ধারাবাহিক - রঞ্জন রায়





















২৫ (৩)

--তোমার নাম?

--ছোটে পালোয়ান।

পাব্লিক প্রসিকিউটর একটু শুধরে দিলেন। পেশকার বলল- লিখুন, ছোটেলাল।

ছোটে পালোয়ান ওর দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সত্যিই ওকে ছোট বানিয়ে দেয়া

হয়েছে। চটে গিয়ে ও নাল গিলে ফেলল। পরের প্রশ্ন—বাবার নাম?

--কুসেহর।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের শুধরে দিলেন, --কুসেহরপ্রসাদ।

ওর দিকে পালোয়ান এবার যেভাবে দেখল যেন ওর বাবাকে গাল দেয়া হয়েছে।

--জাত?

--বাহমন।

--মোকাম?

--আমরা গঁজহা।

--বুঝলাম, কিন্তু তোমার গ্রামের নাম কী?

--গঞ্জ।

--আরে কোন গঞ্জ?

ছোটে পালোয়ান চোয়াড়ে ভঙ্গিতে বলল-এদিকে কি শ’ দুশো গঞ্জ আছে? ফের সামলে

নিয়ে বলল—শিবপালগঞ্জ।

--এবার বল, ভগবানের কসম, যা বলব, সব সত্যি বলব।

--বলে দিলাম।

--বলে দিলাম নয়, নিজের মুখে বলো—ভগবানের দিব্যি, সব সত্যি বলব।

--নিজের মুখেই তো বললাম।

আর্দালি মহামহিমের দিকে দেখতে লাগল। কথাবার্তায় ‘ডেডলক’!




মহামহিম ছোটে পালোয়ানকে বেশ খুঁটিয়ে দেখলেন। -- চওড়া চোয়াল, বলদের মত ঘাড়,

গয়াদীনের ভাষায়—শুঁড়হীন হাতি! আবার মহামহিমের ব্যক্তিত্ব বুদ্ধিজীবী ধাঁচের। উনি

আর্দালিকে বললেন—সাক্ষীকে বল বাইরে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসতে।

--বাইরে যাও, মুখ পরিষ্কার করে ফের হাজির হও।

ছোটে পালোয়ান কাঁধের গামছা দিয়ে মুখের অদৃশ্য ঘাম মুছে নিয়ে কাঠঘড়ার ফ্রেমে হাত

রেখে বেপরোয়া ভঙ্গিতে চারদিকে তাকাল, যেন জাহাজের ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে

সমুদ্রে জলজন্তুদের দেখছে। আদালত ফের হুকুম দিলেনঃ

-সাক্ষীর মুখ পরিষ্কার করাও!

এবার পাব্লিক প্রসিকিউটর ছোটেকে বললেন—বাইরে গিয়ে মুখের পান ফেলে এস।

ছোটে পালোয়ান এতক্ষণ বেশ ডাঁট দেখিয়ে পান চিবুচ্ছিল। ওর মনে হোল যেন ওকে ওর

আত্মসম্মান থুঃ করে ফেলে আসতে বলা হচ্ছে। ও এমন ভাব করল যেন শোনেনি,

তারপর চিবোনো পান গিলে ফেলে ফের গামছা দিয়ে ভাল করে মুখ মুছল।

মহামহিম আর্দালিকে বললেন—সাক্ষীকে শপথ করিয়ে নাও।

আর্দালি এই শর্টকাটকে মুখ ভেঙেচে দেখতে দেখতে ছোটে পালোয়ানকে বলল- বল,

ভগবানের কসম, যা বলব সব সত্যি বলব।

--সত্যি বলব।

--ভগবানের কসম।

--ভগবানের কসম।

ছোটে পালোয়ান এদিক ওদিক দেখতে দেখয়ে যন্ত্রের মত বলে দিল। উ

পাব্লিক প্রসিকিউটর প্রথমে পালোয়ানকে জোগনাথের ঘরে তল্লাসি নিয়ে প্রশ্ন করল।

ও স্বীকার করল যে দারোগাজী জোগনাথকে সঙ্গে নিয়ে ওর ঘরে তল্লাসি করতে

গিয়েছিলেন।

--তারপর ঘরের তল্লাসি হল?

