শ্রাবণ তার চরিত্র এতটুকু বদলায়নি। এক অদ্ভূত মাস এই শ্রাবণ। সারা গ্রীষ্মের তাপে বাষ্পীভূত মেঘ আষাঢ়ে ঘন শ্যামলচ্ছায়া থেকে বিশুদ্ধ পরিস্রুত জল ঝরিয়ে দেয় এক বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। মেঘের ভার যখন কমে আসে আষাঢ় তার কাজ শেষ করে শ্রাবণকে পাঠায়। এই শ্রাবণ জলভরা মেঘের ঘনত্ব ও আয়তন কমাতে থাকে ধীরে ধীরে। কমতে থাকে বৃষ্টির তেজ ঝাঁঝ। মেঘ টুকরো হতে থাকে নানা আকারে ফলে আর অনেকটা এলাকা জুড়ে আর বর্ষণ নয়, বরং এলাকাভিত্তিক মেঘের চোরপুলিশ খেলা রোদ্দুরের সাথে। এই শ্রাবণের চরিত্রের কথাই বলতে ইচ্ছে করছে। ছোটবেলা থেকেই আকাশ দেখার শখ আর তা থেকে প্রকৃতির চক্র বোঝা যা ঋতুচক্রও বটে। সেই ছোটবেলায় যেমনটি দেখেছিলাম শ্রাবণ আজও তেমনই চঞ্চল। আকাশের কোনও একটা দিগন্ত থেকে উঠে আসে কাজল মেঘ, ছেয়ে যায় মাথার ওপর দিয়ে অন্য প্রান্তের দিকে আর যাবার সময় ঝাঁপিয়ে ঝরিয়ে দেয় সঞ্চিত জল। অল্পসময় ভারি বর্ষণে যা হবার তাই হয়, প্লাবিত রাস্তা আর মন্থর চলাচলের যান, ফলত, যানজট। বৃষ্টি থেমে যাবার পর কিছুটা সময় জলীয় বাষ্প মাখা শীতল আমেজ আর তারপরেই কুলকুল বহে নদ-নদী শরীর বেয়ে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি, দুপুরে পশ্চিম থেকে ভেসে এল ঘন কালো মেঘ আর তুমুল বর্ষণ। এলোমেলো হাওয়ায় জলকণার ওড়াউড়ি যেমন চলছে তার সাথে ভারী মোটা দানার পতন। কোনরকম পূর্বঘোষিত বার্তা ছাড়াই এলোমেলো বাতাসে দক্ষিণের বারান্দা আর জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছিটে এসে ঘরদোর ভাসিয়ে দেয়। ভাল লাগে বাহাত্তুরে বুড়োর দুষ্টু নাতনির সাথে এই খেলা খেলতে। সারাটা সকাল ঘেমে-নেয়ে অস্থির হবার পর স্বাভাবিকভাবেই দেখতে ভাল লাগছিল, জলকণায় ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম শরীর। একঘন্টা মত এরকম চলার পর আকাশ ফর্সা। যেন কিছুই হয়নি, শুধু রাস্তা জলমগ্ন।
অন্যসময় এই শ্রাবণ ভালোই লাগে কিন্তু জবরদস্তি অন্তরালে একা থাকা আর থেকে থেকে বৃষ্টি আরও যেন বন্দিদশায় একাকীত্ব বাড়িয়ে দেয়। মন চায় ছুটে দূরে কোথাও চলে যেতে। মনে পড়ে গেল চার বছর আগের এমন এক শ্রাবণ। সত্যি বলতে কি, সেবার প্রায় মাসখানেক ধরেই মনটা উড়ুউড়ু করছিল। নানা গ্রুপের বন্ধুদের উস্কানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলাম, শেষে পঞ্চাশ বছর আগের কলেজের বন্ধুরাই একমত হলাম। কাছাকাছি কোথাও একরাত কাটানো, নিজের বাড়ির ঘরের সেই একঘেয়ে চার দেয়ালের বাইরে থাকা একটা রাত, কিছুটা সময়, আর অফুরন্ত আড্ডা। আহামরি কিছু না হলেও সেটা সম্ভব হল আর চার বন্ধুর অফুরন্ত জীবনীশক্তির জন্যে। সেটা ছাড়াও বেরিয়ে একটা অন্য উপলব্ধি হয়েছে, সেটা বলার জন্যে একটা চাপ আসছে ভেতর থেকে।
এই যে আমরা স্থানান্তরে ভ্রমণে যাই সেটা তো পৃথিবীর ঘাড়ে চেপেই রোজ হচ্ছে। সৌরমণ্ডলের যে অবস্থানে আমরা আছি তা তো অনবরত বদলে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে আমার যেখানে অবস্থান পৃথিবীই তো ঠেলে বদলে দিচ্ছে তার ঠিকানা প্রতিনিয়ত। আপন অক্ষের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে রোজ কত ঘুরিয়ে দিচ্ছে। উত্তর গোলার্ধে যারা আছে তারা যেমন আবর্তিত হচ্ছে তেমনই দক্ষিণ গোলার্ধের লোকেরাও। আর শুধু কি তাই? ভেবে দেখলে এটাও সত্যি আমাদের এই গ্যালাক্সির সূর্য সমেত সব নক্ষত্রই ঘূর্ণায়মান, তার অবস্থান পালটে যাচ্ছে অনবরত। তার মানে আমরা এক অর্থে মহাকাশচারীও বটে। এটা সত্যি, বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যি। কিন্তু বিজ্ঞান জ্ঞানের সন্ধান দিলেও মনটা মানবে কি করে। তার বিজ্ঞান তো অন্য। তার পরিচালনার ভার প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন, বিচিত্র। আমাদের মন কি চায়? তার ভ্রমণের অর্থ ইন্দ্রিয় দ্বারা চেনা পরিচিত জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া। তার মূল্য আবর্তনের হিসেবে নয়, ভৌগোলিক দূরত্ব হওয়া চাই, বস্তু হিসেবে ইংরেজিতে যাকে বলে মেটিরিয়ালিস্টিক। ভাবের নদীতে তরী বেয়ে আমরা কত জায়গায় ভ্রমণ করি, তাতে মনের একটা আবেগ যাকে ভাবাবেগ বলে সন্তুষ্ট হলেও হতে পারে কিন্তু বস্তুবাদী আবেগ কান্নাকাটি করে, সে চায় নির্দিষ্ট ভাবে আক্ষরিক স্থানান্তর, পৃথিবীর ঘাড়ে চেপে নয়, রীতিমতো গাড়িঘোড়া চেপে অন্যকোথাও অন্যকোনোখানে। আর তাতেই মজা। প্রকৃতির অন্য রূপ, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য অথবা মনুষ্যকৃত স্থাপত্যের আরেক প্রদর্শনী এসবই আমাদের মনকে আপ্লুত করে, সাময়িক বিশ্রাম পায় একঘেয়ে জীবনের দিনলিপি। এটাই ভ্রমণের আনন্দ বলে আহ্লাদিত হই।
চার বছর আগে যেখানে গেছিলাম সেটা বিস্তীর্ণ ধানখেতের মধ্যে একটা আলের ওপর কৃত্রিম গড়ে তোলা গ্রামের আবছায়া, রিসর্ট। নাম সুন্দরগ্রাম। বলে রাখি, কৃত্রিমে আমার একটা অ্যালার্জি আছে। যাই হোক, বর্ষার শেষের দিকে এখন সেখানে ধানগাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে। সেটা মন্দ নয়। নীরবতা ছেয়ে চারিদিক। কিছু দোয়েল, ফিঙে, বুলবুল নিশ্চিন্তে ওড়াউড়ি করছে, মাঝেমধ্যে কেউ একটা শিস দিয়ে সাথীকে ডাকছে অথবা আপন খেয়ালে আকাশের দিকে মুখ তুলে আনন্দ প্রকাশ করছে। কাছেই ইটভাটা, সেখানে কিছু কর্মচারী রয়েছে পরিবার নিয়ে। আর রিসর্টে আমাদের মত কিছু পর্যটক, কর্মচারী। এছাড়া জনমনিষ্যি চারপাশে নেই। আড়াই কিলোমিটার দূরে অন্য গ্রাম।
এরকম বাইরে যাবার দুটো উদ্দেশ্য, পরিবার নিয়ে দু-এক দিন চেনা জগৎ থেকে পালিয়ে মুক্তির স্বাদ চেটেপুটে নেওয়া, আনন্দ ভাগ করা আর নয়তো বন্ধুদের সাথে চূড়ান্ত আড্ডা মারা, ফিরে যাওয়া স্মৃতির তরণী বেয়ে ছাত্র জীবনে। আমরা শেষেরটায় পরিপূর্ণ হয়েছি। কিছুটা হলেও বাড়তি অক্সিজেন সঞ্চয় হয়েছে। এটাও শ্রাবণের দান।
এবার বলি এবছর আষাঢ়-শ্রাবণকে সাক্ষী রেখে গেছিলাম দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানে শীতকাল চলছে। একটা কথা বলতেই হয়, আসলে আমাদের পৃথিবীতে সাকুল্যে দুটো ঋতু যা সূর্যের আছড়ে পড়া তাপে ভূপৃষ্ঠের এবং তার ফলে আবহাওয়ার তাপমাত্রায় হেরফের করে গরম আর শীত। এই গরম আর শীতের মধ্যে কোনও স্পষ্ট বিভেদরেখা নেই বরং গড়ানে। গরমের তাপ গড়াতে গড়াতে ঠান্ডার দিকে চলতে চলতে যে তাপমাত্রায় পরিবর্তন তার থেকেই আমরা শরত আর হেমন্ত করে নিয়েছি আর শীত থেকে গরমের মাঝের সময়ে বসন্ত। এই ভেদ কিন্তু খুব কম জায়গায়, বলা যায় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে তাও সর্বত্র নহে সে প্রস্ফুটিত। তবে এই বাংলায় তার রূপখানি অতি চমৎকার। এটি রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। আমরাও প্রজাপতির মত আনন্দে নাচি নাচি। তবে বর্ষা কিন্ত দুটো, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন। বাংলায় গ্রীষ্মের বর্ষা প্রকট আর দক্ষিণভারতে শীতের বৃষ্টি। অক্ষরেখা মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা অনেকটা আমাদের প্রকৃতির রীতি মেনে চলে। সেখানে এখন বৃষ্টি নেই। তাবলে কি বৃষ্টির স্বাদ নেব না? চলে গেলাম জিম্বাবুয়ের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত এলাকায়। বিশাল জলরাশি একশো মিটার মত পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিচে আর তার প্রতিঘাতে বাতাসে ভেসে উঠছে জলকণা। সেই জলকণা কিছুটা উপরে উঠে বৃষ্টি হয়ে নেমে আসছে মাথায়। আকাশে নেই একফোঁটা মেঘ আর এদিকে ভিজে একসা। এও এক প্রকৃতির ম্যাজিক ম্যাজিক খেলা।
তবু, আকাশের দিকে চেয়ে বলতে ইচ্ছে হয়, শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে।


No comments:
Post a Comment