছে। তাকে তুই ছেনাল বল বা অন্য কোন নোংরা শব্দ—গালি

তোরই গায়ে লাগবে”।

“এটা কী বললে গুরু”?

“বলার কী আছে? একমাসের ভেতর বেলার বিয়ে হবে। বদ্রী পালোয়ানের সংগে। আর তুই

সানাইয়ে পোঁ ধরবি। মাথায় কিছু ঢুকল”?

সার্কাসের জোকার ফালতু প্রলাপ বকে, বাঁদর-নাচ নাচে। রাস্তায় তামাশা করা ঢোল

বাজাতে বাজাতে হাতের কাঠের টুকরো বগলের তলা দিয়ে কায়দা করে ঘুরিয়ে তাল-ফেরতা

বাজায়। আখড়ায় দু’তিন পালোয়ান খামোখা হাতের উপর ভর করে পা শূন্যে তুলে বিচ্ছুর

মত চলে। গোধূলি বেলায় ঘরে ফেরার সময় বাছুর মাথা ঝুঁকিয়ে খানিক এলোমেলো দৌড়তে

থাকে। তারপর লাফালাফির আনন্দে ওপাশের ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। শনিচর ব্যাটা

অকারণে হঠাৎ চেঁচায়—উর্‌ র্‌ র্‌!

বদ্রী পালোয়ানের কথা শুনে ছোটে পালোয়ানের মনে হল ওইরকম কিছু অর্থহীন

প্রলাপের বোঝা ওর সামনে ফেলে রাখা হয়েছে। আর কেউ ওকে ওই জঞ্জালের গাদায়

চিত করে পটকে দিয়েছে। ওর মুখ থেকে খালি একটা কথা শোনা গেল, “এসব কী বলছ

গুরু”?

“যা বললাম কানে ঢোকে নি”? বদ্রী হালকা ভাবে ঠাট্টা করার ছন্দে বলতে লাগল, “কী

ব্যাপার? কানে খুব ময়লা জমেছে? আবার শোন, আমি বেলাকে বিয়ে করছি। ওকে কথা

দিয়েছি। সেদিন তুমি যখন এজলাসে দাঁড়িয়ে ওর বদনাম করছিলে আমার এক এক রোঁয়া

আগুনে জ্বলছিল। মন চাইছিল --এক চাঁটিতে তোমার মাথা পেটে ঢুকিয়ে দি। কিন্তু তুমি

আমার চ্যালা। তাই পালক-বালক ভেবে মাফ করে দিলাম”।

একটা দীর্ঘশ্বাস! তারপর বদ্রী নিজের কথা শেষ করল এই বলে—“ যাক, যা হবার হয়ে

গেছে। এবার থেকে জিভে লাগাম দাও”।

ছোটের এখনও মনে হচ্ছে যে ও ফালতু কথার জঞ্জালের উপর চিত হয়ে শুয়ে আছে। আর

বদ্রী পালোয়ান যা বলছে সেসব কোন স্বপ্নলোকের কথা। ও বলল, “গুরু, তুমি হলে

বামুন। মেয়েটা বেনে। একটু ভেবে কথা বল। বৈদ্যজী মহারাজ যদি খেরে গিয়ে জিদ ধরেন

তাহলে তোমার পুরো ইস্কিম ভস্কে যাবে”।

বদ্রী বলল—“ হাথী চলে বাজার মেঁ, কুত্তা ভোঁকে হাজার মেঁ”।




ছোটে প্রায় হাতে পায়ে ধরতে লাগল, “গুরু, তুমি দেখছি প্রবাদ আউড়ে যাচ্ছ। এতে

বৈদ্যজী গলে যাবেন”?

