গল্প - মনোজ কর





















১৯

পানু রায় বিদ্যুৎগতিতে চেয়ার থেকে উঠে দরজার দিকে হাঁটা দিলেন। সুন্দরী হাঁ

হাঁ করে উঠলো। বললো,’ খেয়ে যাও। আমি অর্ডার দিয়ে দিয়েছি।‘

-অর্ডার ক্যানসেল করে দাও। বড়কালী থানায়। সে বলেছে আমি না গেলে একটা

কথাও বলবেনা। পুলিশ অপেক্ষা করতে চাইছে না।

-কিন্তু আসলে অপেক্ষা করছে এবং চাইছে যে তুমি ওখানে পৌঁছে যাও। তার

মানে অন্য কোনও উপায় না দেখে ওরা তোমাকে ধরার জন্য ফাঁদ পেতেছে।

-আমি জানি। আমি ওই ফাঁদে পা দেব তাও ঠিক করেছি। তুমি অফিসে যাও।

আমি আর জগাই একটু পরেই ফিরবো। তারপর একসঙ্গে খেতে যাব।

পানু রায় একটা ট্যাক্সি ডেকে থানায় পৌঁছে দেখলেন অনেক লোক জড়ো হয়েছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিশ অফিসারটা পানু রায়কে দেখে এগিয়ে এসে বললো,’

স্যার, সবাই আপনার জন্যই অপেক্ষা করছে। আপনি ভেতরে যান।‘পানু রায়

ভিতরে ঢুকে দেখলেন কেলো দারোগার টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে কৃষ্ণকালী

বসে আছে। পিছনের সারিতে আরও কয়েকজন সাব-ইনসপেক্টর বসে আছে। এরা

সম্ভবত কেলো দারোগাকে তদন্তের ব্যাপারে সাহায্য করছে। পানু রায়কে ঢুকতে

দেখে কেলো দারোগা বললেন,’মিঃ রায়, আপনি বসুন। আপনার জন্যই আমরা

অপেক্ষা করছি।কৃষ্ণকালীবাবু শহরের সম্মাননীয় মানুষ। উনি আপনার অনুপস্থিতিতে

কোনও কথা বলতে রাজি নন। আমরা অন্য সবায়ের সঙ্গে এক্ষেত্রে যা করে থাকি

ওনার সঙ্গে সেটা করা ভালো দেখায় না। সেইজন্য আপনার উপস্থিতি খুব দরকার

ছিল। জরুরি কাজ ফেলে রেখে আপনি যে এসেছেন তার জন্য ধন্যবাদ।‘ তারপর

বড়কালীর দিকে তাকিয়ে বললো,’ নিন, ওনাকে আপনার সামনে হাজির

করেছি।এবার আপনি আপনার রক্তমাখা জুতো এবং শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে সেই

জুতোর ছাপের ব্যাপারে যদি একটু আলোকপাত করেন তাহলে খুব ভালো হয়।‘

পানু রায় বললে,’ দেখুন আপনাদের সঙ্গে কথা শুরুর আগে আমি একটু

কৃষ্ণকালীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চাই।আপনাদের অসুবিধা নেই আশা

করি।‘ কেলো দারোগা বললো,’ আমরা কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছি, মিঃ

রায়।‘

-দেখুন আপনারা যদি আমাকে আলাদা করে ওনার সঙ্গে কথা বলার সময় এবং

সুযোগ না দেন তাহলে ওনাকে বলবো আপনাদের কোনও প্রশ্নের কোনও উত্তর না

দিতে।




-সেক্ষেত্রে আমরা কাগজের অফিসে ওনার অসহযোগিতার কথা জানাতে বাধ্য হব।

উনি সমাজের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং ওনার সম্বন্ধে এই ধরণের প্রচার যে