--হ্যাঁ।

--কী পাওয়া গেল?

- কিস্যু না।




--পাব্লিক প্রসিকিউটরের চোখ কপালে উঠল। উনি দাবড়ে দিয়ে বললেন—আমি জানতে

চাইছি তল্লাসিতে কী পাওয়া গেল?

---কী আর পাওয়া যাবে? ঘন্টা?

জোগনাথ আর ওর উকিল—দুজনের মুখে হাসির ঝিলিক। পেছন থেকে শনিচর বলে

উঠল—শাবাশ! লড়ে যাও ব্যাটা!

“কে বলল? এখানে কে কথা বলছে? এ কী রকম অভদ্রতা”? মহামহিমের মুখ গম্ভীর।

কিন্তু শনিচর তার আগেই এজলাস থেকে কেটে পড়েছে।

পাব্লিক প্রসিকিউটর—তল্লাসি করে তিনটে গয়না উদ্ধার হয়েছে। সেগুলো এখন

তোমার সামনে রাখা হয়েছে।

অমনই জোগনাথের উকিল লাফিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

--হুজুর, এ তো জেরা হচ্ছে! ক্রস এগজামিনেশন!

পাব্লিক প্রসিকিউটর— হুজুর, সাক্ষী হোস্টাইল হয়ে গেহে। আমি একে ক্রস

এগজামিনেশন করার অনুমতি চাইছি।

মহামহিম গম্ভীর মুখে বললেন—শুরু করুন।

জোগনাথের উকিল আপত্তি করল,--শ্রীমানজী আগে উনি লিখে দিন যে এই সাক্ষী

হোস্টাইল।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফাইল থেকে একটা আবেদন পত্র বের করে আদালতে পেশ

করলেন। বোঝা যাচ্ছে যে ওটা আগে থেকে লিখে রাখা।

ফের আপত্তি, --হুজুর ওটা আগে থেকে লিখে রাখা ছিল।

আদালত গম্ভীর—তাতে কী আসে যায়!

পাব্লিক প্রসিকিউটর নিজের সাফাই দিলেন।

--হুজুর, এ সমস্ত তো রোজকার কারবার, আদালতী দাঁও প্যাঁচ। সমস্ত সম্ভাবনার কথা

ভেবে আগে থেকে তৈরি হয়ে আসি।

--ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনি জেরা শুরু করুন।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ঘুরে দাঁড়িয়ে ছোটে পালোয়ানকে সেই একই প্রশ্ন করলেন—এই

যে তিনটে গয়না দেখছ, এগুলো তল্লাসির সময় জোগনাথের ঘর থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছে?




ছোটে এমন ভাব দেখাল যেন ফালতু কথা নিয়ে বারবার কথা কাটাকাটিতে ওর কোন

উৎসাহ নেই। বলল—আমার বয়ান একবার হয়ে গেছে। তল্লাসিতে কিছুই পাওয়া যায় নি।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করে দেখালেন—এই ফর্দ মাল

বাজেয়াপ্ত করার সময় তোমার সামনে লেখা হয়েছিল?

--আমার সামনে খালি গালাগালি হচ্ছিল, তাই কোন লেখা-টেখার সুযোগই হয় নি।

--এই ফর্দতে এটা তো তোমারই দস্তখত? একবার ভাল করে দেখ।

পালোয়ান কাগজের দিকে না তাকিয়েই গোঁয়ার ভাব দেখিয়ে বলল—না।

পাব্লিক প্রসিকিউটর কাগজের এক জায়গায় ছোটে পালোয়ানের দস্তখত দেখিয়ে

বললেন—এই দেখ, ভালো করে দেখে নাও। এটা তো তোমারই দস্তখত।

ছোটে পালোয়ান এবার মহামান্য আদালতের দিকে তাকিয়ে বলল—আমার বয়ান নেয়া

হয়ে গেছে। তাহলে এ কেন বারবার একটাই প্রশ্ন করে যাচ্ছে?