মনে হচ্ছে মনের গোপন কথা বলে ফেলে বদ্রী একটু হালকা হয়েছে। ও জবাব না দিয়ে

সিটি বাজাতে লাগল।

আরও খানিকক্ষণ হাঁটার পর পুরো ব্যাপারটা আর তার গুরুত্ব ছোটে পালোয়ানের মগজে

ঢুকল। বেলার সম্বন্ধে উড়ো খবর ছিল যে রূপ্পন বাবু ওকে একটা চিঠি লিখেছেন।

এইভাবে উড়তে উড়তে ওর কানে এটাও পৌঁছেছিল যে কোন ছুঁড়ি রাত্তিরে বৈদ্যজীর ছাতে

এসেছিল। তবে রঙ্গনাথের সংগে ধাক্কা লাগায় পালিয়ে গেছল।

যে বাড়িগুলোর ছাত থেকে অনায়াসে বৈদ্যজীর ছাতে আসা যায় তার মধ্যে গয়াদীনের বাড়ি

একটি। রূপ্পনবাবু একদিন বলেছিলেন যে কোন মেয়ের লেখা চিঠি রঙ্গনাথের হাতে

এসেছে। কিন্তু রঙ্গনাথ সে নিয়ে খুলে বলছে না। ছোটে পালোয়ানের সন্দেহ হচ্ছিল যে

রূপ্পন বাবু কিছুদিন ধরে বেলার পেছনে লেগে আছেন আর প্রায় পটিয়ে ফেলেছেন। এই

পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ একী! বেলার সাথে বদ্রী পালোয়ানের সম্বন্ধ আর মামলা

অনেকদূর গড়িয়েছে! ছোটে হড়বড়িয়ে গেল।

জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু গুরু, শুনেছি রূপ্পনবাবু বেলাকে নিয়ে কিছু চিঠিচাপাটি

করেছিলেন”?

--“হ্যাঁ করেছিল। ছেলেমানুষ। বোকামি করেছে”।

-“শুনেছি, ওদিক থেকেও পালটা চিঠি এসেছিল”।

বদ্রী পালোয়ান কড়া সুরে বললে, “কে বলেছে”?

--“কেউ না, গুরু”।

-“তাহলে তুমি শুনলে কী করে”?

--“মন পড়ছে না গুরু। তবে কেউ না কেউ অমন হাওয়ায় উড়তে থাকা কথার পিঠে বলে

থাকবে”।

বদ্রী পালোয়ান চুপ। যখন কেউ কথাবার্তার সময় আদালতে ঈশ্বরের নামে দিব্যি গেলে

সাক্ষী দেয়ার পেশাদারি কায়দার নকল করে তখন আর কোন প্রশ্ন করা অর্থহীন হয়ে

যায়। বদ্রী খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর খুলে বলল, “হ্যাঁ, চিঠি এসেছিল। তবে

আমার জন্যে। কিন্তু ওটা ঠিক চিঠি ছিল না। আজকালকার মেয়েদের ন্যাকামি—ফিল্মি

গানটানের কথায় ভর্তি”।




ছোটে এবার তোষামুদে স্বরে বলল, “ তো গুরু, ব্যপারটা কয়েক বছর ধরে চলছে, কী বল?

ছাতের উপরেই---“।

বদ্রী বলল, “ছোটে, এতবড় খবরটা সবার আগে শুধু তোমাকেই বললাম। যতটা শুনলে তাই

অনেক। বেশি খোঁচাখুঁচি করার দরকার নেই। আর দেখ, কাউকে বোল না যেন”।

ছোটে পালোয়ান অন্ধকারে কারও বারান্দার বাড়িয়ে রাখা একটা কোণায় হোঁচট খেল।

এগুলো গ্রামের লোক কোন জমির টুকরো হাতিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে বানায়। মুখে এল কাঁচা

খিস্তি। তারপর কোমরের ব্যাথার প্রতি সম্মান দেখিয়ে একবার ‘হাব্‌’ গোছের আওয়াজ

বের করে বদ্রীকে বলল, “কাউকে বলব না গুরু”।

--“কিছুদিন পরে সবাই জানতে পারবে। কিন্তু এখন খবরটা চেপে রাখ”।

-“বললাম তো গুরু! কাউকে বলব না”।

একটু পরে বদ্রী পালোয়ান হেসে উঠল। বলল, “বাহ, রে ছোটে! কেমন যুগলের জোড়

বানিয়েছ! বেলা চক্কর চালাবে জোগনাথের সংগে? শালা ফুটো পয়সার গুড়! বেলা যদি ওর

হাত ধরে তো তোতলাতে থাকবে। তুমি বেলাকে ওর সংগে জোড় বানিয়ে দিলে? তুমি শালা

খড়ুসের খড়ুস! মাথামোটার হদ্দ”!