ওনার প্রতি অবিচার সেটা আমি জানি। কিন্তু আর কোনও উপায় না থাকলে

আমাদের এ ছাড়া আর কিছু করার নেই।

-সেক্ষেত্রে আমিও কাগজের অফিসে জানাতে বাধ্য হব যে আমি কৃষ্ণকালীর সঙ্গে

একান্তে আলোচনার জন্য সময় চাইলে আমাদের ভয় দেখানো হয় যে আমাদের

নামে মিথ্যা অভিযোগ কাগজে প্রচার করার চেষ্টা করা হবে।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে কেলো দারোগা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে

যাচ্ছিল। তখনই একজন সাব-ইনসপেক্টর উঠে এসে কেলো দারোগার কানের কাছে

মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কি যেন বললো। কেলো দারোগা পানু রায়ের দিকে

তাকিয়ে বললো,’ ঠিক আছে। পাশে একটা ছোট ঘর আছে। ওখানে যান। দশ

মিনিটের বেশি সময় দেওয়া সম্ভব নয়।কথা শেষ করে এখানে ফিরে আসবেন।‘

কেলো দারোগার কথা শেষ হতে না হতেই পানু রায় বড়কালীর হাত ধরে

একরকম টানতে টানতে পাশের ঘরের একটা কোণে নিয়ে গিয়ে ফিরে এসে দরজায়

ছিটকিনি লাগিয়ে গলা নামিয়ে বললো,’ খুব আস্তে কথা বলতে হবে। দেওয়ালেরও

কান আছে। তার ওপর এটা থানা।এবার তাড়াতাড়ি বলো কী হয়েছিল।‘

-আমার আগেই আপনাকে বলা উচিৎ ছিল। আমি আমার ছেলের প্রতি ভয়ঙ্কর

বিরক্ত ছিলাম।

-অনেক বাবাই ছেলের প্রতি অনেক কারণে বিরক্ত হয়। সময় নষ্ট না করে আসল

কথায় এসো।

-তবে এখন সব ঠিকঠাক। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিয়েটা করে ও ভুল

করছে। পরে বুঝলাম না ও ঠিকই করেছে।

-তার মানে রেবা কৈরালা এই খুনের সঙ্গে জড়িত?

-না, তার মানে আমি রেবাকে ভালোবাসি। আমার মনে হয় ওকে যেদিন প্রথম

দেখেছি সেদিন থেকেই আমি ওর প্রেমে পড়েছি। আমি চেয়েছিলাম কালীকৃষ্ণ

রেবাকে বিয়ে করুক। তাহলে রেবা বাড়িতে আসবে। কিন্তু ও যখন অন্য একটা

মেয়েকে বিয়ে করলো আমার ভীষণ রাগ হওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু কেন জানিনা

আমার ভীষণ ভালো লাগতে শুরু করলো। হয়তো অবচেতনে রেবার সঙ্গে ওর

বিয়েটা আমি চাইছিলাম না।




-তুমি রেবাকে সব খুলে বলেছ?

-না, আভাসে ইঙ্গিতে বোঝাবার চেষ্টা করেছি। আমার পক্ষে খোলাখুলি বলা সম্ভব

নয়। আমি ওর বাবার বয়সী।

-অনেক মহিলাই বাবার বয়সী লোকের সঙ্গে প্রেম করে আবার বিয়েও করে। এটা

এমন কিছু নতুন ব্যাপার নয়।

-ছাড়ুন। এটা হবে না। আমি আপনাকে একটা খবর দিলাম যেটা আপনাকে

অবস্থাটা বোঝার ব্যাপারে সাহায্য করবে।

-আমাদের হাতে আর মাত্র তিন মিনিট আছে। আমাকে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল

তাড়াতাড়ি বলো। তুমি খুনী বন্দুকটা নিয়ে তোমার ছেলের অফিসে গেলে এবং

তার টেবিলে রেখে এলে। আমি রেবার কাছে তুমি যে বন্দুকটা রেখে এসেছিলে

তার থেকে পুলিশের নজর সরাতে একটা কিছু করতে গিয়ে সব গন্ডগোল করে

ফেললাম।

-দাঁড়ান, দাঁড়ান, কী সব বলছেন? আমি কোনও বন্দুক আমার ছেলের টেবিলে

রেখে আসিনি।

-বাজে কথা বলবে না। তুমি অফিস যাবার আগে শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে

গিয়েছিলে। তুমি শিবুলালকে খুন করেছ কি না?