কিন্তু মহামহিম এবার কোন সহানুভূতি না দেখিয়ে কড়াসুরে বললেন—কাগজ দেখে তবে

জবাব দাও। মিথ্যে বললে জেল হবে।

ছোটে এতটুকু বিচলিত হোল না। বুক চিতিয়ে বলল, -- জেলের কারবার নতুন কিছু নয়।

যখন এজলাসে এসেছি তখন এক পা জেলের মধ্যে, অন্য পা জেলের বাইরে। কিন্তু কাগজ

টাগজ কেন দেখব? লেখাপড়া আমার জন্য ক’অক্ষর গোমাংস।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের উঁচু স্বরে বললেন—তাহলে দস্তখত কী করে কর? এই

দস্তখত তুমি করনি বলছ?

এতক্ষণ পরে জোগনাথের উকিল মুখ খুললেন। বললেন—ধীরে ধীরে একটা একটা করে

প্রশ্ন করুন। সাক্ষী কি পালিয়ে যাচ্ছে?

পাব্লিক প্রসিকিউটর পাত্তা না দিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন—তাহলে দস্তখত কী

করে কর?

--কোন হতভাগা দস্তখত করে? আমার সাত পুরুষে কেউ কখনও দস্তখত করেনি আর

আমি করব! যাও, ভাল করে চোখ খুলে দেখ। পাঁচশো কাগজ রাখা আছে, সবকটায় আমার

বুড়ো আঙুলের টিপছাপ। হোল তো?

ছোটে পালোয়ান গর্বের সঙ্গে এজলাসের চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল।

পাব্লিক প্রসিকিউটর ফের বললেন—আমি বলছি, এই কাগজে তুমিই দস্তখত করেছ।

--সে তুমি সারাক্ষণ চড়াইয়ের মত কিচিরমিচির করতে থাক, কে মানা করছে?




আদালত হস্তক্ষেপ করলেন,--ভদ্রভাবে কথা বল।

ছোটে পালোয়ানের মেজাজ চড়ে গেছে। বলল, --যার যার ভদ্রতা তার তার কাছে হুজুর!

এনার ধমক খেয়ে মিথ্যে সাক্ষী কেন দেব?

পাব্লিক প্রসিকিউটর নিজের ফাইল গুটিয়ে নিয়ে বললেন—আমার আর কিছু জিজ্ঞেস

করার নেই।

ছোটে পালোয়ান লুঙি কষে কেটে পড়ছিল। কিন্তু জোগনাথের উকিল বাধা দিলেন।

--আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাই।

আদালতের আপত্তি নেই।

উকিল বললেন—গয়াদীনের মেয়ে বেলাকে চেন?

--কে না চেনে!

--এলোমেলো কথা ছেড়ে নিজের কথা বল। তুমি ওকে চেন, কি চেন না?

--চিনব না কেন!

--মেয়েটি কেমন?

--বাজে মেয়ে, চালচলন ঠিক নয়।

মহামহিম বাধা দিলেন; --এসব কথার কী মানে? বর্তমান কেসের সঙ্গে কিসের

সম্পর্ক?

--সম্পর্ক থাকবে না কেন? এখনই মামলা সাফ হয়ে যাবে।

এবার উকিল কটু স্বরে ছোটে পালোয়ানকে বললেন—কী করে বলছ যে মেয়েটার চালচলন

ঠিক নয়?

--নিজের চোখে দেখেছি যে!

--কী দেখেছ?