ছোটে পালোয়ানের কোমর থেকে একটা ব্যথা ঝিলিক দিয়ে উঠল। মনে হোল ধোবীপাছাড়

দিয়ে কেউ ওকে ফের পটকে দিয়েছে।

একজায়গায় এসে ওরা আলাদা হয়ে নিজের নিজের ঘরের পথ ধরল। কিন্তু তার আগে

বদ্রী ফের ছোটেকে মনে করিয়ে দিল—ওর আর বেলার সম্পর্কের কথা যেন পাঁচকান না

হয়। ছোটে বড় নিষ্ঠার সংগে গোপনীয়তার শপথ নিল। কিন্তু এই শপথ ওইসব তথাকথিত

শপথের মতই—যা রাজভবনে নেওয়া হয়। ফলে পরের দিনই বদ্রী পালোয়ানের সংগে

যাদের মোলাকাত হল, তাদের মধ্যে অনেকেই বদ্রীকে বদলে যাওয়া চোখে দেখতে লাগল।

(চলবে)

ধারাবাহিক - শৌনক দত্ত





















২২. আবহমান বাঙালী জীবন তথা বাঙালিত্বের প্রতি





সুপ্রিয়বরেষু

বাসু

তোমার চিঠি যখন পেলাম ঠিক তার চার ঘন্টা পরেই আমার ফ্লাইট ছিল লন্ডন যাবার তাই চিঠিটা পড়া হয়নি, সঙ্গে নিয়ে গেলেও কাজের চাপে সেই চিঠি আবার বারদিন পরে আমার সাথে ফিরে এসেছে। বিস্তর সময় পরে গতকাল অফিস শেষে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তোমার চিঠি পড়েছি। তোমার চিঠি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে পড়ছিল পরিমল ভট্টাচার্যর‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ প্রসঙ্গ। 'সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা' কে শুধু একটি উপন্যাস বললে ভুল বলা হবে, পরিমল ভট্টাচার্যের লেখালেখির সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানে তাঁর গদ্যের একটি নিজস্ব ভূগোল আছে। তিনি নিছক কাহিনি বলেন না, তিনি ইতিহাসের গায়ে কান পেতে, হারিয়ে যাওয়া জনপদের ধ্বনি শোনেন, নদীর ভাঙন ও মানুষের স্মৃতিকে একই সঙ্গে হৃদয়ে ধারণ করেন। পরিমল ভট্টাচার্যর ‘ফিল্ড নোটস ফ্রম আ ওয়াটারবোর্ন ল্যান্ড’ তো পড়েছো তাঁর সেই নদী চেতনার দেখা এখানেও মেলে এবং তা গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তো জানি বাংলার ইতিহাস নদী ছাড়া অসম্পূর্ণ। সাতগাঁর পতনের পিছনেও নদীর ভূমিকা ছিল। লেখক নদীকে ইতিহাসের চরিত্রে পরিণত করেছেন। এই বইটি বড় ক্যানভাসে সময়, স্মৃতি, নদীসভ্যতা, উপনিবেশ, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, মিথ, পরিযান, ভাষা ও মানুষের অন্তর্গত বিষন্নতার এক বিশাল আর্কাইভ। ইতিহাস, মিথ এবং স্মৃতির এক জাদুময় আখ্যান। হুগলি ও সরস্বতী নদীর মধ্যবর্তী প্রাচীন বন্দর নগরী সাতগাঁর পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি ৭০০ বছরের পুরোনো এক বিপন্ন জনপদের ও বহুবর্ণ সংস্কৃতির মহাকাব্য। বইটা শেষ করেছি অনেকদিন হলো এখনো উপন্যাসের পটভূমি, চরিত্ররা ঘিরে আছে মনে হয় মাথার প্রতিটি কোষে মিশে গেছে চোখের তারায় ফুটে ওঠে ত্রিবেণীতে গঙ্গা, ভাগীরথী ও সরস্বতীতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় এই দুই শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলে পলি জমে জমে সৃষ্টি হয় মাছের আকৃতির এক ভূমি, যার নাম মৎস্যভূমি যা প্রাক ইসলামিক পাল ও সেন যুগ থেকে ষোড়শ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত ধারণ করে রেখেছে জমজমাট এক বাণিজ্যকেন্দ্র, সপ্তগ্রাম বন্দর। চলতি কথায় সাতগাঁ। সপ্তদশ শতকে সরস্বতী ক্রমশ: ক্ষীণকায়া হতে শুরু করলে সাতগাঁ বন্দর তার কৌলিন্য হারাতে শুরু করে। লেখক কোনো নির্দিষ্ট সন-তারিখ ধরে এগিয়ে যাননি। এখানে ইতিহাস নির্মিত হয়েছে স্মৃতি আর শ্রুতির পথ ধরে, যেখানে অতীত এবং বর্তমান ক্রমাগত একে অপরের পিঠে এসে ভর করে। উপন্যাসটির গভীরতম পরত লুকিয়ে আছে এর সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। বাপ্পাদিত্যকে এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বলা যায়। তার পিতা পূর্ববঙ্গের সন্তান। যাদের বলা হয় বাঙাল। সিলেটি। তারা এখনও সিদলের স্বাদ ভুলতে পারেননি। কিন্তু তার মা শিউলি কেবল ঘটী নয়, সাতগাঁর জয়রামবাটির অন্তত সাতশো বছরের নাড়ির যোগ তাদের। বাঙাল-ঘটী শব্দের পরিচয়সূচক ব্যবহার একশো বছরের অধিক নয়। আবার বাপ্পাদিত্যর মাতামহ বা শিউলির বাপের বাড়ির বংশলতিকার গোড়ায় দেখা যায় কোন সুদূর অতীতে উত্তর ভারতের কনৌজ থেকে এসে গঙ্গা-সরস্বতীর মধ্যকার মৎসভূমিতে বসবাস শুরু করেছিলেন তারা। মাঝে দরপ খান এই অঞ্চল জয় করলে এই বংশের রামাচার্য নতুন শাসককে বলেন --'আমরা