-বোকার মত কথা বলবেন না। রেবা শিবুলালের কাছে গিয়েছিল আমি বেরিয়ে

আসার পর।

-বেশ, তুমি কী করেছিলে বলো।

-আমি অফিস যাবার পথে শিবুলালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমি ওকে

জানতে দিতে চাইনি যে আমি যাব। আমি সোজা ওর অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে কড়া

নাড়লাম।ও দরজা খুলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমাকে ও চিনতো না।

আমি যখন নিজের পরিচয় দিলাম তখন ও বিরক্তি প্রকাশ করে বললো ঘরে

একজন রয়েছে। আমাকে বললো খুব দরকার থাকলে ঘন্টা দুয়েক পরে আসতে।

তারপর আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে

রাস্তায় বেরোলাম। কিন্তু আমি যে ওখানে গিয়েছিলাম সে কথা কাকপক্ষীতেও

জানার নয় অথচ আপনি কী করে জানলেন?

-আমি কী করে জানলাম তা জানার কোনও দরকার নেই। তারপর তুমি সোজা

অফিস গেলে?




-না, সোজা নয়। পাম্পে দাঁড়িয়ে তেল নিলাম। তারপর কাঠমান্ডুতে একটা ফোন

করলাম। তারপর অফিস গেলাম। অফিসের লাগোয়া আমার একটা ছোট

অ্যাপার্টমেন্ট আছে। আমি এলিনাকে বলেছিলাম আমার জন্য অপেক্ষা করতে।

অফিসের ব্যাপারে কিছু কথা বলার এবং কিছু খবর নেওয়ার দরকার ছিল। আমি

এলিনাকে বলেছিলাম কিছু কাগজ ফাইল থেকে বের করে টেবিলে রাখতে। ততক্ষণে

আমি স্নান করে পোশাক পরিবর্তন করে এসে যাব।

-তারপর কী হলো, তাড়াতাড়ি বলো। সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।

-আমি অফিসে এসে কাগজপত্র দেখার পর জিজ্ঞাসা করলাম যে ও আপনাকে কেন

বলেনি যে আমি কোথায় ছিলাম। সেই নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হলো। ব্যাপারটা

এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে আমি বলতে বাধ্য হলাম যে পরেরদিন থেকে ওর আর

আসার দরকার নেই। তারপর কী হলো আপনি জানেন।

-না, জানিনা। আমাকে বলো।

-তারপর আমি আপনার কাছে গেলাম এবং ওখান থেকে আমরা রেবার কাছে

গেলাম।

-আমি রেবার কাছ থেকে চলে আসার সময় তুমি বললে তুমি আরও কিছুক্ষণ

ওখানে থাকবে।

-আপনি চলে আসার পর আমি খুব অল্পসময় ওখানে ছিলাম। আমি রেবাকে

বোঝাবার চেষ্টা করছিলাম আমি সত্যিই চেয়েছিলাম যে ও আমাদের পরিবারের

একজন হোক।

-কিন্তু বন্দুকের ব্যাপারটা সম্বন্ধে বলো।

-আমি সবসময়ে কাছে বন্দুক রাখি। আমার সমস্ত কোটের ভিতরে বন্দুক রাখার

একটা গোপন পকেট থাকে। সেখানে বন্দুক রাখলে বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায়

না। আমি বন্দুকটা বের করে রেবাকে দিয়েছিলাম ওর কাছে রাখবার জন্য।

- যখন বন্দুকটা ওকে দিলে তখন কি বন্দুকে সবগুলো গুলি ভরা ছিল?