--দেখেছি ও জোগনাথের সঙ্গে খারাপ কাজ করছিল। গয়াদীন এজন্যই জোগনাথকে

মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়েছে।

ব্যস, এরপর জেরা শুরু হোল সেই পুরনো বহু প্রচলিত কায়দায়—যাতে আদালতে বহুবার

প্রমাণ করা হয়েছে যে সংসারে কেউ চোর নয়, বরং যাকে চোর ভাবা হয়েছে সে আসলে

গেরস্তের বৌ, বোন বা মেয়ের প্রেমিক। যাকে তারা রাত্তিরে নির্জন শয্যায় শোয়ার




নেমন্তন্ন করেছিল। কিন্তু গেরস্ত তাকে নিজের ভাই, ভগ্নিপতি বা জামাই না বলে চোর

বলে ডেকেছে। যার পরিণামে আজ-----।




সেই দারোগাজী আজকাল শিবপালগঞ্জে নেই, বদলি হয়ে গেছেন। নিজের ভাঙাচোরা খাট,

দুধেল গাই, এবং কনভন্টগামিনী কন্যাকে নিয়ে শহরবাসী হয়েছেন। বড় মুশকিলে একটা

গলির মধ্যে একটা ছোটখাটো ভাড়ার বাড়ি পেয়ে তাতে সাধারণ নাগরিকের মত বাস

করছেন। যেহেতু সরকারি আধিকারিককে সামান্য নাগরিকের দশায় দেখলে খারাপ লাগে,

তাই ওনাকে দেখেও খারাপ লাগল।

কিন্তু উনিই তো জোগনাথের চুরির মামলার তদন্ত করেছিলেন তাই ওনাকে আজ ফের

এজলাসে হাজির হয়ে গঞ্জহাদের সঙ্গে গা ঘেষাঘেষি করতে হচ্ছে। ছোটে পালোয়ানের

বয়ান শোনামাত্র উনি ছিঃ ছিঃ করে উঠলেন। মহামহিমের নজর ওনার উপর পড়ার আগেই

উনি গয়াদীনের হাত ধরে বাইরে চলে এলেন। খানিকক্ষণ দুজনেই চুপ।

শেষে দারোগাজী বললেন— হতচ্ছাড়া গঞ্জহার দল! বেইমানীর সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমন

একটি মেয়ের জন্যে এরকম নোংরা কথা বলার আগে ওদের জিভ খসে যায় না কেন!

গয়াদীন মাথা নীচু করে মেজের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দুটো ইঁটের ফাঁকে একটা আলপিন

পড়ে আছে। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে-- যেন ভাবছেন, ওটা তুলে নেবেন কিনা।

দারোগাজী ঘৃণার স্বরে বললেন—এখানে দেখছি-- যে কেউ কারও নামে কিছু বলতে পারে।

ভালমানুষের কোন কদর নেই।

গয়াদীন মুখ খুললেন, সেই চিরপরিচিত ক্লান্ত স্বরে—এতো হবারই কথা। যেদিন

আপনি জোগনাথকে ধরে নিয়ে গেলেন, সেদিনই বুঝেছিলাম—এবার আমার ঘরে কারও

ইজ্জত বাঁচানো কঠিন হবে।

--আমার বড্ড আফশোস হচ্ছে।

--আফশোস কেন? আপনার কী দোষ? কাউকে চোর সাজিয়ে জেলে ভরতে চাইলে সে কি

ছেড়ে কথা বলবে?

--আমার তো সারা শরীর জ্বলছে।

--আমার জন্য শরীর পোড়াতে হবে না দারোগাজী! এসবই আমাদের দেশের রীতিরেয়াজ।

কাছারির মুখ দেখেছি যখন সবই সহ্য করতে হবে। যাকে এখানে আসতে হয়, ধরে নাও

তার কপাল পুড়েছে। তুমি নিজের শরীর পুড়িয়ে কী আর করবে?




জোগনাথের উকিল তিরবেগে বেরিয়ে এসে অন্য কোন এজলাসের দিকে দৌড়ল। ওর পেছন

পেছন দৌড়ুতে থাকা মক্কেলদের বলল—তাড়াহুড়ো কোর না। আগে জোগনাথকে ছাড়া

পেয়ে বাইরে আসতে দাও। তারপর এক এক জনের হিসেব করব। হ্যাঁ হ্যাঁ, পুলিসেরও।

দারোগাজী চমকে উঠে তাকালেন। কিন্তু ওনার দেখার জন্য কিছু বাকি ছিল না।

(চলবে)

No comments:

Post a Comment