পুরোহিত বংশ বটে, তবে মন্দিরে বিগ্রপূজাই আমাদের একমাত্র বৃত্তি নয় ---- আমরা শাস্ত্র পাঠ করি, শিক্ষাশ্রমে অধ্যাপনা করি। এর বাইরে কোনোরূপ জাগতিক বৃত্তি আমাদের বর্ণে নিষিদ্ধ। বারোটি নিষ্কর গ্রাম ও সংলগ্ন কৃষিজমি থেকে আমাদের অন্নসংস্থান হয়। শত শত বছর শাসকেরা এই ব্যবস্থাকে মান্যতা দিয়েছে। আপনি ব্যতিক্রম, আপনি সেই জমিতে কর চাপিয়েছেন। আমাদের সম্মিলিত আবেদন, আপনি সেই জমি আগের ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিন।' দরপ খান তাদের পূর্বব্যবস্থা কেবল বহাল রাখেননি, বরং এই অঞ্চলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাতগাঁর জমিনে পা পড়েছে পর্তুগীজদের, পা পড়েছে ইংরেজদের -- সংমিশ্রিত হয়েছে সাংস্কৃতিক রঙ। সেই নতুন রঙে তৈরি হয়েছে একটি জনপদের ক্যানভাস। কেন্দ্রীয় চরিত্র বাপ্পাদিত্য (যার বাবা দেশভাগের ছিন্নমূল প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং মা সাতগাঁর স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে) এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে রাষ্ট্র তার কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ বা সাবুদ চাইছে। এর প্রতিটি উপাখ্যান আসলে বাপ্পাদিত্যের সেই আইনি খাঁড়ার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সে প্রমাণ করতে চায়, সাতশো বছর ধরে এই মাটির জল-হাওয়ায় তার পূর্বপুরুষদের অস্তিত্ব মিশে আছে। সেই বাপ্পাদিত্যই আমাদের নিয়ে যায় ক্যানভাসের কেন্দ্রে। আমরা পিছিয়ে যেতে থাকি ক্রমশ। আশপাশটা পাল্টে পাল্টে যেতে থাকে। গলা জড়িয়ে ধরে মিথ, ফ্যান্টাসি, পুরাণ। আমরা সাতশো বছর পিছিয়ে যাই। একটি কনৌজি ব্রাহ্মণ পরিবারের নয়টি প্রজন্ম এবং উনপঞ্চাশটি চরিত্র আমাদের ঘিরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেখক আমাদের নিয়ে যান হুগলি আর সরস্বতী নদীর সংযোগস্থলে থাকা সেই অদ্ভুতুরে মায়াভূখণ্ডে, যার নাম সাতগাঁ। কত ঘটনাই সেখানে ঘটে! আমরা জানতে পারি আজকের বাপ্পাদিত্য ছেলেবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলগাড়ি চেপে এসেছে এই জাদুভূমিতে, যেখানে রেলের চাকায় বাজে কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি, হাওয়া দিলে গির্জার চালে বেড়ালের কান্নার মতো শব্দ হয়, যেখানে নারীরা নদীতে ডুব দিয়ে দূরবাসিনী আত্মীয়ার সঙ্গে জলে-জলে বার্তা বিনিময় করে, নৈয়ায়িকেরা কুয়োর পেতনির শাপে ব্যাঙ হয়ে যায়, প্যারিস থেকে তরুণ কবি এসে খুঁজে পায় তার ক্লেদজ কুসুম, সার্জেন-পাদরি নদীর খাত ঘুরিয়ে দেয়, দুর্দম তুর্কী যোদ্ধা এসে মায়াবী ভূমিতে বাঁধা পড়ে, সংস্কৃত শিখে গঙ্গাস্তোত্র লেখে, পুরুষেরা পুনর্জন্ম নিয়ে বংশে ফিরে আসে, এমনকি এক ফিরিঙ্গিও ফিরে আসে কাকাতুয়ারূপে... কী অসম্ভব নিপুণ এক নির্মিতি! এতটুকু বিচ্যুতি নেই বয়ানে। উপন্যাসের প্রথমেই দেখা যায় রাষ্ট্রের নতুন নাগরিকত্ব আইনের বেড়াজালে আটকে পড়েছে বাপ্পাদিত্য। বিচারকের কাছে তার জবানবন্দিই হল এই বৃহত্তর উপন্যাস। সাতশো বছরের প্রায় নয় প্রজন্ম ধরে চলে আসা কথকতা। ইতিবৃত্ত। অবিশ্বাস্য রকমভাবে অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে চলেছে বাপ্পাদিত্য। আইনের চোখে তা কতটা প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে সেটা বড় কথা নয়, পাঠকের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে বাধ্য করেছেন লেখক। পাঠক অনায়াসে বিশ্বাস করবেন -- শিউলির নদীর জলে ডুব দিয়ে জলমাধ্যমে দূরের প্রিয়জনের সাথে কথোপকথন কতটা বাস্তব। দরপ খাঁ, যিনি দুর্ধর্ষ তুর্কী শাসক এই জনপদের প্রেমে পড়ে এই গঙ্গার সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন গঙ্গাস্তোত্র। তা পাঠ করে হিন্দু ব্রাহ্মণগণ। কিংবা পর্তুগীজ নাবিকের কাকাতুয়া হিসেবে ফিরে আসা -- সবই বাস্তব হয়ে ওঠে পাঠকের চোখে। রয়েছে ইতিহাসের সত্যতা। কিন্তু রাষ্ট্রকে কিভাবে বিশ্বাস করাবে বাপ্পাদিত্য যে এই ভূমির সাথে তার কত প্রজন্মের সম্পর্ক? তার যে জন্ম সার্টিফিকেট নেই! রথীন যখন তাকে জানায় -- 'কিন্তু তুমি তো ইন্ডিয়ায় জন্মেছ বাবা! দ্যাটস আ ফ্যাক্ট'। বাপ্পাদিত্য বলে -- 'সেটা তুই জানিস, আমি জানি রাষ্ট্র তো আর জানে না। রাষ্ট্র প্রমাণ চায়'।