-অবশ্যই। আমি আপনাকে একটা কথা বলে রাখি যেটা আর কেউ জানেনা।

বন্দুকটা অনেকদিন ব্যবহার হয়নি। সেইজন্য কাঠমান্ডু যাবার আগে ঐ বন্দুকটার

পুরনো গুলিগুলো পাল্টে নতুন গুলি ভরে রেখেছিলাম। আমি জানতাম যে কোনও

সময় শিবুলালের সঙ্গে আমার সংঘাত হতে পারে। তাই তার প্রস্তুতি হিসাবে এই

ব্যবস্থা।




- তারপর কী হলো? সংক্ষেপে বলো।

-আমার অফিসে আলমারিতে আর একটা বন্দুক থাকে। আমার সেদিনই শিবুলালের

সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কেউ জানতো না। আমি ওখান থেকে অফিসে ফিরে

এসে আলমারি থেকে অন্য বন্দুকটা নিয়ে শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে যাই। গিয়ে দেখি

সামনের দরজাটা ভেজানো আছে, লক করা নেই। দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল।

ভিতরে গিয়ে দেখি মেঝেভর্তি রক্তের ওপর শিবুলাল পড়ে আছে। কাছে গিয়ে ভালো

করে দেখে বুঝলাম ওর শরীরে প্রাণ নেই। পাশেই রক্তের ওপর জুতোর ছাপ।

দেখলেই বোঝা যাচ্ছে কোনও মহিলার জুতো। জুতোর গোড়ালির ছাপ দেখে স্পষ্ট

বোঝা যাচ্ছে। আমি ভাবলাম এটা নির্ঘাত রেবার জুতোর ছাপ। আমি তাড়াতাড়ি

ওখান থেকে বেরিয়ে রেবার অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম। দরজা খুলে আমাকে দেখে একটু

অবাক হলো। জিজ্ঞাসা করলো কিছু হয়েছে কি না। আমি বুঝলাম ও শুয়ে

পড়েছিল। আমার কড়া নাড়ার আওয়াজ শুনে উঠেছে। আমি বললাম আমার খুব

দুশ্চিন্তা হচ্ছিল তাই ভাবলাম ওর সঙ্গে দেখা করে একটু কথা বলে যাই। ও

আমাকে বসতে বলে ভিতরে গেল। বালিশের তলায় আমার বন্দুকটা দেখা যাচ্ছিল।

আমি সেই সুযোগে বন্দুকের সিলিন্ডার খুলে দেখি একটা গুলি নেই। ওর পরনে

একটা নাইট গাউন, পায়জামা আর পায়ে স্লিপার ছিল। পাশে একটা জুতো খোলা

ছিল। জুতোর গোড়ালিটা আমার দেখা ছাপের সঙ্গে মিলে গেল।

-তুমি রেবাকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলে?

-না, আমি মাঝরাত অবধি ওখানে ছিলাম। আমি ওকে বললাম কোনও দরকার

হলে যেন আমাকে জানাতে দ্বিধা না করে। আমাকে ও নিজের বন্ধু ভাবতে পারে।

তারপর আমি ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম।

-তুমি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গেলে?

-হ্যাঁ, আমি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে রেবার বিরুদ্ধে যেতে

পারে এমন সব সম্ভাব্য সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করে দিলাম।

-তুমি কী করলে?

-একটা অত্যন্ত সহজ উপায় ছিল। আমি সেটা না করার জন্য কিছুতেই নিজেকে

ক্ষমা করতে পারছি না। আমি যখন রেবার কাছে গেলাম তখন আমার কোটের

পকেটে আর একটা বন্দুক ছিল। আমি আগেরটার সঙ্গে এই বন্দুকটা পাল্টে দিতে

পারতাম। কিন্তু এই স্ফজ ব্যাপারটা আমার তখন মাথায় এলোনা।




-আমাকে মিথ্যা বলার চেষ্টা কোরোনা। তুমি বলছো তুমি বন্দুক পাল্টাওনি?

-আমাকে বিশ্বাস করো। আমি নিশ্চিত যে আমি রেবার কাছ থেকে চলে যাওয়া

এবং ফিরে আসার মধ্যে ঐ বন্দুক থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল।

-তাহলে তুমি শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে গিয়ে কী করলে?

-আমি প্রথমে ভাবলাম জুতোর ছাপগুলো মুছে দেব। কিন্তু তারপর মনে হলো এতে

অনেক বেশি সময় লাগবে। সেইজন্য আমি আমার জুতোর সোলটাকে ভালো করে

রক্তের ওপর ঘষলাম। তারপর যেখানে যেখানে রেবার জুতোর ছাপ আছে সেখানে

সেখানে ঐ ছাপগুলোর ওপর চেপে চেপে আমার জুতোর ছাপ দিয়ে দিলাম। আমি

চাইছিলাম পুলিশের সন্দেহ যেন কোনওভাবেই রেবার ওপর না যায় এবং আমার

ওপর যায়। তারপর আমি পুলিশের হাত এড়ানোর জন্য কাঠমান্ডু পালালাম। কিন্তু

এরপর ঘটনাচক্রে কালীকৃষ্ণ আপনার ওপর চড়াও হয়ে ঝামেলা আরম্ভ করলো।

আমার মনে হলো ওর সঙ্গে দেখা করে ওকে একদম চুপচাপ থাকতে বলাটা খুব

দরকার। আমি ভাবলাম আমি বোধ হয় কাঠমান্ডুতে পুলিশকে বোকা বানিয়েছি।

কিন্তু আমিই শেষ অবধি পুলিশের কাছে বোকা বনে গেলাম। পুলিশ তক্কে তক্কে

ছিল। যেই আমি দেশে ঢুকেছি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ধরেছে। আমি উপায় নেই দেখে

মুখ বন্ধ করে আছি। বলেছি আপনি না এলে কোনও কথা বলবো না।

-ঠিক আছে। এবার চলো। দেখা যাক কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আমি

হ্যাঁ না বললে কোনও কথা বলবে না। আমিই বেশিরভাগ কথার উত্তর দেব।

খবরের কাগজে সবকিছু বেরোবে। ওরা এভাবেই চাপ সৃষ্টি করবে। এটা মেনে

নিতে হবে। আমাদের পক্ষে খবরের কাগজের ব্যাপারে কিছু করা এখন সম্ভব নয়।

পানু রায় এবং বড়কালী কেলো দারোগার ঘরে ফিরে আসার পর পানু রায় কেলো

দারোগাকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ বলুন, কী জানতে চান?’

কেলো দারোগা বললো,’ আমি আপনাকে একটা ফটোগ্রাফ দেখাচ্ছি। এটা আপনি

চিনতে পারবেন। খবরের কাগজে ইতিমধ্যে বেরিয়েছে। কিন্তু তফাৎ হচ্ছে যে এটা

আরও পরিষ্কার। আপনি এই ছবিটায় আরও ডিটেলে সব দেখতে পাবেন।‘ কেলো

দারোগা একটা ৮ বাই ১০ ছবি পানু রায়ের হাতে দিয়ে বললো,’ এই ছবিটা

রক্তের ওপর একটা জুতোর ছাপের ছবি।‘ পানু রায় বললেন,’ ঠিক আছে। কিন্তু

আপনি কী জানতে চান?’

-আমার পরের প্রশ্নটা কৃষ্ণকালীবাবুর জন্য। কৃষ্ণকালীবাবু, এটা কি আপনার

জুতোর ছাপ?