মিথ নির্মাণ বা ইতিহাস প্রাজ্ঞতা দেখানোর মোটিভ নয়, বরং দর্শককে দ্রষ্টব্যের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে অস্তিত্বের একেকটা চিহ্ন পুনরুদ্ধারই যেন তাঁর একমাত্র পরিকল্পনা। এ তো কেবল বাপ্পাদিত্যর ইতিহাস নয়, বরং গোটা একটি জাতির উৎসমুখে দাঁড়িয়ে লেখকের এই পরিবেশনা। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস যেমন নিমজ্জিত থাকে মার্কেজের তৈরি বুয়েন্দিয়া পরিবারে, ঠিক তেমনি স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারটির সাতশো বছরের প্রাককথনে ডুবে আছে বাংলার বহুস্তরীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাস। পড়তে পড়তে মনে হতে পারে উপন্যাসটির ম্যাজিক রিয়্যালিজ়ম লাতিন আমেরিকার অনুকরণ। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না ম্যাজিক রিয়্যালিজম লাতিন আমেরিকায় যুবক হলেও বাংলাসাহিত্যে তার শৈশবকাল বহু আগেই রচিত ঠাকুরমার ঝুলি রূপকথার গল্পে আর তাই বাংলার লোকবিশ্বাস, ভূতপ্রেত, নদীপুরাণ, স্বপ্ন, মঙ্গলকাব্য, গ্রামীণ কল্পনা ও স্মৃতির ভিতর থেকে উঠে এসেছে বহুবার। বাংলার গ্রামীণ জীবনে বাস্তব ও অলৌকিকের সীমানা কখনও খুব স্পষ্ট ছিল না। মৃতেরা ফিরে আসে, নদী কথা বলে, গাছের আত্মা থাকে, বাতাসে পূর্বপুরুষের ফিসফিসানি শোনা যায়। ‘হাওয়াতাঁতি’ শব্দটিই এই অলৌকিক বাস্তবতার জাদু।