বড়কালী পানু রায়ের দিকে তাকালো। পানু রায় মাথা নেড়ে উত্তর না দিতে

বললেন। কেলো দারোগা রেগে গিয়ে বলে উঠলো,’ এক মিনিট। আমরা আপনাদের

বিশ্বাস করে এই প্রশ্নগুলো করতে চলেছি যে আপনারা আমাদের প্রশ্নের ঠিকঠিক

উত্তর দেবেন। আমরা কৃষ্ণকালীবাবুকে আপনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিয়েছি।

আপনার কি ঠিক করেছেন? উত্তর দেবেন না দেবেন না? ‘ পানু রায় বললেন,’

যদি না দিই?’ কেলো দারোগা বললো,’ তাহলে আপনাদের পস্তাতে হবে।

কৃষ্ণকালীবাবু ,আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি আপনি কি তিন সপ্তাহ আগে

সদরের এক জুতোর দোকানে গিয়ে এক জোড়া নতুন জুতোতে রবারের হিল

লাগিয়েছিলেন?’ পানু রায় বললেন,’ উত্তর দাও, কৃষ্ণকালী ।‘ বড়কালী উত্তর

দিল,’ হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।‘ কেলো দারোগা বললো,’ এবার আপনাকে আমি এক

জোড়া জুতো দেখাব। ভালো করে দেখে বলুন এই জুতোজোড়াই সেই জুতোজোড়া

কি না?’ টেবিলের নিচে থেকে জুতোজোড়া বের করে টেবিলের ওপর রাখলো

কেলো দারোগা। চমকে উঠে বড়কালী জিজ্ঞাসা করলো,’ এ’দুটো আপনি কোথা

থেকে পেলেন?’ কেলো দারোগা ঝাঁঝিয়ে উঠে বললো,’ সেটা আপনার জানার

দরকার নেই। এ’দুটো কি আপনার?’ জুতো দুটোর গায়ে কিছু অদ্ভুত ছোপছোপ

দাগ। বড়কালী ভালো করে দেখে বললো,’হ্যাঁ, এ’দুটো আমার।‘

-আপনার অবগতির জন্য জানাই এই জুতো দুটোতে রক্তের দাগ পরীক্ষার জন্য

কেমিক্যাল টেস্ট করা হয়েছিল।যেখানে যেখানে রক্তের দাগ ছিল সেখানে সেখানে

ঐ বেগুনি ছোপছোপ দাগগুলো গেখা যাচ্ছে। আপনি কি ঐ রক্তের দাগগুলো কী

ভাবে এল সে ব্যাপারে কিছু বলতে চান?’

-এই ব্যাপারে আমি এখন কিছু বলতে চাই না।

-ঠিক আছে। এবার আমি আপনাকে একটা রঙ্গিন ছবি দেখাব।

ছবিটা কেলো দারোগা পানু রায়ের হাতে দিয়ে বললো,’ মিঃ রায়, ভালো করে

দেখে বলুন আপনি কী দেখছেন?’ পানু রায় বললেন,’ একটা পায়ের ছাপ।‘কেলো

দারোগা বললো,’ ভালো করে দেখুন।‘ পানু রায় অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে

রইলেন কিন্তু কিছু উত্তর দিলেন না। কেলো দারোগা বললো,’ আমি বলছি। আপনি

মিলিয়ে নিন। ছবিতে একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে যেটা সাদা-কালো ছবিতে দেখা

সম্ভব ছিলনা। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন কৃষ্ণকালীবাবুর জুতোর ছাপের নিচে

আরও একটা আবছা জুতোর ছাপ দেখা যাচ্ছে যেটা কোনও মহিলার জুতোর ছাপ।

কৃষ্ণকালীবাবু, তার মানে কি শিবুলাল খুন হয়েছে জানার পর শিবুলালের

অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে যেখানে যেখানে খুনী মহিলার জুতোর




ছাপ ছিল তার ওপর আপনার জুতোর ছাপ ফেলে আসল সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপ করার

চেষ্টা করেছিলেন?’