পরিমল ভট্টাচার্যর ‘নাহুমের গ্রাম’-এ যেমন আমরা পড়েছিলাম ‘হেলেন’ নামের পুতুলটির এক জায়গা থেকে ভাসতে-ভাসতে আর-এক স্থানে পৌঁছে যাওয়ার ইতিবৃত্ত, সাতগাঁর কাহিনিও যেন তেমনই ভেসে বেড়ায় এক প্রজন্ম থেকে আর-এক প্রজন্মের জল-হাওয়ার বুননে। ‘হয়তো সেই কাহিনির বুননের ভেতর কোনো একটি বাঁকে’ আটকে পড়ে তারা। সেখান থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পাওয়া বড় সহজ নয়। তবে মুক্তির এক সহজ উপায় বের করে নেওয়া যেতে পারে। পরিমল ভট্টাচার্যর পাঠবিশ্ব সম্পর্কে অনেকটাই ধারণা করে নেওয়া যায় তাঁর লেখা অন্যান্য বইগুলি থেকে, এ ছাড়াও আমরা জেনেছি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, বোর্হেস, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা সমরেশ বসুর প্রভাবের কথা। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা পড়তে-পড়তে মনে আসে এমনই অনেক সৃষ্টির কথা। ইনসুলারিটি থেকে মুক্তি পাওয়ার, বাঁকে আটকে পড়া থেকে বেরিয়ে আসার এ-ই এক উপায়। সাতগাঁ–পর্তুগিজ়দের পোর্তো পেক্যেনো (‌ছোট বন্দর)–তার গির্জা, ক্রীতদাস, শাকম্ভরী দেবী, বনলতা, সরোজা, কলার ভেলায় ভেসে আসা মেয়ে মান্দাসী আর সেই জলজ মৎস্যভূমি জুড়ে ঘটে চলা হাজারও অবস্থান নির্মাণ করে চলে ভাষা আর ক্ষমতার সমীকরণের কাহিনি। যেখানে ভাষা ফুরিয়ে যায়, ইতিহাসও যেন থেমে থাকে স্থির, কেবল বুদ্‌বুদের মতো মৃত সময়ের মুখের ভিতর থেকে বেরোতে থাকে জলের ধারা। জে এম কুটসিয়ার লেখা উপন্যাস ফো-র শেষ পৃষ্ঠাটির কথা মনে আসে বারবার, ক্রুসো আর তার ফ্রাইডে যেন আদিরামবাটির কোনও বংশধর! কুটসিয়ার এই উপন্যাসের মূক ফ্রাইডে আর মান্দাসী দাঁড়িয়ে থাকে পাশাপাশি–কিন্তু তাদের ইতিহাস (মাইক্রোহিস্ট্রি, হিস্ট্রি ফ্রম বিলো–যা-ই বলি না কেন) শুনতে পাওয়া যায় কি আদৌ? আজও? ডুবোজাহাজের ভিতর জল স্থির, শান্ত–‘দ্য সেম ওয়াটার অ্যাজ় ইয়েস্টারডে, অ্যাজ় লাস্ট ইয়ার, অ্যাজ় থ্রি হান্ড্রেড ইয়ার্স আগো,’ লিখেছেন কুটসিয়া। এই জলের ছায়াও কি এসে পড়ে সাতগাঁয়ে? মৃত ফ্রাইডের মুখ খোলার চেষ্টা করা হয়। এ বার কি তার মুখ থেকে, নীচের মহল থেকে বেরিয়ে আসবে ভাষা? ‘His mouth opens. From inside him comes a slow stream, without breath, without interruption’। মিস্ট আর মিস্ট্রি বুনে চলে হাওয়াতাঁতিরা, অক্ষরপুঞ্জ দিয়ে গড়া হয় কল্পকাহিনি; বিরতিহীন, বিরামহীন। উপন্যাসটির আর একটি বড় গুরুত্ব তার বিষন্নতায়। কিন্তু এই বিষণ্ণতা নিছক নস্টালজিয়া নয়। এটি সভ্যতার ক্ষয় সম্পর্কে এক গভীর অনুভব। মানুষ প্রযুক্তিগত ভাবে যত উন্নত হচ্ছে, ততই একাকী, বিচ্ছিন্ন ও স্মৃতিহীন হয়ে পড়ছে। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই শূন্যতার অনুভূতিকে ধারণ করে।

পড়তে পড়তে মনে হতে পারে এইভাষা সাম্প্রতিক সময়ের উপন্যাসের ভাষা নয় কিংবা দৃশ্যের পর দৃশ্য, কুয়াশা, নদী, ভাঙা বন্দর, পুরনো বাড়ি, বাতাসের শব্দ— সব মিলিয়ে তাঁর গদ্য অনেক সময় সিনেমাটিক। বিশেষত তারকোভস্কি-র মতো সময়কে তরল করে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর লেখায় অনুভব করা যায়। চোখে পড়বে লেখকের বারংবার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া। লেখক হয়ত এভাবেই লিখতে চেয়েছেন। খানিকটা জার্নালের মতো। তাই অনেক পাঠকের কাছে এই ভঙ্গিতে চলা পছন্দসই মনে হয়ত হবেনা। তাই পাঠের তাল কেটে যেতে পারে বারবার। আজকের বাংলা সাহিত্যের একটি বড় অংশ দ্রুতপাঠ্য ও প্লটনির্ভর। সেখানে পরিমল ভট্টাচার্যের গদ্য ধীর, ধ্যানমগ্ন, বহুস্তরীয়। তিনি পাঠককে সহজ উপভোগের জায়গায় রাখেন না। বরং তাকে ইতিহাস, ভূগোল, ভাষা ও স্মৃতির স্তরগুলির মধ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য করেন। এই ধীর গতি আজ রাজনৈতিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান সময়ের বাজার ও প্রযুক্তি মানুষকে ক্রমাগত দ্রুততার মধ্যে বন্দি করে রেখেছে। মানুষ আর থামতে জানে না, গভীর ভাবে পড়তে জানে না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ সেই দ্রুততার বিরুদ্ধে এক সাহিত্যিক প্রতিরোধ। এটি পাঠককে ধীরে পড়তে শেখায়, শুনতে শেখায়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের শব্দ শুনতে শেখায়। এই উপন্যাস উপকথায় ভরা। তার অনেকগুলোকেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। মনে হতে পারে মূল উপন্যাসকে দুর্বল করেছে এবং গোলকধাঁধায় ফেলে কাহিনির অবয়ব বৃদ্ধি করা হয়েছে মাত্র। প্রথম আলো, সেইসময় পড়া বাঙালির কাছে মনে হতে পারে অজস্র তথ্য, ইতিহাস, চরিত্রের বিচিত্র সমাবেশ ঘটাতে গিয়ে পাতায় পাতায় বেশ জবরজঙ করে ফেলেছেন লেখক আরেকটু পরিমিতবোধ থাকতে পারতো কিংবা প্রশ্ন জাগতেই পারে শুরুতেই বিভিন্ন চরিত্র কাল্পনিক বলে ডিক্লারেশন দিয়ে কি লেখক একটা স্বাধীনতা নিয়েই রেখেছেন, খানিকটা আগাম জামিনের মতো আর তাই যে সব চরিত্রের ছায়া তিনি ব্যবহার করেছেন পাঠকের কাছে তাদের প্রকৃত স্বরূপ চেনানোর জন্য কোনও ফাঁক রাখেননি। যেমন কাঁঠালপাড়ার রাজমোহন চাটুজ্জেকে দিয়ে বন্দেমাতরম লিখিয়েছেন। কলকাতায় রাজেন্দ্রলাল সরকার অকাতরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে গেছেন। প্রসাদ শাস্ত্রী প্রাচীন বাংলা বই-এর অনুসন্ধানে ঘুরেছে সাতগাঁ থেকে নেপাল অবধি। আরও অনেক। এইসব চরিত্রকে প্রকৃত চেহারায় লেখক কেন দেখালেন না তা বোধগম্য হয় না। চেনা চরিত্র নিয়েও কল্পনার সুযোগ তো লেখক নিতেই পারতেন। নাম বদল করে ব্যবহার ব্যাপারটাকে যেন সস্তা করে দিয়েছেন বলে মনে হতে পারে। এক যুগের বেশি সময় ধরে লিখছেন পরিমল ভট্টাচার্য তাঁর প্রিয় কালো জামা গায়ে চাপিয়ে খুঁজতে বেরোন স্মৃতিকে। গদ্যের নতুন ভাষার জন্ম দেন। বারবার প্রথা ভাঙেন। তিনি বলে থাকেন, ‘লেখায় কোন লাইনের প্রয়োজনীয়তা আছে আর কোনটা নেই, সেটা বুঝতে হবে। প্রয়োজনে খুব প্রিয় লাইন বাদ দিতে হবে।’ তাঁর লেখার একটা ধারা আছে। তিনি কোনও কিছুই কোনও বিশেষ খোপে ফেলতে চান না। ভ্রমণ, স্মৃতি, ইতিহাস এইসবের খোপে থাকতে চান না তিনি। তিনি শুধু লিখতে চান। পাঠকের কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে চান বহুদূর। এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়— নদী শুধু জল বয়ে নিয়ে যায় না, সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায় মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, স্মৃতি ও বিস্মৃতি। আর সেই হারিয়ে যাওয়া সুরগুলোই যেন হাওয়ার তাঁতে বুনে চলেছে ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’। এ এক এমন পাঠ-অভিজ্ঞতা, যা শেষ পৃষ্ঠা উল্টে দেওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে মনের ভেতর নদীর ঢেউয়ের মতো নিজের স্মৃতির সঙ্গে অনুরণিত হতে থাকে। লেখক জানেন তিনি সর্বজ্ঞ নন। ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার হাতড়েই তাঁকে কুড়োতে হয়েছে যাবতীয় মনিমুক্তো। বাপ্পাদিত্যের একক ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় ইতালো কালভিনোর দ্য রোড টু সান জিওভান্নি, যেখানে উনি লিখছেন, ‘from the depth of the opaque I write..’ আলোচ্য উপন্যাসের লেখকও বহুমাত্রিক একটি ছায়া-অতীতকেই নির্বাচন করেছেন। ফিকশনের বহুরৈখিক গতি কখনোই পাঠককে বিভ্রান্ত করে না, বরং এই বহুস্বরীয় ইতিহাস স্বীকৃতি পায় পাঠকের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে। ফিকশনকে যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল বাস্তব হিসেবে ধরে নেওয়া যায় তাহলে সেই বাস্তবের নির্মাণে প্রকরণগত ভাবে লেখক চূড়ান্ত সফল। ভুলে গেলে চলবে না আজকের বাপ্পাদিত্য, প্রৌঢ় বাপ্পাদিত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র। নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে রাষ্ট্র। চাইছে এভিডেন্স। বাপ্পাদিত্যর সমস্ত মুখের কথা, স্মৃতির কথাকে উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র বলছে, ‘শো, ডোন্ট টেল’। বাপ্পাদিত্য বলছেন, ‘আমি ডিফেডেন্ট, আমিই ডিপোনেন্ট’। প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্র বলছে এভিডেন্সে ইতিহাস থাকতে পারে, ভূগোল থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি! ঠিক এই বিপন্নতা থেকেই উপন্যাসের অবতারণা। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। একটি জাতির ক্ষয় -জয়-দীনতা- গোঁড়ামো-বাণিজ্য, সর্বোপরি থেকে যাওয়ার বিস্তৃত ইতিহাসের প্রয়োজন এখানেই। এই বহুস্বরীয় আখ্যান এই প্রতিস্পর্ধীতার বক্তব্যেই প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। লেখক পরিমল ভট্টাচার্যকে অভিনন্দন, কারণ তিনি রাষ্ট্রশক্তির ছুড়ে দেওয়া বিপন্নতার সামনে এভিডেন্স হাজির করাতে পেরেছেন। কালাকালের দলিল, চিরকালের এই প্রবহমান থেকে যাওয়ার অনিবার্যতাকে প্রকাশ করতেই এই বিপুল নির্মিতির দায়ভার লেখককে নিতে হয়েছে। এই আখ্যান কেবল বাপ্পাদিত্যকে নয়, আমাদেরকেও উৎসমুখে ঠেলে দেয়। সময়ের তাঁত বুনেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। তিনিই স্বয়ং হাওয়াতাঁতি, এ নিয়ে আর সন্দেহ থাকে না।

ধান ভাঙ্গতে শিবের গাজন বলে একটা বাগধারা আছে বাংলায় আমি সম্ভবত সেটাই করে ফেললাম আজ তোমাকে লিখতে বসে, আসলে তোমার চিঠি পড়তে পড়তে বাংলার এই পরিক্রমার কথাই মনে পড়েছে বারবার। রাত এখন প্রায় একটা! সারা সোসাইটি ঘুমিয়ে গেছে দূর থেকে ভেসে আসছে জাহাজের ডাক, রাস্তার কুকুরগুলো সে সুরে সুর মিলিয়ে চিৎকার করছে, এমন সময় প্রশ্ন জাগে— সভ্যতা কি শুধুই নির্মাণের ইতিহাস, নাকি বিলুপ্তিরও ইতিহাস?



ভালবাসা সহ-

সুস্মি

২৬ জুন, ২০২৬