পানু রায় বললেন,’ দারোগাবাবু আপনি যা বলছেন তাই যদি হয় তাহলে সেটা

অপরাধ।‘

-আপনার আইনের জ্ঞান দেখে আমি মুগ্ধ, মিঃ রায়। কত কি জানেন আপনি।

অবশ্য আপনার বয়সটাও দেখতে হবে।

-ধন্যবাদ, দারোগাবাবু। সেক্ষেত্রে আমি কৃষ্ণকালীকে বলবো এই প্রশ্নের উত্তর না

দিতে।

-ঠিক আছে। কৃষকালীবাবু, আমি আপনাকে একটা আঙ্গুলের ছাপ দেখাবো যেটা

শিবুলালের অ্যাপার্টমেন্টের পিছনের দরজার হ্যান্ডেলে পাওয়া গেছে। এটা অত্যন্ত

পরিষ্কার যে কেউ একজন সযত্নে ঐ হ্যান্ডেলটা মুছে সম্ভাব্য সমস্ত আঙ্গুলের ছাপ

তুলে দিয়ে সযত্নে নিজের আঙ্গুলের ছাপ হ্যান্ডেলের মাঝখানে ভালো করে দিয়ে

এসেছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে ঐ আঙ্গুলের ছাপটা আপনার। এই ব্যাপারে

আপনার মন্তব্য কী?

পানু রায় বললেন,’যদি আপনার কথা সত্যি হয় যে উনি হ্যান্ডেলের সমস্ত দাগ

মুছে নিজের আঙ্গুলের ছাপ ইচ্ছাকৃতভাবে রেখে এসেছেন তাহলে কি উনি অপরাধী

হিসাবে সাব্যস্ত হবেন?’ কেলো দারোগা বললো,’ অবশ্যই।‘ পানু রায় বললেন,’

সেক্ষেত্রে আমি ওনাকে এই প্রশ্নের উত্তর না দেবার জন্য অনুরোধ করবো।‘

কেলো দারোগা পানু রায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,’ আপনি নিজে খুনী বন্দুক পাল্টে

দিয়ে একটা গোলমাল ইতিমধ্যেই করেছেন। এখন আবার গন্ডগোল পাকানোর চেষ্টা

করছেন। আমি আপনাকে সত্যি কথা বলার একটা শেষ সুযোগ দিচ্ছি। কী করে

খুনী বন্দুকটা আপনার কাছে এল?’

-আমি যদি সত্যি কথা বলি তাহলে আপনি আমাকে অ্যারেস্ট করবেন না?

-দেখুন আমি আপনাকে কথা দিতে পারছিনা। তবে এটুকু বলতে পারি যে তদন্তের

কাজে সাহায্য করার জন্য আপনার শাস্তি একটু কম হতে পারে।

-বেশ, তাহলে শুনুন।আমি কালীকৃষ্ণ অর্থাৎ কৃষ্ণকালীর ছেলের অফিসে গিয়ে

জিজ্ঞাসা করেছিলাম তার কাছে কোনও বন্দুক আছে কি না? ও আমাকে একটা

বন্দুক দেখার জন্য দিল। আমি বন্দুক থেকে একটা গুলি ওর টেবিলের মাঝখান

লক্ষ্য করে ছুঁড়ি। আমি তারপর কালীকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে রেবা কৈরালার ফ্ল্যাটে




যাই। কালীকৃষ্ণ রেবাকে বন্দুকটা দেয়। এটাই সত্যি কথা। আপনি এবার কী

বলবেন?

-বাজে কথা। আপনি নিজে খুব ভালোভাবেই জানেন যে আপনি ওখানেই বন্দুক

পাল্টেছিলেন এবং কালীকৃষ্ণ আপনার কথামত খুনী বন্দুকটা নিয়ে রেবার কাছে

আসে।

পানু রায় বড়কালীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,’দেখো কৃষ্ণকালী, ওনার কথার কত

দাম।তুমি যদি এমন কিছু বলো যেটা ওনার বানানো গল্পের সঙ্গে মেলে না তাহলে

উনি বলবেন সেটা বাজে কথা। উনি সেটাই মানবেন যেটা উনি শুনতে চান।

‘কেলো দারোগা রেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তারপর কী যেন ভেবে আবার

ধুপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। পানু রায় বললেন,’ দারোগাবাবু, আপনি যেটা

ভাবছেন এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন ব্যাপারটা আসলে তা নয়। ব্যাপারটা

নিয়ে আপনাকে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। চিন্তা করা অভ্যাস করুন।

আপনার গল্পে অনেক ফাঁক আছে। প্রথম ফাঁক আমি বন্দুক পাল্টেছি এটা প্রমাণ

করার জন্য আপনাকে ভাবতে হবে আমার এই কাজ করার পিছনে সম্ভাব্য

কারণগুলো কী কী? আইনের ভাষায় যাকে মোটিভ বলে।

-ঠিক আছে। আপনি থামুন। আপনার কাছে জ্ঞান শোনার জন্য আমি আপনাকে

ডাকিনি।

-শুনলে ভালোই করতেন। আমি আপনার সমস্ত প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে

আপনাকে তদন্তের কাজে সাহায্য করেছি। আমি কি ধরে নিতে পারি যে

জিজ্ঞাসাবাদ আজকের মত শেষ?

-আপনি এখন আসতে পারেন।

-আর কৃষ্ণকালী?

-ওনাকে আর একটু আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করতে হবে।

-আপনাদের ধন্যবাদ। কৃষ্ণকালী, তোমার সন্ধ্যা উপভোগ্য হোক। আমার উপদেশ

যে তুমি কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবে না এবং মুখ বন্ধ করে থাকবে।

কেলো দারোগা চেঁচিয়ে বললো,’ রিপোর্টারদের ভেতরে পাঠাও।‘

পানু রায় বেরিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিলেন। অফিসে সুন্দরী অধীর আগ্রহে

অপেক্ষা করছিল। পানু রায় ঢুকতেই জিজ্ঞাসা করলো,’ কেমন হলো, দাদু। সব

ঠিক আছে?’




-আমি এই কেসটার কয়েকটা জিনিস এখনও বুঝতে পারিনি।

-আর পুলিশ?

-পুলিশ তো কিছুই বুঝতে পারেনি।

-আর বড়কালী?

-বড়কালীকে কেলো দারোগা এই খুনের সঙ্গে জড়িত হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা

করবে।

-আর কাকে খুনী হিসাবে প্রমাণ করতে চাইছে?

-রেবা কৈরালাকে।

-আর তোমাকে?

-আমাকে বড়কালীকে প্রমাণলোপের চেষ্টায় সাহায্য করার জন্য অভিযুক্ত করবে

বলে মনে হচ্ছে।

-তাহলে এখন কী করবে?

-জানি না। তবে মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে হবে। সবটা এখনও পরিষ্কার নয়।

ভাবতে হবে, আরও ভাবতে হবে। আমার মনে হয় কাল সকালেই ওরা রেবা

কৈরালাকে অ্যারেস্ট করবে। তারপরে বড়কালীর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি

করবে রেবাকে সাহায্য করার জন্য। মনে হয় বড়কালীর জামিন হয়ে যাবে। তবে

ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে বড়কালীকে বাধ্য করার চেষ্টা করবে পুলিশের পক্ষে

যাবার জন্য।

- কিন্তু আমরা এখন কী করব?

-আমরা যে খাবারগুলো অর্ডার করেছিলাম সেগুলো দিতে বলো। চলো ভালো করে

ডিনার করি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এরপর বেশ কিছুদিন ভালো করে

ডিনার করা যাবে না।

-একথা কেন বলছো? ওরা কি তোমাকে অ্যারেস্ট করতে পারে?

-না তা নয়। তবে কেন জানি না আমার বারবার মনে হচ্ছে এর পর বেশ

কিছুদিন রাতের খাবার আর ঘুম দু’টোই বিঘ্নিত হতে পারে। চলো খেতে যাই।

No comments:

Post a Comment